• ঢাকা, বাংলাদেশ মঙ্গলবার, ০৯ জুন ২০২৬, ১০:১৬ পূর্বাহ্ন
  • [কনভাটার]

আমানুল্লাহ কবির আমাদের অহংকার || নুর এমডি চৌধুরী

রিপোর্টারের নাম / ৭৩ জন দেখেছে
আপডেট : বৃহস্পতিবার, ৩০ অক্টোবর, ২০২৫

নব্বই দশকের কথা। বিশেষ কাজে উনার সাথে দেখা করার উদ্যেশ্যে ঢাকায় আসি। তিনি তখন ঢাকা মিরপুর কল্যাণপুরে দারুসসালাম রোড়ে তিনতলা বাড়ি নির্মান করছিলেন। আর তা দেখাশোনার দায়িত্বে ছিলো আমার সম্পর্কে চাচা আবার বাল্যবন্ধুও নাম তার আলেপ উদ্দিন ফারাজী।

জনাব আমানুল্লাহ কবির জামালপুর জেলার মেলান্দহ থানাধীন ফুলকুচা ইউনিয়নের রেখির পাড়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করলেও তার পৈত্রিক পুরুষের নিবাস ছিলো গুনারীতলা গ্রামের উত্তর পাড়ার মাটিতে। মরহুম কামাল মাতাব্বরের বংশধর তিনি।

জনাব আমানুল্লাহ কবির এর বাল্যবন্ধু ছিলেন তৎকালীন সময়ে গুনারীতলা গ্রামের ভাইস চেয়ারম্যান সোহরাব মাহমুদ। সেকালে যোগাযোগ ব্যবস্থা অনুন্নত থাকায় বহু বছর দুই বন্ধুর কোন দেখা সাক্ষাৎ ছিলোনা। অকস্মাৎ সোহরাব মাহমুদ এক জটিল রোগে আক্রান্ত হন এবং খুব অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যুকালে স্ত্রী ও অল বয়সী দুই সন্তান রেখে যান। বড় সন্তাণের নাম কনিকা মেয়ে আর ছোট সন্তানের নাম রেজাউল ছেলে।

ভাইস চেয়ারম্যান সোহরাব মাহমুদের মৃত্যুর পর স্ত্রী তার ছোট দুই সন্তানকে নিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েন এবং এক পর্যায়ে নিজ পছন্দে অন্যত্র বিয়ে করে কন্যা সন্তানটিকে সাথে নিয়ে চলে যান।

তখন ছেলেটির দেখাশোনার দায়িত্ব পড়ে তার চাচা সুলতান মাহমুদের উপর। কিন্তু বিধির বাম সুলতান মাহমুদ ছেলেটাকে স্কুলে না পাঠিয়ে জমি চাষে নিয়োজিত করে এবং ছেলেটাকে প্রায় প্রতিনিয়ত প্রহার করতে থাকে।

একদিন বন্ধু আলেপ উদ্দিন ফারাজী ছুটিতে বাড়ি এলে রেজাউল এর ব্যাপারে গুরুত্বসহকারে আলোচনা করি। আলোচনার এক পর্যায়ে বলি, দুস্ত রেজাউল ছেলেটার বড় দুর্দিন যাচ্ছে। চেয়ারম্যান কাকার মৃত্যুর পর কাকীও মেয়েটাকে সংগে নিয়ে চলে গেলো। এদিকে ছেলেটাকে দিয়ে তার চাচা সারাদিন মাঠে কাজ করায়। বিন্দু মাত্র ভুলের জন্য সইতে হয় অসহনীয় প্রহার। তুমিতো জানো চেয়ারম্যান কাকা কবির সাহেবের বাল্যবন্ধু ছিলো। তাছাড়া কবির সাহের তাদের গোত্রের লোক। আমার ধারণা তিনি যদি বিস্তারিত শুনেন নিশ্চয়ই রেজাউলের প্রতি দয়া করবেন। এবার আলেপ উদ্দিন রাজী হয় এবং বলে ঢাকায় গিয়ে কবির সাবকে সব খুলে বলবো উনি যদি রাজি হন পরবর্তীতে এসে রেজাউলকে সংগে করে নিয়ে যাবো।

যথারীতি আলেপ উদ্দিন ঢাকায় গিয়ে কবির সাহেবকে সব খুলে বলে। বিস্তারিত জানার পর ভীষণ ব্যথিত হন তিনি এবং বন্ধু বিয়োগে এক পর্যায়ে কেঁদে ফেলেন। তারপর দ্রুতই রেজাউলকে ঢাকায় নিয়ে যেতে বলেন।

 

পরবর্তীতে ছুটি এসে আলেপ উদ্দিন রেজাউলকে ঢাকায় নিয়ে যায়।দীর্ঘদিন রেজাউল জনাব কবীর সাহেবের তত্তাবধানে থাকে এবং একপর্যায়ে পত্রিকা অফিসে তার চাকুরী হয়। সময়ের পথধরে এবং জনাব আমানুল্লাহ কবীর সাহেবের ছত্রছায়ায় রেজাউলের বেশ ক’টি পত্রিকা অফিসে কাজ করার সুযোগ পায়। পরবর্তীতে রেজাউল প্রাপ্তবয়স্ক হলে আপন স্বীদ্ধান্তক্রমে বাড়ি ফিরে যায়। আপন মামাতো বোনকে বিবাহ করে সংসার জীবন শুরু করে।

জনাব আমানুল্লাহ কবীর ছিলেন অত্যন্ত ন্যায় নীতির উর্ধে উঠা বিশেষ ব্যক্তিত্ব সম্পন্ন একজন মানুষ। তিনি কখনই নীতি বিসর্জন দিয়ে কাজ করেননি। উনার সহিত আমার সাক্ষাৎ হয়েছিলো  দেখা দেখা হয়েছিল কল্যাণপুরে বিকেল বেলায়। ফেলে আসা অনেক স্মৃতির গল্প তিমি বলেছিলেন।

তিনি ছিলেন বাংলাদেশের একজন প্রখ্যাত সাংবাদিক ও লেখক। সাংবাদিকতার জীবদ্দশায় তিনি ছিলেন এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। জনাব আমানুল্লাহ কবীর সরকারি সংবাদ সংস্থা (বাসস) এর একজন পরিচালক ও ব্যবস্থাপনা সম্পাদক ছিলেন। তিনি বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ প্রায় সব দৈনিক পত্রিকায় নেতৃত্বস্থানীয় পর্যায়ে থেকে পাঁচ দশক সাংবাদিক হিসেবে যথেষ্ট সম্মানের সহিত কাজ করে গেছেন।

১৯৭১ সালে রনাঙ্গণের মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করে পূর্ব পাকিস্তান পরবর্তী বাংলাদেশে তিনি সাংবাদিকদের রুটি-রুজি আন্দোলনের পুরাধা হিসেবে পরিচিত ছিলেন।

আমানুল্লাহ কবির ২৪জানুয়ারি ১৯৪৭ সালে জামালপুর জেলার মেলান্দহ উপজেলার রেখিরপাড়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন।  তিনি ফুলকোচা ইউনিয়নের প্রাক্তন ইউপি চেয়ারম্যান জনাব বছির উদ্দিন মাস্টারের সুযোগ্য সন্তান। ১৯৬২ সালে জনাব আমানুল্লাহ কবীর হাজরাবাড়ি উচ্চ বিদ্যালয় থেকে মেট্রিকুলেশন পাশ এবং পরবর্তীতে রংপুর কারমাইকেল কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পাশ করেন।

জনাব আমানুল্লাহ কবীর ১৯৬৯ সালে দৈনিক পয়গাম পত্রিকা দিয়ে তাত সাংবাদিকতা শুরু করেন। ১৯৭১ সালে ইংরেজি সাংবাদিকতার সঙ্গে জড়িত হন। দ্য পিপল-এ কাজ করার সময় শুরু হয় মুক্তিযুদ্ধ। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী হামলা চালিয়ে পত্রিকার অফিসটিকে গুড়িয়ে দিলে অল্পের জন্যে প্রাণে বেঁচে যাওয়া আমানুল্লাহ কবীর পরবর্তীতে ঢাকা নগরী ছেড়ে নিজ গ্রামে ফিরে যান। সেখান থেকে সক্রিয়ভাবে তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশ নেন।

স্বাধীনতার সূর্য উদিত হওয়ার পর ‘দ্য পিপল’ পত্রিকাটি পুনরায় আত্মপ্রকাশ করলে জনাব আমানুল্লাহ কবীর ফের পত্রিকায় যোগ দেন এবং স্বাধীন বাংলায় সাংবাদিকতা শুরু করেন। এরপর’ দ্য ইন্ডিপেন্ডেন্টে’ পত্রিকায় নির্বাহী সম্পাদক হিসেবে তিনি দায়িত্ব পালন করেন দীর্ঘ সময়। ২০০১ সালের অক্টোবরে তিনি বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান সম্পাদকে নিযুক্ত হন। ২০০৪ সাল থেকে দীর্ঘদিন তিনি ‘দৈনিক আমার দেশ’ পত্রিকায় সম্পাদনা করেছেন।

জনাব আমানুল্লাহ কবির সাংবাদিকতা পেশার শত ব্যস্ততার মাঝেও তিনি অসংখ্য কবিতা লিখেছেন, তার লেখা অনেক গল্প ও প্রবন্ধ আমাদের নতুন প্রজন্মকে জানান দিয়েছে বাংলাদেশের প্রকৃত মুক্তি যোদ্ধের ইতিহাস। তিনি সত্য প্রকাশে ছিলেন বজ্রের মত কঠিন। পরবর্তী সময়ে সমসাময়িক ঘটনার ওপর ইংরেজি ভাষায় লেখার প্রতি বেশি গুরুত্ব দিয়েছিলেন তিনি।

জনাব আমানুল্লাহ কবীর মৃত্যুর আগের ৫ বছর বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের জ্যেষ্ঠ সম্পাদক ছিলেন। বাংলাদেশের এক সময়কার জনপ্রিয় ইংরেজি পত্রিকা দৈনিক নিউ নেশনের বার্তা সম্পাদক ছিলেন তিনি। কাজ করেছেন টেলিগ্রাফ পত্রিকাযতেও।

জনাব আমানুল্লাহ কবীর ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন এবং ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের দুই দুইবারের মহাসচিব নির্বাচিত হয়েছিলেন। ঢাকাস্থ জামালপুর সমিতি এবং বৃহত্তর ময়মনসিংহ সাংস্কৃতিক ফোরামের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ছিলেন তিনি। প্রাথমিক পর্যায়ে তিনি ছিলেন প্রগতিশীল সাংস্কৃতিক আন্দোলনের সক্রিয় ও একনিষ্ঠ কর্মী। সেই থেকে সাহিত্য-সংস্কৃতির প্রতি ছিল তার গভীর অনুরাগ ও ভালোবাসা। জনাব আমানুল্লাহ সংবাদপত্র সম্পাদনার পাশাপাশি ১০টি বই রচনা করর গেছেন তিনি।

স্বাধীনতার সূর্য উদিত হওয়ার পর ‘দ্য পিপল’ পত্রিকাটি পুনরায় আত্মপ্রকাশ করলে জনাব আমানুল্লাহ কবীর ফের পত্রিকায় যোগ দেন এবং স্বাধীন বাংলায় সাংবাদিকতা শুরু করেন। এরপর’ দ্য ইন্ডিপেন্ডেন্টে’ পত্রিকায় নির্বাহী সম্পাদক হিসেবে তিনি দায়িত্ব পালন করেন দীর্ঘ সময়। ২০০১ সালের অক্টোবরে তিনি বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান সম্পাদকে নিযুক্ত হন। ২০০৪ সাল থেকে দীর্ঘদিন তিনি ‘দৈনিক আমার দেশ’ পত্রিকায় সম্পাদনা করেছেন। মৃত্যুকালে তিনি স্ত্রী, দুই কন্যা ও গুনধর তিন পুত্রকে রাকগে যান। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিলো ৭২ বছর।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরও সংবাদ