জাতীয় বৃক্ষমেলায় কবিতা পাঠের আয়োজন করে কবি ও কথাসাহিত্যিক রোকেয়া ইসলাম বোধকরি ইতিহাস সৃষ্টি করলেন, কেননা এর আগে কেউ বৃক্ষমেলায় কবিতাপাঠের আয়োজন করেছেন বলে শুনিনি। রোকেয়া ইসলাম তো খুবই আত্মপ্রত্যয়ের সাথে ঘোষণা করলেন আজ নতুন ইতিহাস সৃষ্টি হলো আর আমরা যারা এই বিরল আয়োজনে যোগ দিয়েছি তারা সবাই ইতিহাসের অংশ হয়ে গেলাম।
আমরা তো মহাখুশি, ইতিহাসের অংশ হওয়া তো চাট্টিখানি কথা নয়। কবিরা প্রকৃতির সব ভূগোলেই তাদের কাব্যগ্রন্থ খুলে বসেন আর মঞ্চ হলে তো কথাই নেই। তবে বৃক্ষমেলায় তারা যে কখনো কবিতার আসর বসাননি সে ব্যাপারে রোকেয়া ইসলাম নিঃসন্দেহ।
জায়গাটি সুপরিচিত, মাঠহীন রাজধানীর সবেধন নীলমনি গুটিকয় মাঠের এটি একটি। এখানেই আগে বাণিজ্যমেলা বসত, বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রের পশ্চিমে এই সকল-কাজের-কাজী মাঠখানি, তার দক্ষিণে চন্দ্রিমা উদ্যান, পশ্চিমে গণভবন। বিভিন্ন সরকারি সংস্থা তাদের বিভিন্ন উচ্চাকাঙ্ক্ষী অভিলাষ পূর্ণ করার জন্য মাঠখানি বেছে নেয়। প্রকল্পগুলো প্রায়শই রূপ নেয় মেলায়, আর যখন মেলা চলে না তখন সৌখিন গাড়িচালনা শেখার শিক্ষার্থীগণ এখানে ড্রাইভিং প্রাকটিস করে। মোট কথা, তাকে দখলে রাখতে সকল মন্ত্রণালয় মরীয়া। জাতীয় বৃক্ষমেলা হলো বন ও পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের সাংবাৎসরিক প্রজেক্ট, যা চলে মাসব্যাপী আর বাণিজ্য মেলা সুদূর পূর্বাচলে চলে যাবার পরে এ মাঠে বৃক্ষমেলাই সবচেয়ে জনপ্রিয়। কেননা অপরিমেয় বৃক্ষ নিধনের পর নগরপিতাদের টনক নড়েছে আর শৈশবে বিপুল বৃক্ষসমাবেশের ভেতর বড়ো হয়ে ওঠা নগরবাসীর পুরনো বৃক্ষপ্রেম জেগে উঠেছে। তারা এখন বইয়ের চেয়ে বেশি কেনে গাছ। এমনি এক উন্মুক্ত প্রান্তরে, মেঘময় শ্রাবণের আকাশের নিচে, ক্ষণে ক্ষণে গুড়ি গুড়ি বৃষ্টির আবহে কবিতাপাঠের আসর যেমন জলসিক্ত তেমনি মেঘগম্ভীর। রোমান্টিকতার সাথে এসে মিশেছে নান্দনিকতা।
রোকেয়া ইসলাম বলেছিলেন কবিতাপাঠ শুরু হবে বিকেল সাড়ে চারটায়। আমি তখন শ্রেণিকক্ষে, পৌনে পাঁচটায় ক্লাস থেকে বেরিয়েই সবুজ সিএনজি নিয়ে ছুটি। সঙ্গে বীর মুক্তিযোদ্ধা ও গ্রন্থপ্রেমী আবদুল হালিম খান, যিনি আজ আমার সাথে দেখা করতে ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটিতে এসেছিলেন। আমরা গিয়ে পৌঁছাই সাড়ে পাঁচটায়। বৃক্ষমেলার প্রবেশতোরণটি খুব একটা সুদৃশ্য না হলেও কার্যকর, এর দুপাশে রয়েছে আয়োজকদের কার্যালয়, ফলে প্রবেশপথটির গভীরতা ও ছাদ অনেকখানি বিস্তৃত।নাক বরাবর দক্ষিণে তাকালে চোখে পড়ে এক সরু ও লম্বাটে টাওয়ার, অনেকটা টেলি সামাদের মতো ঢ্যাঙ্গা। টাওয়ারের দুপাশে দুটি ফোয়ারা, চিরকালের চেনা ফোয়ারার চেহারায়। মেলায় প্রবেশ করলে তিনদিকেই যা চোখে পড়ে তা হলো নার্সারি বৃক্ষ আর ফুলগাছের সমাবেশ। পুবে এক বিশাল বটবৃক্ষ, পশ্চিমে কয়েকটি খাবারদাবারের প্যান্ডেল। সেখানে দাঁড়িয়ে আমরা প্রশিকার সাইনবোর্ড খুঁজে চলি, পাই না। তখন ফোন করি রোকেয়া ইসলামকে। কিছুক্ষণ পরেই লতাগুল্ম আর ঝোপ সরিয়ে তিনি উদিত হন এবং আমাকে দেখে খুশি হন। তাকে পরিচয় করিয়ে দেই আবদুল হালিম খানের সাথে। তিনি একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা শুনে রোকেয়া ইসলাম সগৌরবে বলেন তিনি একজন বীর মুক্তিযোদ্ধার সহধর্মিণী এবং তাদের গোটা পরিবারই মুক্তিযুদ্ধের সহযোগী কেননা ১৯৭১ সালে টাঙ্গাইল শহরে তাদের বাসাটি ছিল মুক্তিযোদ্ধাদের শেল্টার।
আমরা বিবিধ বৃক্ষ, তারা প্রায় সকলেই তাদের শৈশবে, সরিয়ে, দুপাশে প্রস্ফুটিত ফুলদের হাসিমাখা মুখ দেখে দেখে যেখানে প্রবেশ করি সেটা প্রশিকার স্টল। অতবড়ো প্রতিষ্ঠানের অত ছোটো স্টল কেন আমার প্রশ্নে রোকেয়া ইসলাম জানালেন প্রশিকা এবছরই বৃক্ষমেলায় যোগ দিয়েছে। সামনে যে বড়ো বড়ো নার্সারি, জমিদারের মতো ভাবভঙ্গি, তারা এ মেলার জন্মলগ্ন থেকে আছে, হয়তো তারা বড়ো স্পন্সরও, তাদের পেছনে প্রজাসারির মতো এক সারি স্টল, যার ভেতর প্রশিকাও ঠাঁই নিয়েছে। ভেতরে একদল উৎসাহী- কেউ কবিতাপ্রেমী, কেউ বৃক্ষপ্রেমী, কেউবা দুটোরই প্রেমে পড়েছে। সেখানে জৈবসার, ফুলের টব আর ফলবৃক্ষের বীজের প্যাকেটের ভেতর কসারি আসন পাতা। আমরা বসতেই পরিবেশিত হলো আদা চা ও বিস্কিট।
আমরা আসার আগেই এক প্রস্থ কবিতা পাঠ ও পাঠের ভিডিও হয়ে গেছে। আমাকে পেয়ে উচ্ছ্বসিত রোকেয়া ইসলাম নিয়ে গেলেন স্টলের বাইরে কবিতাপাঠের ভিডিও রেকর্ডিং করতে। আমরা গেলাম বৃহৎ বটের কাছে পায়চারি করতে, তার একটি বৃহৎ ডাল কর্তিত দেখে ভাবি কোন সে জানোয়ার মাতাবৃক্ষের পাখা কেটেছে। জানলাম এমাঠে একবার ছাত্রলীগের সম্মেলন হয়েছিল। অপকর্মটি তারাই করেছে। বট এত শক্তিশালী আর প্রাণসঞ্জীবনী যে তাকে পরাস্ত করা কঠিন। বাকি ডালপালা নিয়ে সে ছায়াপ্রদায়ী মাথা তুলেছে এক বৃহৎ পরিসরে। তার ঝুঁকে আসা প্রশাখ আর পল্লবের নিচ দিয়ে চোখে পড়ে বাংলাদেশ-চীন আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্র যাকে আমরা বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক কনভেনশন হল নামেই চিনি, তার স্থাপত্যের সুনন্দ চূড়া, কার্নিশ চোখে পড়ে। সেখানে পরিচয় হলো কবির খান ও গোলাম হায়দার নামের দুজন মানুষের সাথে। তারা দুজনেই ব্যবসায়ী ও সমাজসেবী। কবির খান প্রচুর গাছ কেনেন এবং দরিদ্র মানুষদের বিভিন্নভাবে সাহায্য করেন। তারা এসেছেন রোকেয়া ইসলামের আহবানে। রোকেয়া ইসলাম আমাদের সঙ্গে থাকা মামুন উর রশীদকে দেখিয়ে বললেন এদের একটি সংগঠন আছে যারা বৃক্ষপ্রেমী, ছাদবাগানকারী। এই যে জাতীয় পর্যায়ে বৃক্ষমেলা হয় এর পেছনেও এদের উদ্যোগ ও সক্রিয়তা রয়েছে। মামুন উর রশীদের ছাদ বাগান বিখ্যাত, যদিও দেখিনি, প্রচুর সুনাম শুনেছি।
এর মাঝে এক অভাবিত ব্যাপার ঘটল। আবদুল হালিম খান বৃক্ষমেলায় এসেছেন শুনে তার এক ভক্ত আকবর তালতলা থেকে তাল নয়, খাবার ও পানি নিয়ে এলেন। আকবর নামের ভক্তটির বাড়ি আমি ভেবেছিলাম আবদুল হালিম খানের জেলা বিক্রমপুরে। তা নয়, তার বাড়ি চাপাই-নবাবগঞ্জে। লাজুক ও সুদর্শণ যুবক, তালতলায় যে বেকারিটি সে চালায় তা থেকে এনেছে চিকেন প্যাটিস ও মিষ্টি। সঙ্গে একজন শ্রমিকের মাখায় চাপিয়ে মিনারেল ওয়াটারের কার্টুন। বেশ বড়ো প্যাটিসটি, খেয়ে পেট ভরে গেল। আশ্চর্য ব্যাপার উপস্থিত সকলেই খাবার পেল। এত খাইয়েও আকবর তৃপ্ত নয়, সে বল্ল আগে জানলে সে আরও খাবারের ব্যবস্থা করতে পারত। পরের বার সে সুযোগ হবে এমনি মধুর কথার উত্তরে আকবর জানাল চাপাইয়ের মানুষ সে, অতিথি আপ্যায়নপ চাপাইয়ের মানুষ পিছপা হয় না।
ওই সান্ধ্যভুরিভোজনের পর আমরা বাইরে গিয়ে চেয়ার পেতে বসি। তখন বাতিজ্বলা বৃক্ষমেলার অন্যরূপ, টাওয়ার বিভিন্ন বর্ণের বাতিমালা নিয়ে সোফিয়া লরেন হয়েছে, ফোয়ারার নিবেদিত জলধারায় আলোর বর্ণিল বিক্ষেপ। আকাশে তখনো এক হালকা নীল আভা বিরাজমান, মৃদুমন্দ বাতাসে দুলছে প্রশাখা, নবীন গাছের মাথা, আর আমাদের কার্যকলাপ কৌতুহলী হয়ে দেখছে ঝুমকো লতা, হলুদ ফুলদল।
কবিতা পাঠের আসরটি তার পরিপূর্ণ রূপ পেল উন্মুক্ত পরিসরে এসে, প্রকৃতিক পরিবেশ পেয়ে। রোকেয়া ইসলাম অনুষ্ঠান সঞ্চালনার দায়িত্ব দিলেন নীল হাসানকে। অর্ধবৃত্তাকার আসনসারির প্রথম আসনে বসেছিলেন আমাদের মাঝে সবচেয়ে অগ্রজ, মনেপ্রাণে তরুণ কবি আবদুর রাজ্জাক। তিনি পড়লেন প্রথম কবিতাটি। এরপর একে একে রাজিয়া সুলতানা, আমি, কাজল আক্তার, নূর এমডি চৌধুরী, কাব্য কোস্টা কবিতা পাঠ করলেন।
আমাদের মাঝে ছিলেন কলকাতা থেকে আগত অতিথি কবি আবদুল কাইউম। অতিথি বলে তাকে কবিতাপাঠের আগে কথা বলতে আহবান জানিয়েছিলেন রোকেয়া ইসলাম। সে কথামালা যে এত দীর্ঘ হবে তা বোধকরি তিনিও টের পাননি। আমাদের সবাইকে ছাত্র বানিয়ে তিনি নৈতিকতা শিক্ষাদানের এক ক্লাস খুলে বসলেন। কী করে মানুষ হতে হয় এই শিক্ষা তিনি দিয়ে চললেন অনর্গল কথায়। এমনকি যখন ঝিরিঝিরি বৃষ্টি পড়তে শুরু করেছে তখনো তার কথার বৃষ্টি মুষলধারে বর্ষিত হতে লাগল।অপারগ হয়েই রোকেয়া ইসলাম তাকে, ওই বৃষ্টির অজুহাতে, কথা থামিয়ে কবিতা পাঠ করতে বললেন।
কিন্তু যিনি নিজের পরিচয় দিয়েছেন শব্দসৈনিক ও ভাষাকুশলী হিসেবে তিনি যে থামবেন না তা বোঝা যাচ্ছিল। কথার সমাপ্তি টানছেন বলেও কয়েক মাইল কথা বলা মানুষটি কবিতা পড়লেন স্মৃতি থেকে, কেননা কলকাতা থেকে আসার সময় তিনি আর সবই এনেছেন, কবিতার বই আনতে ভুলে গেছেন। অত যে জোর দিয়ে মাস্টারমশাই স্টাইলে যিনি কথা বলেন, তিনি কিন্তু কবিতাটি পড়লেন অনুচ্চ স্বরে।
বৃষ্টি কী ভেবে নিজেকে গুটিয়ে নিলো, কবিরা যদি বিরক্ত হয়ে বৃষ্টিবন্দনার কবিতা লেখা বন্ধ করে দেয় সেই ভয়ে হয়তো বা। তখন কবিতা পড়লেন নবীনগর থেকে আসা রোকেয়া সুলতানা, মোহাম্মদপুর থেকে আসা মাহবুবুল মোরশেদ ও সৈয়দ খায়রুল আলম। শেষোক্তজন নারী শিশু পাচার রোধে কাজ করেন। তিনি একাই প্রায় ১২০০ নারী ও শিশুকে সীমান্তের ওপাড়ে পাচার হওয়া থেকে রক্ষা করেছেন বলে সভাকে জানালেন। আমরা শুনে সাধুবাদ জানাই।
এরপরে প্রশিকা মানবিক উন্নয়ন কেন্দ্রের সভাপতি কবি রোকেয়া ইসলামের বক্তৃতায় সে কথাই ফুটে উঠল যে বৃক্ষমেলায় কবিতা পড়া ইতিহাস সৃষ্টি করল আর আমরা সবাই সেই ইতিহাসের অংশ হয়ে গেলাম। তার কণ্ঠে বিজয়িনীর উচ্ছ্বাস ও পরিকল্পনা বাস্তবায়নে সাফল্যের আনন্দ ঝরে পড়ছিল। সবশেষে গান ধরলেন বৃক্ষমেলার একজন আয়োজক, ছাদ বাগান আন্দোলনের একজন সংগঠক কামাল হোসেন। এক ঐতিহাসিক কবিতাপাঠের জন্ম হলো। বৃষ্টি মাথায় নিয়েই আমরা বাড়ি ফিরলাম সন্তুষ্টচিত্তে, যেন দিগ্বিজয়ের আলকজান্ডার আমরা সকলেই।