• ঢাকা, বাংলাদেশ শুক্রবার, ২৪ জুলাই ২০২৬, ১০:১৩ পূর্বাহ্ন
  • [কনভাটার]
শিরোনাম:

নজরুল ও নার্গিস

রিপোর্টারের নাম / ২২৮ জন দেখেছে
আপডেট : সোমবার, ২৬ মে, ২০২৫

নজরুলের জীবনে দু’জন নারীর উপস্থিতি খুব গভীর ভাবে লক্ষ্য করা যায়- একজন নার্গিস আরেকজন হলেন প্রমীলা। নজরুলের হৃদয়ের দুই সারথী- একজন চাঁদ তো অন্যজন নীল সরোবর।
প্রিয় কবি নজরুলকে, তার প্রথম স্ত্রী নার্গিস একটি পত্র লিখেছিলেন সেই কুমিল্লা থেকে বিয়ের প্রথম রাতে নজরুলের চলে যাবার অনেক দিন পর।সেই চিঠির উত্তর নজরুল দিয়েছিলেন একটি গানের মাধ্যমে-
“যারে হাত দিয়ে মালা দিতে পার নাই, কেন মনে রাখ তারে্।। ভুলে যাও তারে ভুলে যাও একেবারে্।।”
-কিন্তু নজরুল কি সত্যিই ভুলতে পেরেছিলেন নার্গিসকে? পনেরো বছর পর একটি আবেগময় চিঠি লিখেন নার্গিসের কাছে- যা হৃদয় ছুঁয়ে যায়- যে চিঠিখানা বিশ্বের সেরা ভালবাসার তথা প্রেমপত্রের একটি। নজরুল নার্গিসকে কতটুকু ভালবাসতেন- সেটা এই চিঠিতেই সেই ভালবাসার রূপ শাশ্বত হয়ে ফুটে উঠেছে- একজন মানুষ কি তার প্রিয়তমাকে এর চেয়ে বেশি ভালবাসতে পারেন! নজরুল দৌলতপুরে বসেই ১৬০টি গান এবং ১২০টি কবিতা রচনা করেন। উল্লেখযোগ্য কবিতাগুলোর মধ্যে- ‘বেদনা-অভিমান’, ‘অবেলা’, ‘অনাদৃতা’, ‘পথিক প্রিয়া’, ‘বিদায় বেলা’ প্রভৃতি- তাই নজরুলের জীবনে যদি নার্গিস না আসতেন তাহলে হয়তো বাংলা সাহিত্য ভান্ডারে এই অমূল্য সম্পাদ থেকে আমরা বঞ্চিত হতাম।
নজরুল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েরর মসজিদের পাশে চিরনিদ্রায় শায়িত আছেন- আর নার্গিস চিরনিদ্রায় শায়িত আছেন ম্যানচেস্টার (ইংল্যান্ড) শহরে। নার্গিস-নজরুল প্রেম-কাহিনী শুধু সাধারণ প্রেম নয়- এটা অমর প্রেম কাহিনী- এযেন কালজয়ী প্রেম-উপাখ্যান। আর এমনি একটি চিঠির জন্য নার্গিস-নজরুলের প্রেমের উপাখ্যান বাংলা সাহিত্যে অমর হয়ে আছে। নিচে চিঠিটি উল্লেখ করা হলঃ
কল্যানীয়াসু,
তোমার পত্র পেয়েছি সেদিন নব বর্ষার নবঘন-সিক্ত প্রভাতে ।মেঘ মেদুর গগনে সেদিন অশান্ত ধারায় বারি ঝরছিল ।পনর বছর আগে এমনি এক আষাঢ়ে এমনি এক বারি ধারায় প্লাবন নেমেছিল– তা তুমিও হয়তো স্মরণ করতে পারো ।আষাঢ়ের নবমেঘপুঞ্জকে আমার নমস্কার ।এই মেঘদূত বিরোহী যক্ষের বানী বহন করে নিয়ে গিয়েছিল কালিদাসের যুগে, রেবা নদীর তীরে, মালবিকার দেশে, তার প্রিয়ার কাছে ।এই মেঘ পুঞ্জের আশীর্বাণী আমার জীবনে এনে দেয় চরম বেদনার সঞ্চার ।এই আষাঢ় আমায় কল্পনার স্বর্গ লোক থেকে টেনে ভাসিয়ে দিয়েছে বেদনার অনন্ত স্রোতে । যাক, তোমার অনুযোগের অভিযোগের উত্তর দেই । তুমি বিশ্বাস করো, আমি যা লিখছি তা সত্য । লোকের মুখে শোনা কথা দিয়ে যদি আমার মূর্তির কল্পনা করে থাকো,তাহলে আমায় ভুল বুঝবে- আর তা মিথ্যা ।
তোমার উপর আমি কোনো ‘জিঘাংসা’ পোষণ করিনা –এ আমি সকল অন্তর দিয়ে বলছি ।আমার অন্তর্যামী জানেন তোমার জন্য আমার হৃদয়ে কি গভীর ক্ষত, কি আসীম বেদনা ! কিন্তু সে বেদনার আগুনে আমিই পুড়েছি—তা দিয়ে তোমায় কোনোদিন দগ্ধ করতে চাইনি । তুমি এই আগুনের পরশ মানিক না দিলে আমি ‘অগ্নিবীণা’ বাজাতে পারতাম না—আমি ধুমকেতুর বিস্ময় নিয়ে উদিত হতে পারতাম না । তোমার যে কল্যান রূপ আমি আমার কিশোর বয়সে প্রথম দেখেছিলাম, যে রূপকে আমার জীবনের সর্বপ্রথম ভালবাসার আঞ্জলি দিয়েছিলাম, সে রূপ আজো স্বর্গের পারিজাত-মন্দারের মতো চির অম্লান হয়েই আছে আমার বক্ষে । অন্তরের সে আগুন- বাইরের সে ফুলহারকে স্পর্শ করতে পারেনি ।
তুমি ভুলে যেওনা আমি কবি—আমি আঘাত করলেও ফুল দিয়ে আঘাত করি । অসুন্দর কুৎসিতের সাধনা আমার নয় । আমার আঘাত বর্বরের কাপুরুষের আঘাতের মতো নিষ্ঠুর নয় ।আমার অন্তর্যামী জানেন (তুমি কি জান বা শুনেছ জানিনা) তোমার বিরুদ্ধে আজ আমার কোন অনুযোগ নেই, অভিযোগ নেই, দাবীও নেই ।
তোমার আজিকার রূপ কি জানিনা । আমি জানি তোমার সেই কিশোরি মুর্তিকে, যাকে দেবী মূর্তির মতো আমার হৃদয় বেদীতে অনন্ত প্রেম,অনন্ত শ্রদ্ধার সঙ্গে প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলাম । সেদিনের তুমি সে বেদী গ্রহণ করলেনা । পাষান দেবীর মতই তুমি বেছে নিলে বেদনার বেদিপাঠ …জীবন ভ’রে সেখানেই চলেছে আমার পূজা আরতি । আজকার তুমি আমার কাছে মিথ্যা,ব্যর্থ ; তাই তাকে পেতে চাইনে । জানিনে হয়ত সে রূপ দেখে বঞ্চিত হব,অধিকতর বেদনা পাব,–তাই তাকে অস্বীকার করেই চলেছি ।
দেখা? না-ই হ’ল এ ধূলির ধরায় । প্রেমের ফুল এ ধূলিতলে হয়ে যায় ম্লান,দগদ্ধ,হতশ্রী ।তুমি যদি সত্যিই আমায় ভালবাস আমাকে চাও ওখান থেকেই আমাকে পাবে ।লাইলি মজনুকে পায়নি, শিরি ফরহাদকে পায়নি, তবু তাদের মত করে কেউ কারো প্রিয়তমাকে পায়নি ।আত্মহত্যা মহাপাপ, এ অতি পুরাতন কথা হলেও প্রেম সত্য ।আত্মা অবিনশ্বর,আত্মাকে কেউ হত্যা করতে পারেনা । প্রেমের সোনার কাঠির স্পর্শ যদি পেয়ে থাকো, তাহলে তোমার মতো ভাগ্যবতী আর কে আছে ? তারি মায়া স্পর্শে তোমার সকল কিছু আলোয় আলোময় হয়ে উঠবে । দুঃখ নিয়ে এক ঘর থেকে অন্য ঘরে গেলেই সেই দুঃখের অবসান হয়না ।মানুষ ইচ্ছা করলে সাধনা দিয়ে, তপস্যা দিয়ে ভুলকে ফুল রূপে ফুটিয়ে তুলতে পারে । যদি কোনো ভুল করে থাক জীবনে, এই জীবনেই তাকে সংশোধন করে যেতে হবে; তবেই পাবে আনন্দ মুক্তি; তবেই হবে সর্ব দুঃখের অবসান । নিজেকে উন্নত করতে চেষ্টা করো, স্বয়ংবিধাতা তোমার সহায় হবেন । আমি সংসার করছি, তবু চলে গেছি এই সংসারের বাধাকে অতক্রম করে উর্ধ্ব লোকে—সেখানে গেলে পৃ্থিবীর সকল অপূর্ণতা, সকল অপরাধ ক্ষমা সুন্দর চোখে পরম মনোহর মূর্তিতে দেখা যায় ।…
হঠাৎ মনে পড়ে গেল পনর বছর আগের কথা । তোমার জ্বর হয়েছিল, বহু সাধনার পর আমার তৃষিত দুটি কর তোমার শুভ্র ললাট স্পর্শ করতে পেরেছিল; তোমার তপ্ত ললাটের স্পর্শ যেন আজো অনুভব করতে পারি ।তুমি কি চিয়ে দেখেছিলে? আমার চোখে ছিলো জল, হাতে সেবা করার আকুল স্পৃহা, অন্তরে শ্রীবিধাতার চরণে তোমার আরোগ্য লাভের জন্য করুন মিনতি । মনে হয় যেন কালকের কথা । মহাকাল যে স্মৃতি মুছে ফেলতে পারলেননা। কী উদগ্র অতৃপ্তি, কী দুর্দমনীয় প্রেমের জোয়ারই সেদিন এসেছিল । সারা দিন রাত আমার চোখে ঘুম ছিল না ।
যাক আজ চলেছি জীবনের অস্তমান দিনের শেষে রশ্মি ধরে ভাটার স্রোতে, তোমার ক্ষমতা নেই সে পথ থেকে ফেরানোর । আর তার চেষ্টা করোনা । তোমাকে লিখা এই আমার প্রথম ও শেষ চিঠি হোক ।যেখানেই থাকি বিশ্বাস করো আমার অক্ষয় আশির্বাদ কবচ তোমায় ঘিরে থাকবে । তুমি সুখি হও, শান্তি পাও— এই প্রার্থনা । আমায় যত মন্দ বলে বিশ্বাস করো, আমি তত মন্দ নই –এই আমার শেষ কৈফিয়ৎ ।
ইতি—
নিত্য শুভার্থী—
নজরুল ইসলাম।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরও সংবাদ

Archive Calendar

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
 
১০১১১২
১৩১৪১৫১৬১৭১৮১৯
২০২১২২২৩২৪২৫২৬
২৭২৮২৯৩০৩১