উনিশশত নব্বই সালের কথা। সবেমাত্র এসএসসি পরীক্ষা শেষ হয়েছে। আমাদের স্যার মৌলানা জসিমউদদীন আনসারী স্যার আগে থেকেই বলে রেখেছেন পরীক্ষার পরপরই যেন উনার সাথে তাবলীগ জামাতে যাই।
স্যার বলে কথা। তাছাড়া প্রাইমারি স্কুলে যখন পড়তান মৌলানা জসিমউদদীন আনসারী স্যার ছিলেন প্রধান শিক্ষক। বলতে গেলে স্যারের হাত ধরেই নামায শিখন। হাইস্কুল জীবনেও নামাজ পড়ার প্রতি যেমন ছিল শক্ত নির্দেশনা তেমনি পরিবার থেকেও যথেষ্ট চাপ ছিলো। আমরা প্রায়ই নিয়মিত নামাজ আদায় করে নিতাম বিশেষ করে যোহর এর নামাজ কাযা করার কোন অপশন ছিলোনা।
সুবিশাল গুনারীতলা হাইস্কুল মাঠ। মাঠের পূর্ব পাশে সারিসারি বৃক্ষরাজি তার পাশদিয়ে সরু কাঁচা রাস্তা কালের স্বাক্ষ্য বয়ে গেছে একশত বছরের পুরনো ঐতিহ্যবাহী কাজীর ঘাট ভেদ করে ভেলামারী গ্রামের ভিতর দিয়ে মিশেছে রব্দা সড়কে বর্তমান যে রাস্তাটি মাদারগঞ্জ বাসীর চলাচলের প্রাণকেন্দ্র। রাস্তার পাশ দিয়ে বয়ে গেছে স্রোতস্বিনী ঝারকাটা নদী। নদীর ধার থেকে পশ্চিম দিকে ঠিক স্কুল ফিল্ডের মাঝ বরাবর তাকালেই চোখে পড়বে একটা বটবৃক্ষ আর বৃক্ষটির ঠিক পশ্চিম পাশেই দেখা যাবে সুবিশাল জায়গা নিয়ে নান্দনিক আদলে গড়ে উঠেছে গুনারীতলা কেন্দ্রীয় জামে মসজিদ।
নব্বই দশকে মসজিদটির এতো নান্দনিকতা ছিলোনা। টিন সেটের প্রশস্ত জায়গা নিয়ে মসজিদটির অবস্থান ছিলো। মসজিদের দক্ষিন পাশ বরাবর ছিল কওমী মাদ্রাসা যাকে আমরা খারেজী মাদ্রাসা নামেও অনেকে জানি। আঁধাপাকা বিল্ডিং এর ছোটছোট কয়েকটি রোম ছিল। তার পশ্চিম পাশে ছিল কয়েক একর জায়গায় জুড়ে সুবিশাল পুকুর। পুকুরটি দীর্ঘকাল আনসারী বাড়ির প্রয়াত তোফাজ্জল আনছারী সাহেবের দখলে ছিল। এখন আর নেই। পুকুরটি ভরাট হয়েছে দীর্ঘদিন।
এই কওমী মাদ্রাসায় আমি দুই ক্লাস পড়েছিলাম। তৎকালীন সময়ে কুমিল্লা হুজুর ছিলেন মোহতামীম। খুব মিষ্টি কথার মানুষ ছিলেন। আরেকজন ছিলেন নোয়াখালির হুজুর। হুজুরদের পরিচিত তৎকালীন সময়ে এভাবেই প্রচলিত ছিলো। যেমন সম্পর্কে আমার ফুপা লাগেন তিনি ছিলেন জামালপুর নান্দিনা এলাকার বাসিন্দা। আমাদের গুনারীতলা দাখিল মাদ্রাসার সুপার ছিলেন। তিনিও নান্দিনা গুজুর নামে পরিচিত ছিলেন। যদিও উনার নাম মৌলানা আখতারুজ্জামান।
নোয়াখালি হুজুরটা আবার ছিলেন ভাবগাম্ভীর্যপূর্ণ। কথা বলতেন কম। পড়ালেখা আদায়ের প্রতি ছিলেন শক্ত এবং কঠুর। আমি ভয়ে হোক আর মেধায় হোক পড়া জিজ্ঞেদ করার সাথে সাথেই গড়্গড় মুখস্থ বলে দিতে পারতাম বলে হুজুর আমাকে আদর করতেন।
মসজিদ আর মাদ্রাসাটি যার তত্ত্বাবধানে গড়ে উঠেছিলো তিনি হলেন অত্যেন্ত পরহেজগার মানুষ। সকলের প্রিয় ব্যক্তিত্ব। বিনয়ী নম্রভদ্র আর দানবীর মানুষ নাম মৌলানা জসিমউদদীন আনসারী। একসময় আমরা যখন প্রাইমারি স্কুলের ছাত্র ছিলাম ১৯৮১-৮৫ তৎকালীন সময়ে গুনারীতলা প্রাইমারি স্কুলের প্রধান শিক্ষক ছিলেন মৌলানা জসিমউদদীন আনসারী স্যার।
সে সুবাধে স্যার আর আমাদের মাঝে আন্তরিকতা ছিল বেশ। দেখা হলেই সালাম দিতাম বিনিময়ে একগাদা দু’আ দিতেন। কাছে ডেকে নিয়ে মাথায় হাত বুলিয়ে ফুঁ দিয়ে দিতেন। আর জিজ্ঞেস করতেন ঠিকঠাক পড়ছিসতো। নামাজ কিন্তু ছাড়বিনা।
এমন একজন গুনীজনকে প্রতিশ্রুতি দেওয়া এসএসসি পরীক্ষার পরই কয়েকদিনের জন্য জামাতে যাবো। যথারীতি পরীক্ষা শেষ হয়ে গেছে। সপ্তাহ খানেকের মধ্যেই একদিন মাগরিবের নামাজ আদায়ের পর স্যার ডাকলেন। আমরা একসাথে ছিলাম পাঁচ বন্ধু, রাজ্জাক, আলেপ, মান্নান, বিপলব সরকার এবং আমি। যথারীতি স্যার আমাদের পাঁচজনকেই জামাতে যেতে রাজি করালেন। আগামী পরশু ঠিক আসরের নামাজের পূর্বে সকল প্রস্তুতি নিয়ে যেন আমরা মসজিদে হাজির থাকি। সময় হলো তিন দিনের ছোট জামাতে যাওয়ার।
যথা সময়েই হাজির হলাম আমরা। মসজিদে এসে দেখলাম স্যার আরও অনেকজনকে নিয়ে বসে তালিম দিচ্ছেন। আসরের নামাজ আদায় করে আমরা সকলে মিলে সারিবদ্ধ ভাবে বেরিয়ে পড়লাম।
তৃতীয় দিন আমাদের মসজিদ নির্ধারণ করা হলো গুনারীতলা মধ্যপাড়াতর মসজিদ। যথারীতি সারিবদ্ধ ভাবে সকলে আসরের নামাজের পূর্বেই হাজির হলাম মধ্যপাড়ার জামে মসজিদটিতে। রাত্রে থাকলাম। রাতে রান্না করা হলো খিচুড়ি। খাবার নিয়ম হলো ৩জন এক প্লেটে খাওয়া।
রান্না সুস্বাদু হোক না হোক বলতে হবে খুব স্বাদ হইছে খুব স্বাদ হইছে। আল্লাহ বেশ ভালো খাওয়ায়েছেন শুকুর আলহামদুলিল্লাহ। যাহোক রাত কেটে গেলো। ফজরের আজান হলে নামাজ জামাতের সহিত আদায় করে নিলাম। সেদিন আমার তালিম দেওয়ার কথা ছিল তাই জামাতের পরপরই উঠে দাঁড়ালাম, জোর স্মরে বলতে লাগলাম, ইনশাআল্লাহ বাকি নামাজবাদ ঈমান ও আমল সম্পর্কে কিছু গুরুত্বপূর্ণ কথা হবে আমরা সব্বাই বসি শুনলে বহুত ফায়দা হবে। বলেই বসে পড়লাম। হুজুর মোনাজাত করলেন। যথারীতি বয়ান হলো, দোয়া হলো। মুসল্লীগণ বেরিয়ে গেলেন।
মধ্যপাড়ার সরকার বাড়ি আমার নানাবাড়ি। সে সুবাদে নানা বাড়ির আশেপাশের অনেকজনকেই চিনি। বেলা এগারোটার দিকে খেয়াল করলাম আমার সম্পর্কের এক মামাতো বোন বয়স তার খুবই কম মসজিদের আশেপাশে ঘুরাফেরা করছে। আমি মসজিদের দরজায় গিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, কি করিস এখানে। ও কিছু না বলেই দৌড়ে পালালো।
যোহরের আজান হলো। আমরা সবাই যার যার মত করে ব্যস্ত হয়ে পড়লাম। যথাসময়ে নামাজও আদায় করে নিলাম। নামাজের পর দুপুরে জামাতবন্দি হয়ে একসাথে খাবার খেলাম।
খাবারের পর কিছুটা সময় রেস্ট করতে দেওয়া হয়। আমরা যার যার বিছানা নিয়ে শুয়ে পড়ছি। হঠাৎ লোকমুখে শুনতে পাই পাশের বাড়ির এক ছোট বাচ্চার ভীষণ পেটব্যথা। কয়েক ঘন্টা ধরে সে গড়াগড়ি করছে কোন ঔষধ পথ্য ঝাড়ফুঁক কোন কিছুতেই কাহ হচ্ছেনা। মসজিদের ঈমাম সাবের কাছে আসছে।
যথারীতি মসজিদের ঈমাম সাহেবের কাছে আনা হলো। বাচ্চাটা ভীষণ ভাবে চীৎকার করছে আর বলছে আগুন আগুন! বাঁচাও বাঁচাও। আমরা সবাই কাছে গেলাম। খেয়াল করে দেখলাম সেই ছোট মেয়েটি যে মসজিদের পাশে ঘুরঘুর করছিলো।
মেয়েটির মাকে বললাম, ওকেতো আমি বেলা এগারোটার দিকে এই মসজিদের চারপাশে ঘুরাফেরা করতে দেখছি, উঁকিঝুঁকি মারছে দেখেছি। সাথে সাথে উনার খেয়াল হলো তাবিজের কথা। বলে উঠলেন, আল্লাহগো ওরে যে আমি তাবিজ ভরানোর জন্যে মোম বাতির কথা কইছিলাম মনে হয় মসজিদ থেকে মোমবাতি না বইলা নিয়ে গেছে।
বিষয়টি দ্রুত বড় হুজুরের কাছে খুলে বললে বড় হুজুর বুঝের সাথে ওকে জিজ্ঞেস করেন বাচ্চাটাও রাজি হয়। হুজুর তাৎক্ষণিক দোকান থেকে মেয়ের মাকে চারটা মোমবাতি কিনে আনতে বলেন। দ্রুততার সহিত মোমবাতি কিনে আনার হয়। এরপর হুজুর ওকে অজু করায়ে নেন। তওবা করান এবং উপস্থিত মুসল্লী সবাইকে নিয়ে আল্লাহর কাছে কান্নাকাটি করে মোনাজাত করেন। মোমবাতি চারখানা মিম্বারে রাখার বদৌলতে ওর পেটের ব্যথা ক্রমশই কমতে শুরু করে এবং কিছুক্ষণের মধ্যে ও পুরোপুরি সুস্থ হয়ে উঠে।