বিশ্বকাপ ফুটবল ২০২৬ ফাইনালে মুখোমুখি হচ্ছে আর্জেন্টিনা ও স্পেন। রবিবার বাংলাদেশ সময় রাত ১টায় যুক্তরাষ্ট্রের নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত হবে বহুল প্রতীক্ষিত এই মহারণ। দুই ফুটবল পরাশক্তির লড়াই ঘিরে বিশ্বজুড়ে যেমন উন্মাদনা তৈরি হয়েছে, তেমনি বেড়েছে ফাইনালের টিকিটের দামও।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক টিকিট বিক্রির প্ল্যাটফর্ম টিকপিকের তথ্য অনুযায়ী, আর্জেন্টিনা-স্পেন ফাইনালের টিকিটের গড় ক্রয়মূল্য বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১১ হাজার ৩২৭ ডলারে। বাংলাদেশি মুদ্রায় যার পরিমাণ প্রায় ১৪ লাখ টাকা।
মেটলাইফ স্টেডিয়ামের দর্শক ধারণক্ষমতা প্রায় ৮৩ হাজার। গড় টিকিট মূল্যের হিসাবে এ ম্যাচের টিকিট বিক্রি থেকে আয় হতে পারে প্রায় ১১ হাজার ৫৮৫ কোটি টাকা।
এবারের ফাইনালের সবচেয়ে কম দামের টিকিটও সাধারণ দর্শকদের নাগালের বাইরে। এর মূল্য ৭ হাজার ৬৭৬ ডলার, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৯ লাখ ৪৫ হাজার টাকা। অন্যদিকে সবচেয়ে দামি টিকিটের মূল্য ২৮ হাজার ৪৭৯ ডলার বা প্রায় ৩৫ লাখ টাকা।
টিকপিকের হিসাব অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের ক্রীড়া ইতিহাসে এবারের বিশ্বকাপ ফাইনালের টিকিট সবচেয়ে ব্যয়বহুল। এর আগে ২০২৪ সালের সুপার বোল এলভির ফাইনালের টিকিটের গড় মূল্য ছিল ৯ হাজার ৪১১ ডলার।
এবারের বিশ্বকাপে টিকিট বিক্রি হচ্ছে রিসেল পদ্ধতিতে। বিশ্বকাপ শুরুর আগে ফিফা ম্যাচগুলোর জন্য প্রাথমিক মূল্য নির্ধারণ করেছিল। তবে ম্যাচের গুরুত্ব ও চাহিদা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে টিকিটের দামও বেড়েছে।
ফাইনালের জন্য ফিফার নির্ধারিত সর্বোচ্চ টিকিট মূল্য ছিল ১০ হাজার ৯৯০ ডলার। পরে চাহিদার কারণে সেই দাম বেড়ে প্রায় ২৮ হাজার ৫০০ ডলারে পৌঁছেছে। ফিফার এই মূল্যবৃদ্ধির নীতিকে ঘিরে সমালোচনাও তৈরি হয়েছে। অনেকেই এটিকে ‘ফিফার ব্ল্যাক টিকিট’ বলে মন্তব্য করেছেন।
আর্জেন্টিনা ও স্পেনের এই মহারণ শুধু মাঠের লড়াই নয়, বাণিজ্যিক দিক থেকেও এবারের বিশ্বকাপের অন্যতম আলোচিত ঘটনা হয়ে উঠেছে।
উল্লেখ্য, আধুনিক বিশ্বে ফুটবল এখন শুধু মাঠের প্রতিদ্বন্দ্বিতা নয়, এটি পরিণত হয়েছে বিশাল এক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে। পর্যটন, কর্মসংস্থান, অবকাঠামো উন্নয়ন, বাণিজ্য ও আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডিংয়ের মাধ্যমে বিশ্বকাপ স্বাগতিক দেশ ও শহরগুলোর অর্থনীতিতে বড় ধরনের প্রভাব ফেলে।
২০২৬ সালের বিশ্বকাপকে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ফুটবল আয়োজন হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। প্রথমবারের মতো ৪৮টি দেশ অংশ নিচ্ছে এই টুর্নামেন্টে। যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোর যৌথ আয়োজনে ১৬টি শহরে অনুষ্ঠিত হচ্ছে বিশ্বকাপের ম্যাচ। মাঠে বসে খেলা উপভোগ করছেন প্রায় ৬৫ লাখ দর্শক।
এই আয়োজনকে ঘিরে মোট ব্যয় ধরা হয়েছে অন্তত ১৩ দশমিক ৯ বিলিয়ন ডলার। এর মধ্যে পর্যটকদের ব্যয়ই সবচেয়ে বেশি, প্রায় ৭ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার। পাশাপাশি রয়েছে ফিফার পরিচালন ব্যয়, স্বাগতিক শহরগুলোর প্রস্তুতি খরচ এবং অবকাঠামো উন্নয়নে বড় বিনিয়োগ।
২০২৬ বিশ্বকাপের জন্য ফিফা প্রাইজমানি ও সংশ্লিষ্ট ব্যয় বাবদ মোট ৮৭১ মিলিয়ন ডলার বরাদ্দ করেছে। বাংলাদেশি মুদ্রায় এর পরিমাণ প্রায় ১০ হাজার ৭৪৬ কোটি টাকা।
এর মধ্যে ৬৫৫ মিলিয়ন ডলার রাখা হয়েছে দলগুলোর পারফরম্যান্সভিত্তিক পুরস্কারের জন্য। বাকি ২১৬ মিলিয়ন ডলার ব্যয় হবে প্রস্তুতি, ভ্রমণ, আবাসন, লজিস্টিকস ও প্রতিনিধি দল পরিচালনায়।
ফিফার ঘোষণা অনুযায়ী, বিশ্বকাপে অংশ নেওয়া প্রতিটি দল নিশ্চিতভাবে পাবে ১০ মিলিয়ন ডলার কোয়ালিফিকেশন ফি এবং প্রস্তুতি ও প্রশাসনিক খরচ বাবদ আরও ২ দশমিক ৫ মিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ মাঠে নামার আগেই প্রতিটি দলের আয় নিশ্চিত ১২ দশমিক ৫ মিলিয়ন ডলার।
টুর্নামেন্টের চ্যাম্পিয়ন দল পারফরম্যান্স পুরস্কার হিসেবে পাবে ৫০ মিলিয়ন ডলার। রানার্সআপ দল পাবে ৩৩ মিলিয়ন ডলার। তৃতীয় ও চতুর্থ স্থান অর্জনকারী দল পাবে যথাক্রমে ২৯ ও ২৭ মিলিয়ন ডলার।
কোয়ার্টার ফাইনাল থেকে বিদায় নেওয়া প্রতিটি দল পাবে ১৯ মিলিয়ন ডলার। কোয়ালিফিকেশন ও প্রস্তুতি বাবদ পাওয়া অর্থ যোগ করলে তাদের মোট আয় দাঁড়াবে ৩১ দশমিক ৫ মিলিয়ন ডলার।
শেষ ষোলো থেকে বিদায় নেওয়া দলগুলোর জন্য বরাদ্দ ১৫ মিলিয়ন ডলার। সব মিলিয়ে তাদের আয় হবে ২৭ দশমিক ৫ মিলিয়ন ডলার। রাউন্ড অব ৩২ থেকে বাদ পড়া দলগুলো পাবে ১১ মিলিয়ন ডলার, যা যোগ হয়ে মোট ২৩ দশমিক ৫ মিলিয়ন ডলারে পৌঁছাবে।
গ্রুপ পর্ব থেকে বাদ পড়া দলগুলোর জন্যও রয়েছে আর্থিক পুরস্কার। তারা পাবে ৯ মিলিয়ন ডলার, ফলে মোট প্রাপ্তি হবে ২১ দশমিক ৫ মিলিয়ন ডলার।
ফিফার তথ্য অনুযায়ী, ৪৮ দলের বিশ্বকাপ আয়োজনের ফলে সম্প্রচারস্বত্ব, স্পনসরশিপ, টিকিট বিক্রি ও বাণিজ্যিক আয়ে বড় ধরনের প্রবৃদ্ধি হয়েছে। অতিরিক্ত আয়ের একটি বড় অংশ অংশগ্রহণকারী দেশগুলোর মধ্যে বিতরণ করতেই এবারের প্রাইজমানি ইতিহাসের সর্বোচ্চ পর্যায়ে নেওয়া হয়েছে।
তবে বাছাইপর্বে অংশ নেয় বিশ্বের প্রায় সব দেশের জাতীয় দল। বিশ্বকাপ থেকে অর্জিত আয়ের একটি অংশ সদস্য দেশগুলোর উন্নয়ন কার্যক্রমে বরাদ্দ দেয় ফিফা। সেই অর্থের অংশ পাবে বাংলাদেশও।
ফিফার গবেষণা অনুযায়ী, ২০২৬ বিশ্বকাপ বৈশ্বিক অর্থনীতিতে প্রায় ৮০ দশমিক ১ বিলিয়ন ডলারের অর্থনৈতিক উৎপাদন তৈরি করবে। এর মাধ্যমে বৈশ্বিক জিডিপিতে যুক্ত হবে প্রায় ৪০ দশমিক ৯ বিলিয়ন ডলার।
সবচেয়ে বেশি লাভবান হবে যুক্তরাষ্ট্র। দেশটির অর্থনীতিতে অন্তত ৩০ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার যুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। জিডিপিতে যোগ হবে ১৭ বিলিয়ন ডলারের বেশি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বিশ্বকাপ থেকে সবচেয়ে বেশি সুবিধা পাবে পর্যটন, হোটেল-রেস্তোরাঁ, পরিবহন, খুচরা বাণিজ্য, নির্মাণ, বিজ্ঞাপন, সম্প্রচার ও বিভিন্ন সেবাখাত। ফলে ফুটবলের এই মহাযজ্ঞ এখন কেবল শিরোপার লড়াই নয়, এটি বিশ্ব অর্থনীতিরও অন্যতম বড় আয়োজন।