• ঢাকা, বাংলাদেশ শুক্রবার, ২৪ জুলাই ২০২৬, ০৫:১৫ পূর্বাহ্ন
  • [কনভাটার]
শিরোনাম:

চোর || নুর মোহাম্মদ নুর

রিপোর্টারের নাম / ১১০ জন দেখেছে
আপডেট : বুধবার, ১ এপ্রিল, ২০২৬

চোর-১ || নুর মোহাম্মদ নুর

আশির দশকের কথ। আমাদের গ্রামে তৎকালীন সময়ে চুরের ব্যপক প্রচলন ছিলো। চোরের অত্যাচার প্রত্যেকের জনজীবন অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছিল। পথেঘাটে, হাটে বাজারে যেখানে সেখানেই ছিল পকেটমারের যন্ত্রণা। যাদের বলা হতো ছেসরা চোর।

পাশের পাড়ার একজন দাগী চোর ছিল। নাম তার মাকাল চোর। ছোটবেলা থেকেই তার হাতটানের অভ্যাস ছিল বেশ। বড় হওয়ার সাথে সাথে দাগীচুরে রুপান্তরিত হয়।

আরেকজন চোর ছিলো পাশের গ্রামে। তার নাম সাক্কী চোর। সেও দাগি চোর এবং চোরদের সরদ্দার। চোর দু’টোই দেখতে বেটে ছিলো কিন্তু মোটাসোটা গন্ডারের মতো।

প্রায় সময়ই রাত্রির শেষভাবে শোনা যেতো পাড়ার কোন না কোন বাড়িতে চুরির ঘটনায় রাহাজানি। কান্না শুনে দৌড়ে গিয়ে দেখতাম ও বাড়িতে শিং খুড়ে চুর ঘরে ঢুকে সব নিয়ে গেছে। মাঝে মধ্যে গোয়াল ঘরের গরু চুরি করতে গিয়ে হাতেনাতে ধরা পড়া এসব ছিল চুরির নিত্যনৈমিত্তিক ব্যপার।

অধিকাংশ চুর ধরে বাড়ির উঠানে গাছের সাথে শক্ত দড়ি দিয়ে বেঁধে রাখতো। তবে সব লোকের আবার চোর পিটানোর অভ্যেস ছিলোনা।

তখন আমি ছোট। শুনলাম বাজারে চুর ধরা পড়েছে। আমাদের বাজারের নাম গুনারীতলা বাজার। প্রাচীন কাল থেকেই বাজারটির ঐতিহ্য দেশ সমাদৃত।

জেলা শহরের মত এ বাজারেও বড় বড় ব্যবসায়ীদের মোকামঘর, মিল ঘর, গোদামঘর, পাটের আড়ৎ স্বর্ণালংকারের দোকান ছিল। বস্তুত: ঐতিহাসিক স্থান ছিল এই গুনারীতলা বাজার। এখানে বৃটিশরা বসবাস করতো। নীল চাষ ছিল এই গুনারীতলায়। নীলকররা নীল কেনাবেচা করতো এই হাটে। সে সুবাধে আশির দশকেও বড়বড় ব্যবসায়ীদের নানা রকম ব্যবসা অপ্রতুল ছিলো।

শুনলাম প্রসিদ্ধ কাপড় ব্যবসায়ী মফিজ মাস্টার উরুফে (মফিজ পন্ডিত) সাহেবের দুতলা বিশিষ্ট কাপড়ের মোকামে চুর ঢুকে হাতেনাতে ধরা পড়েছে।

বন্ধু ক’জন দৌড়ে গেলাম দেখতে। অগনিত মানুষের ভীড়। ভীড় ঠেলে অনেক দূর গিয়েও চোর দেখার সুযোগ পেলাম না। বড়রা বলাবলি করতেছিল চোরকে গাছের ডালে নাকি টানাবে। সত্যিই কিছুক্ষণ পর দেখলাম চোরটাকে একটা প্রকান্ড বটগাছের ডালে ঝুলিয়ে পিটাচ্ছে।

চোর-২ || নুর মোহাম্মদ নুর

গুনারীতলা ঈদগাহ মাঠ। তখন সাত পাড়ার মুসল্লীই এই কেন্দ্রীয় ঈদগাহ মাঠে নামাজ আদায় করতো। আমি তখন ছোট। অন্য দশটা ছেলের মতো আমিও ঈদের আনন্দ নিয়ে নামাজের জন্য লাইন বদ্ধ হয়ে বসে আছি।

তৎকালীন সময়ে অত্র এলাকায় সাত পাড়াতেই শক্তিশালী মাতাব্বরদের শাসন ছিল এবং সেই সকল মাতাব্বরদের আবার নেতা ছিলেন মধ্যপাড়ার আব্দুল কাদের সরকার। যিনি কাদের চেয়ারম্যান নামেও পরিচিত।

হঠাৎ ঘোষণা হলো বক্তব্য রাখবেন জনাব আব্দুল কাদের সরকার। সেই সুঠাম দেহের অধিকারী ছিলেন তিনি। যেমন উচালম্বা তেমনি দেহের গঠন এবং বলিষ্ঠ কন্ঠের অধিকারী।

মাইক ধরেই বলে উঠলেন, প্রিয় এলাকাবাসী আজ আনন্দের দিন। এমন দিনে আমাকে অত্যন্ত দুখের সাথ্র বলতে হচ্ছে একটা কষ্টের কথা। যার জন্য আমি আপনাদের কাছ থেকে ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি।

প্রিয় উপস্থিতি, গতকাল রাতে আমার গ্রামে একেএকে পাঁচটি কোরবানির গরু চুরি হয়েছে। বিশ্বস্থ সূত্রে আমি জানি গরুগুলো কোথায় রাখা হয়েছে। তাই আপনারা অনুগ্রহ করে আমার সাথে অদ্য নামাজান্তে সকলেই যাবেন চোর ধরতে।

মুসল্লীগণ একবাক্যে স্বীকার করলেন এবং নামাজ শেষ করে দলেদলে নেতার পিছে ছুটলেন। উল্লেখ যে সেদিনের সেই মিছিলে আমিও অগ্রগামী ছিলাম।

আঁধা কিলোমিটার পথ। মুসল্লী সকলে চোরদের বাড়ি ঘেরাও করে নিলো। বাড়ির মহিলারা লাঠিসোঁটা দা’বটি নিয়ে পরস্তে পরস্তে আক্রমণ করতে এসে ব্যর্থ হলো।

অবশেষে চোরের সরদ্দারকে ধরে ফেলা হলো। তার তথ্যমতে পাশেই একটা বালুকাময় চরে পাঁচটা গরুর জবাই করে দেহ পুতে রাখা বালির নিচ থেকে বের করা হলো।

চোরের সরদ্দারকে গুনারীতলা স্কুল ফিল্ডে আনা হয়। সমবেত জনতার উপচে পড়া ভীড়। সবারই আক্ষেপ তুংগে। ধর শালারে, মার শালারে। সেদিন যার এতটুকুও দেহে রাগ ছিলোনা সেও এই ঘটনায় সীমাহীন রাগে ফেটে পড়েছিল।

আগেই বলেছি। সবাই চোর মারতে পারেনা। চোর মারার জন্য চাই বিস্তর কলিজা ভরা সাহস আর শক্তি।

তেমনি শক্তিধর ও সাহসী কয়জনে ইচ্ছে মত পায়ের পাতায় পিটায়। এক পর্যায়ে তার হাতের কনুই দু’টিও ভেংগে দেয়। একটা চোখও তার টেরা করে দেয় সেদিন।

চোর-৩ || নুর মোহাম্মদ নুর

আশির দশক। বস্তুতই আমি তখন ছোট। ছোট হলেও ক্লাস ফোরে পড়ি। তখন পাট চাষের মৌসুম। পুরো গ্রামকে গ্রামে পাট ক্ষেতে ছেয়ে গেছে। বিশেষ করে তৎকালীন সময়ে আমাদের গ্রামে ধান আর পাট চাষ দুটোই ছিল প্রসিদ্ধ।

পশ্চিম পাড়া খালের ধারে আমাদের কিছু পাট ক্ষেত ছিল। দুপুরে মা বললেন, পাটকাটা লোকদের জন্য খারার নিয়ে যাহ। আমি যথারীতি খাবার নিয়ে যাই এবং কাজের লোকেরা খাবার খেতে বসলে।

আমি ক্ষেতের বাতর ধরে হাটতে হাটতে খাল পাড়ের দিকে যাই। কিছুদূর যেতেই একটা চাপা কান্নার শব্দ আমার কানে আসে। আমি ভয় পেয়ে যাই। দৌড়ে কাজের লোকদের কাছে যাই। তারা আমার হতভম্বতা দেখে বিচলিত হয়।

কিরে কি হইছে। ভয় পাইছিস। কি সমস্যা। আমি ফুপিয়ে ফুপিয়ে বলি, একটা মানুষের কান্না শুনলাম। আমার কথা শুনেই আমার মেঝোভাই খাবার রেখেই পাটকাটা ধারালো বাকিটা হাতে নেয় আমাকে বলে তুইও একটা নেহ।

দু’জনেই ধারালো বাকি হাতে দৌড়ে যাই খাল পাড়ের দিকে আর চিল্লাতে থাকি চোর চোর চোর। সত্যিই চোর। মেঝো ভাই যা ভেবেছিলো তাই ঘটেছে।

পাশের গ্রাম ভেলামারি। সে গ্রামের একটা মেয়ে আমাদের গুনারীতলা হাইস্কুলে পড়ালেখা করে। প্রায় কোয়ার্টার কিলো দু’পায়ের পথ দুপাশেই পাটগাছে ভরা। সেই পাটক্ষেত পার হয়ে প্রতিদিন স্কুলে যাতায়াত করে। আর পাশেই ছিল এক দাগি চোরের বাড়ি। নাম তার মাকাল চোর।

আমাদের হাতে ধারালো অস্র দেখে চোর সেই মেয়েটিকে ছেড়ে দিয়ে দৌড়ে পালায়। দেখলাম মেয়েটি মুখ বাধা অবস্থায় দৌঁড়ে বাড়ি যাচ্ছে।

কিছু ক্ষনের মধ্যেই অনেক মানুষ লাঠিসোঁটা নিয়ে এসে চোরের বাড়িঘর তছনছ করে দেয়। চোরটাকে পায়না। পরিশেষে আমাদের কাছে এসে মেয়েটির ভাইয়েরা কৃতজ্ঞতা জানিয়ে যায়। বলে, ভাই আজ আপনাদের উসীলায় আমার বোনের সম্ভ্রম রক্ষা হলো।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরও সংবাদ

Archive Calendar

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
 
১০১১১২
১৩১৪১৫১৬১৭১৮১৯
২০২১২২২৩২৪২৫২৬
২৭২৮২৯৩০৩১