• ঢাকা, বাংলাদেশ শুক্রবার, ২৪ জুলাই ২০২৬, ১২:১৭ অপরাহ্ন
  • [কনভাটার]
শিরোনাম:

শ্রদ্ধা ও ঋণ প্রকাশে আমার লেখা তার জন্ম ও মৃত্যুদিনে || নুরকামরুন নাহার

রিপোর্টারের নাম / ৬৩ জন দেখেছে
আপডেট : মঙ্গলবার, ৯ ডিসেম্বর, ২০২৫

আমি সবচেয়ে বেশি বিস্ময় নিয়ে তাকাই তার দিকে। মানুষ এতেটা কাল অগ্রগামী কিভাবে হতে পারে! আমি এখন যেভাবে পৃথিবী দেখতে পারি, যেভাবে বই আর জীবনের পাঠ থেকে আনন্দ লুটে নিতে পারি, তার জন্যও সবচেয়ে বেশি আমি তার কাছেই ঋণী। আমার পরিবারের কিছু ঘনিষ্ঠ মানুষের পর আমি তাকেই সবচেয়ে বেশি ভালোবাসি।

রোকেয়ার শিক্ষা ভাবনাঃ যুগ অগ্রগামী প্রতিভা বেগম রোকেয়ার শিক্ষাভাবনা ছিল আধুনিক ও বাস্তবজ্ঞান সম্পন্ন। শিক্ষাকে তিনি কোন সীমাবদ্ধ গন্ডির মধ্যে আবদ্ধ রাখেননি। তার কাছে শিক্ষার সংজ্ঞা হচ্ছে- “শিক্ষা”র অর্থ কোন সম্প্রদায় বা জাতিবিশেষের অন্ধ অনুকরণ নহে। ঈশ্বর যে স্বাভাবিক জ্ঞান বা ক্ষমতা দিয়াছেন, সেই ক্ষমতাকে অনুশীলন দ্বারা বৃদ্ধি করাই শিক্ষা। ঐগুণের সদ্ব্যবহার করা কর্তব্য এবং অপব্যবহার করা দোষ”।

শিক্ষাকে তিনি সাধারণ জ্ঞানবুদ্ধির চর্চা বলে মনে করতেন। আমাদের মধ্যে যে সাধারণ বোধ ও বুদ্ধি বিদ্যমান তার চর্চা ও প্রয়োগকেই রোকেয়া শিক্ষা নামে অভিহিত করেছেন। জ্ঞান, বিবেক ও বুদ্ধির সদ্ব্যবহার মানুষকে কল্যাণ ও সমৃদ্ধির দিকে আহ্বান করে। বিবেক এবং বুদ্ধি থাকা সত্ত্বেও যদি তার অপব্যবহার করা হয়, শিক্ষা গ্রহণ করেও যদি তা মানুষের কল্যাণে ব্যবহার করা না হয় তবে তা কখনই প্রকৃত শিক্ষা হতে পারেনা।

“ঈশ্বর আমাদিগকে হস্ত, পদ, কর্ণ, মনঃ এবং চিন্তাশক্তি দিয়াছেন। যদি আমরা অনুশীলন দ্বারা হস্তপদ সবল করি , হস্ত দ্বারা সৎকার্য্য করি, এবং চক্ষুদ্বারা মনোযোগ সহকারে দর্শন( বা observe) করি,কর্ণ দ্বারা মনোযোগ পূর্ব্বক শ্রবণ করি এবং চিস্তা শক্তি দ্বারা আরও সূক্ষèাভাবে চিস্তা করিতে শিখি- তাহাই প্রকৃত শিক্ষা। আমরা কেবল পাশ করা বিদ্যাকে প্রকৃত শিক্ষা বলি না।”

“আমাদের জন্য এদেশে শিক্ষার বন্দোবস্ত সচরাচর এইরূপÑ প্রথমে আরবীয় বর্ণমালা, অতঃপর কোরাণ শরীফ পাঠ। কিন্তু শব্দগুলির অর্থ বুঝাইয়া দেওয়া হয় না, কেবল স্মরণশক্তির সাহায্যে টীয়াপাখীর মত আবৃত্তি কর”।

“সন্তান পালন ইহা সর্বপেক্ষা গুরুতর ব্যাপার। সন্তান পালনের সঙ্গে সঙ্গে সন্তানের শিক্ষা হইয়া থাকে।” অতএব সন্তান পালনের নিমিত্ত বিদ্যা বুদ্ধি চাই। যেহেতু মাতাই আমাদের প্রথম,প্রধান ও প্রকৃত শিক্ষয়েত্রী।

শিক্ষাকে রোকেয়া আজীবনই অত্যন্ত ব্যাপক পরিসরে কল্পনা করেছেন। একেবারে হাতে কলমে, শরীরে মনে শিক্ষাকে গ্রহণের বিষয়ে সোচ্চার হয়েছেন। রোকেয়ার মতে শিক্ষাকে অন্তরে ধারণ করতে হবে। প্রকৃত অর্থেই মনকে শিক্ষিত করে তুলতে হবে। দূর করতে হবে সকল কূপমন্ডুকতা। মূলত রোকেয়া তার যুগে নারী শিক্ষার প্রতি জোর দিয়েছিলেন। নারীদের অগ্রগতির জন্য শিক্ষা যে একান্ত অপরিহার্য এটি রোকেয়া সমস্ত অন্তঃকরণ দিয়ে বুঝতে পেরেছিলেন। নারীর জন্য তিনি যে শিক্ষার কথা বলেছিলেন তাও শুধুমাত্র পাঠ্য প্স্তুুক আর অক্ষর জ্ঞানের নয়। তিনি চেয়েছিলেন শিক্ষার প্রকৃত অর্থ অনুধাবন করে অন্তরকে আলোকিত করা। দেহে এবং মনে জেগে উঠা। চেয়েছিলেন প্রতিটি কাজে কর্মে জ্ঞান এবং বুদ্ধির প্রয়োগ। সকল কুসংস্কার অন্ধত্ব এবং সমাজ সৃষ্ট বৈষম্যের দূরীকরণে যে শিক্ষা প্রয়োজন রোকেয়া তাই প্রতিষ্ঠিত করতে চেয়েছিলেন।

রোকেয়া তাই বলেছিলেন-“ শিক্ষা বিস্তারই এইসব অত্যাচার নিবারণের একমাত্র মহৌষধ! অন্ততঃপক্ষে বালিকাদিগকে প্রাথমিক শিক্ষা দিতেই হইবে! শিক্ষা অর্থে আমি প্রকৃত সুশিক্ষার কথাই বলি; গোটা কতক পুস্তক পাঠ করিত বা দু’ছত্র কবিতা লিখিতে পারা শিক্ষা নয়। আমি চাই সেই শিক্ষাÑ যাহা তাহাদিগকে নাগরিক অধিকার লাভে সক্ষম করিবে, তাহাদিগকে আদর্শ কন্যা, আদর্শ ভগিনী, আদর্শ গৃহিণী এবং আদর্শ মাতারূপে গঠিত করিবে! শিক্ষাÑমানসিক এবং শারীরিক উভয়বিধ হওয়া চাই”।

রোকেয়ার এ উচ্চারণ মূলত নারী শিক্ষার জন্য ছিল। নারীদের জাগাবার জন্য, তাদের ঘুমন্ত ক্ষমতাকে জাগিয়ে তোলবার জন্য রোকেয়া সুশিক্ষার কথা বলেছিলেন। রেকেয়ার এ ভাবনা শুধু নারীদের জন্যই প্রযোয্য নয়। দেশ কাল পাত্র ভেদে এটি সার্বজনীনতা লাভ করেছে।

দেহ এবং মন যে ঘনিষ্ট সম্পর্কযুক্ত। মনের জেগে উঠার জন্য যে দেহের জড়তাও কাটাতে হবে এটি রেকেয়া বারবার বলেছিলেন। শারীরিক শিক্ষাকে রোকেয়া একেবারে প্রাত্যেহিক জীবনের সাথে সম্পৃত্ত করে সুন্দর ভাবে বর্ননা করেছেন-“শারীরিক শিক্ষার জন্য আমার মতে লাঠি ও ছোরা খেলা, ঢেঁকির সাহায্যে ধান ভানা, যাঁতায় আটা প্রস্তুত করা এবং যাবতীয় গৃহকর্মী শিক্ষা দেওয়া প্রশয়। এক ধান ভানা ও যাঁতা চালনায় দেশের সর্ব্ববৃহৎ খাদ্য সমস্যা পূরণ হইবে। অধুনা ঢেঁকিছাটা চাউল ও যাঁতায় পোষা আটার অভাবে দেশের লোক মৃত্যুস্রোতে ভাসিয়া চলিয়াছে”।

রোকেয়ার এ উচ্চারণও নারীদের মধ্যে বল সঞ্চারণের জন্য। সে যুগেই রোকেয়া নারীদের জন্য লাঠি এবং ছোরা খেলার কথা ভাবতে পেরেছিলেন। নারীদের জাগাবার জন্য, তাদের ঘুমন্ত ক্ষমতাকে জাগিয়ে তোলবার জন্য রোকেয়া সুশিক্ষাকেই প্রধান হাতিয়ার মনে করেছিলেন।

শিক্ষাকে রোকেয়া জীবিকা নির্বাহের পন্থা হিসাবে দেখতে চাননি। তাই বলেছেন আজিকালি অধিকাংশ লোকে শিক্ষাকে কেবল চাকুরী লাভের পথ মনে করে। রোকেয়া জানতেন শুধুমাত্র জীবিকার হাতিয়ার হিসাবে শিক্ষার প্রয়োজন নয়। শিক্ষার প্রয়োজন সকল ক্ষেত্রে তাই তিনি সুগৃহিনী গ্রন্থে বলেছিলেনÑ “পুরুষ বিদ্যালাভ করে অন্ন উপার্জনের আশায়। আমরা বিদ্যালাভ করিব কিসের আশায়? তবে আমরা উচ্চশিক্ষা (অথবা Mental Culture) করিব কিসের আশায়? আমি বলি সুগৃহিনী নিমিত্তই (Mental Culture) সুশিক্ষা আবশ্যক”।

রোকেয়ার শিক্ষা ভাবনা ছিল একক ও আধুনিক। রোকেয়া শিক্ষা পুকুর হতে তোলা জলের মতো সংরক্ষণ করা কোন কিছু মনে করেননি। শিক্ষাকে তিনি অস্থিমজ্জার সাথে মিলিত বিষয় বলে মনে করেছেন। জীবনের সর্বক্ষেত্রে সর্বপর্যায়ে শিক্ষার যে গুরুত্ব, অন্ধকারদূরীকরণে যে শিক্ষার বিচরণ তাই রোকেয়া তুলে ধরেছিলেন। আত্মিক উন্নতির বিষয়েই তাই রোকেয়া জোর দিয়েছেন। যাতে আমাদের মানসিক জগতের উচ্চতা বৃদ্ধি পায়। আর সমাজের সকল ক্ষেত্রে শিক্ষা এক অনন্য উন্নতি সাধন করতে পারেন।

“পরিশেষে বলি প্রেমিক হও, ধার্মিক হও বা নাস্তিক হও, যাই হইতে চাও, তাহাতেই মানসিক উন্নতির (Mental Culture-এর) প্রয়োজন। প্রেমিক হইতে গেলে নির্ভর ন্যায়পরতা, মাশুকের নিমিত্ত আত্মবিসর্জ্জন ইত্যাদি শিক্ষণীয়। নতুবা নির্ব্বোধ বন্ধু হইলে কাহারই উপকার করিতে পারিবে না। ধর্মসাধনের নিমিত্ত শিক্ষা দীক্ষার প্রয়োজন, কারণ “কে বে-ইল্মে না তওযাঁ খোদারা শেনাখ্ত”। অর্থাৎ জ্ঞান না হইলে ঈশ^রকে চেনা যায় না।”

রোকেয়া শিক্ষাকে আত্মস্থ করার জন্য বলেছিলেন, অন্তরে ধারণ করে তা অনুশীলনের জন্য বলেছিলেন। শিক্ষাকে এত বৃহৎ পরিসরে আবার এত ক্ষূদ্রাতিক্ষুদ্র বিষয়ে সম্পৃক্ত করে রোকেয়া যে শিক্ষাভাবনা উপহার দিয়েছেন তা সত্যি বর্তমান যুগেও এক বিস্ময়। বর্তমানে শিক্ষানীতি নিয়ে যে বিতর্ক। পাঠ্য বিষয়ের সাথে বাস্তব জীবন ও কর্মক্ষেত্রে শিক্ষা প্রয়োগের মধ্যে যে বিস্তর অসামঞ্জস্যতা শিক্ষাকে সঠিকভাবে প্রয়োগের যে ব্যর্থতা তা রোকেয়া অত্যন্ত বিচক্ষণতার সাথে চিহ্নিত করে তা সমাধানের পথও বাতলে দিয়েছিলেন। শিক্ষা বলতেই যে প্রতিষ্ঠানিক শিক্ষাকে বোঝানো ফলে নীতি, জ্ঞান এবং বিবেকের চর্চার যে ঘাটতি ঘটে এবং তাতে যে সামাজিক মূল্যবোধগুলোর অবক্ষয় হয় এবং ধীরে ধীরে শিক্ষার মান নিম্নগামী হয়ে আমাদের অন্ধকারের দিকে ঠেলে দেয় তা রোকেয়ার সেই একশত ছঁত্রিশ বছর পূর্বেই বুঝতে পেরেছিলেন। আমাদের র্দূভাগ্য রোকেয়ার সেই আধুনিক শিক্ষাভাবনাকে আজও আমরা কাজে লাগাতে পারিনি। যদি রোকেয়ার শিক্ষাভাবনাকে আমরা যথার্থভাবে গ্রহণ করতে পারতাম তবে আজ আমাদের সন্তানরা পাশসর্বস্ব এই শিক্ষা ব্যবস্থার করুণ শিকার হতো না। সমাজ এমনভাবে চিন্তাশূন্য ও জ্ঞানশূন্যতার আধারে নিমজ্জিত হতো না। রোকেয়ার শিক্ষাভাবনাকে যদি সঠিকভাবে গ্রহণ করা যায় তবে সমাজ এ সকল অভিশাপ থেকে মুক্ত হবে। শিক্ষাকে কাজে লাগিয়ে আগামী প্রজন্ম সুন্দর দেশ গড়তে পারবে।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরও সংবাদ

Archive Calendar

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
 
১০১১১২
১৩১৪১৫১৬১৭১৮১৯
২০২১২২২৩২৪২৫২৬
২৭২৮২৯৩০৩১