• ঢাকা, বাংলাদেশ বৃহস্পতিবার, ২৭ অগাস্ট ২০২৬, ১০:৫০ পূর্বাহ্ন
  • [কনভাটার]

নারীর জন্য আলাদা বাস, কিছু তিক্ত কথাঃ নুরকামরুন নাহার

নুর মোহাম্মদ। সম্পাদক, বার্তা বাংলাদেশ / ৩২ জন দেখেছে
আপডেট : বৃহস্পতিবার, ২৭ আগস্ট, ২০২৬

গত ১৮ আগস্ট দেশে নারীদের জন্য বিশেষ বাস সার্ভিসের উদ্বোধন করা হয়। ১৯ আগস্ট থেকে রাস্তায় চলছে এই বাস। এই বাস নিয়ে চলছে নানা তর্ক -বিতর্ক।

প্রথমে ভেবেছিলাম বিছুই লিখবো না। কিন্তু গত ত্রিশ বছর ধরে একজন কর্মজীবী নারী এবং জেন্ডার নিয়ে গত আড়াই দশকে আমার পড়াশোনা, প্রশিক্ষণ এবং লেখালেখির প্রেক্ষিতে মনে হলো কিছু বোধহয় লেখা প্রয়োজন।

আমি প্রকৃত অর্থে সৌভাগ্যের অধিকারী।চাকুরি জীবনের শুরুতেই আমাকে কোনো পাবলিক পরিবহনে অফিস যেতে হয়নি। প্রথম থেকেই ছিলো আমার প্রাতিষ্ঠানিক পরিবহন। আরো সৌভাগ্য যে গত ১৫ বছর ধরে আমি প্রাইভেট পরিবহনেই সবজায়গায় চলাচল করি। কিন্তু এর মানে এই নয় যে, পাবলিক পরিবহনের অভিজ্ঞতা এবং তিক্ততা আমার জানা নেই। পাবলিক পরিবহনে যাতায়াত করে কোনো নারী একদিনও হয়রানির এবং আরো নির্দিষ্ট করে যদি বলি যৌন হয়রানির শিকার হয়নি, এটা আমি কোনোভাবেই বিশ্বাস করবো না।

বাংলাদেশের নারীরা সবচেয়ে অসহায় পাবলিক পরিবহন আর পাবলিক টয়লেটে। অধিকাংশ মেয়ে একগ্লাস পানি পর্যন্ত রাস্তায় পান করেন না টয়লেটে যাবার ভয়াবহ অভিজ্ঞতায়। তারা ইউরিন ইনফেকশনে এজন্য ভোগেন বেশি। তাই নারীর জন্য আলাদা পরিবহন বাস্তবতা।

এখন আসি কিছু বিষয়ে

এক. অনেকেই বলছেন নারীর বাস তাদের আলাদা করবে। নারী যে একটা আলদা সত্তা এবং আলাদা বাস্তবতা বিশেষ করে এদেশে এতে কি কোনো সন্দেহ আছে। আগে অস্তিত্ব রক্ষা, পরে আমার আলাদা হবার আত্মসম্মান। আর নারীর জন্য আলাদা হলেই আমার আত্মসম্মান যাবে কেন? নারীর ক্ষমতায়ন আর সম্মানবোধ নিজের ভেতর উপলব্ধির বিষয় নিজের জাগরণের বিষয়। আলাদা করে নারীকে দেখলেই সেটি ছুটে যায় না। কখনও আলাদা সত্তার স্বীকৃতিতে সেটা বরং রাড়ে। আমি মানুষ এবং নারী এ আমার অহংকার, কোনো হীণমণ্যতা নয়।
নারীর চলাচল স্বস্তির এবং যৌন হয়রানী মুক্ত করতে অবশ্যই আলাদা বাসের গুরুত্ব এবং প্রয়োজন রয়েছে। তবে হ্যাঁ যদি কোনোদিন সে রকম পরিবেশ আমরা তৈরি করতে পারি অবশ্যই আলাদা বাসের প্রয়োজন নেই।

দুই . এই বাসের রং গোলাপি কেন? গোলাপি রং-এ আমাদের কি অসুবিধা? বাসগুলোকে তো চিহ্নিত করতে হবে তাতে গোলপি বা বেগুনি দিলে সমস্যা কি? আর বেগুনি রং কেন নারী দিবসের রং অনেকেই তা জানেন, বেগুনি নির্দেশ করে সুবিচার ও মর্যাদার । এছাড়াও বেগুনি দিয়ে সূর্য-এর অতি বেগুনি রশ্মিকে বোঝানো হয়। নারীৗ অতি বেগুনি রশ্মির মতোই শক্তিশালী। যাইহোক এই লেখার উদ্দেশ্য নারী দিবসের রং নয়। তাই এর প্রেক্ষাপট বা আরো বিশ্লেষণে যাবার প্রয়োজন বোধ করছি না। বাসগুলো সড়কে ভালো দেখাচ্ছে , দৃষ্টিকে আরাম দিচ্ছে বোঝা যাচ্ছে বিশেষ বাস সেটাই বোধহয় যথেস্ট।

তিন . নারী চালক। এ নিয়েও রয়েছে নানা কথা নানা ট্রল আর অসংখ্য গুজব। নারী ড্রাইভার এবং তাদের যে লুক সেটি আমাকে উদ্দীপিত করেছে। চালকের পরিপূর্ণ অবয়বএবং আচরণের যে স্থায়ী ইমেজ তাতে বরং ধাক্কা দিয়েছে এই নতুন নারী চালকদের ছবি। আমাদের সমাজ ও পুরুষের অহংকারেও ধাক্কা দিয়েছে। আমরা তো এটাই চাই। কোনো পেশাই তো ফেলনা নয় বিশেষ করে চালকের মতো গুরুত্বপূর্ণ পেশা। বরং আমাদের চালক শ্রেণির অবয়ব, শিক্ষা ও আচরণের পরিবর্তন আসুক, আমরা যেন সম্মানের সাথে তাকাই এবং তাকাতে পারি। নারী চালকের এই ইমেজ দিয়ে বরং শুরু হোক চালকের অবয়বের শুদ্ধি অভিযান। জানি সেটা খুবই সুদূরপরাহত।

চার. চালকের প্রশিক্ষণ। হ্যাঁ এই জায়গাটাতে অবশ্যই কোনো ছাড় এবং সমঝোতা নেই। এটা জীবন-মরণ প্রশ্ন। তাদের অবশ্যই যথাযথ প্রশিক্ষণ দিতে হবে। তবে মনে রাখতে হবে শুধু প্রশিক্ষণ কোনো পেশাকেই পূর্ণতা আর দক্ষতা দিতে পারে না। প্রয়োজন অভিজ্ঞতা। তাই চালক হিসেবে কাজ করেই সে দক্ষতা অর্জন করতে হবে আর সে সময়টুকু দিতেই হবে।

আমি সাধুবাদ জানাই, অভিনন্দিত করি সেই নারীদের যারা চালক হবার সাহস এবং চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করেছেন। সত্যি এটি তারা পাওনা। আমি এ উদ্যোগের প্রশংসা করি। হ্যাঁ বলা হচ্ছে আগেও একবার হয়েছিলো সে উদ্যোগ ব্যর্থ হয়েছে। বারবার ব্যর্থ হলে বারবার উদ্যোগ নিতে হবে। কারণ এটা প্রয়োজন। ব্যর্থ হতে হতেই সফল হবে।

কোনো কোনো নারী এর বিপক্ষে কথা বলছেন। এটা তো বলবেনই, এতে অবাক এবং হতাশ কোনটাই হবার কোনো কারণ নেই। নারী যেন এক পাও এগুতে না পারে সে লক্ষ্যে নারীর বিপক্ষে নারীকে দাঁড় করিয়ে রাখা পুরুষতন্ত্র বা পিতৃতন্ত্রের খুব পুরোনো ও শক্তিশালী রাজনৈতিক কৌশল। সে ফাদে আজীবন পা দিয়ে আছে নারী এবং হাজার বছরের এই ভাবনার আধিপত্য কাটাানো যাবে না রাতারাতি। তবু হতাশ হবার কিছু নেই। রশ্মি কেটে কেটেই আজকের নারী।

নারীর জন্য আলাদা বাস এ দেশের বাস্তবতা। সেই সাথে গণপরিবহনও নারীবান্ধব করা সময়ের দাবি। সকল পরিবহনেই যেন নারী নিরাপদে ও সম্মানের সাথে চলতে পারে। তবে পরিবহন আলাদা হলে নারীর সম্মান কমে না। কোনো হীনমণ্যবোধে ভোগারও কোনো কারণ নেই। এটি সময়ের বাস্তবতা। প্রচুর নারী বাইরে কাজ করে। তাই এটা প্রয়োজন। সময়ে আবার প্রয়োজন না হলে পরিবেশ অনুকূল হলে আর প্রয়োজনও হবে না আলাদা পরিবহনের।

নারীর অগ্রগতিতে স্বাচ্ছন্দ্যে এক শ্রেণির চুলকানি হবেই। এই ভালো উদ্যোগকে ব্যর্থ করতে তারা আটঘাট বেঁধে নামবেই। আর আমরাও তাতে পা দিবোই।

আসুন উদ্যোগকে সফল করি। এ উদ্যোগের সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে তা সমাধান করে এটিকে আরও বাস্তবসম্মত, কার্যকরী আর শক্তিশালী করে তুলি।

হুজুগে না হই, বিভ্রান্ত না হই। নিজেকে চিনি। নিজের ভেতরে মতামত খুঁজি। নিজেকেই আরো সমৃদ্ধ করি। অন্যের নকল আমার উদ্দেশ্য নয়। উন্নত দেশে নেই, পাশের দেশে নেই্ তাই আমার দেশেও থাকবে না। এমন যুক্তির কোনো কারণ নেই। । আমার বাস্তবতা আমার। আমার সমাধানও আমার।

আমি মানুষ হয়ে জন্ম নেয়া পরম পাওয়া, নারী হয়ে জন্ম নেয়া আরো সৌভাগ্যের । সেই সৌভাগ্যকে আরো শানিত করি প্রজ্ঞা আর বাস্তববুদ্ধি প্রয়োগের মাধ্যমে , অহেতুক ফাঁকা ও মিথ্যে অহমিকায় নয়।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরও সংবাদ

Archive Calendar

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
 
১০১১১২১৩১৪১৫১৬
১৭১৮১৯২০২১২২২৩
২৪২৫২৬২৭২৮২৯৩০
৩১