১৯৭১ সালের কথা। এপ্রিলের তৃতীয় সপ্তাহ। ভারতের দ্য স্টেটসম্যান পত্রিকার সাংবাদিক এবং পরবর্তীতে সম্পাদক মানস ঘোষ তাঁর পত্রিকায় একজন মুক্তিযোদ্ধার একটি ছবি প্রকাশ করেন। এরপর চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে আলোড়ন। ছবিটি প্রকাশের পর ভারত ও বাংলাদেশের মানুষ জানতে পারে, সেই মুক্তিযোদ্ধা আসলে একজন নারী। পুরুষের বেশে তিনি সহযোদ্ধাদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে পা/কিস্তানি হা/নাদার বা/হিনীর বি/রুদ্ধে রু/খে দাঁড়িয়েছিলেন এবং পাবনার বিভিন্ন র/ণাঙ্গনে সশ/স্ত্র ল/ড়াই করেছিলেন। এই মহীয়সী নারীই একাত্তরের “প্রীতিলতা” নামে পরিচিত শিরিন বানু মিতিল।
শিরিন বানুর জন্ম ১৯৫০ সালের ২ সেপ্টেম্বর পাবনায়। তার মা সেলিনা বানু ছিলেন পাবনা জেলার ন্যাপের সভাপতি এবং পরবর্তীতে যুক্তফ্রন্ট সরকারের প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য। বাবা খন্দকার শাহজাহান মোহাম্মদ ছিলেন পাবনা জেলা কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে যুক্ত। তার মামারা ছিলেন গান্ধীর অ/স/হযোগ আ/*ন্দোলনের কর্মী।
অকুতোভয় এই নারী পাবনা এডওয়ার্ড কলেজে বাংলা বিষয়ে স্নাতক অধ্যয়নকালে সমাজ, প্রথা ও বাধা ভেঙে মাত্র ২০ বছর বয়সে পুরুষের পোশাক পরে অ/ স্ত্র হাতে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন এবং জীবনের ঝুঁকি নিয়ে র/ণাঙ্গনে সক্রিয় থাকেন।
একদিনের ঘটনা আজীবন নাড়া দিত শিরিন বানু মিতিলকে। তিনি বলেছিলেন, ‘আমি যখন কুষ্টিয়া থেকে চুয়াডাঙ্গার দিকে যাচ্ছিলাম৷ তখন একদিন গভীর রাতে আমাদের দলটিকে পথের মাঝে আটকানো হয়৷ মূলত ওই অঞ্চলে পাকস্তানি সে/নাদের প্রতিরো/ধ করতেই সতর্কতামূলক পাহারায় যারা ছিল তারা আমাদের পরিচয় জানতে চায়৷ আমরা পরিচয় দিলেও তারা প্রথমে সেটা বিশ্বাস করতে চাচ্ছিল না৷ কারণ আমাদের সঙ্গে যিনি আরআই ছিলেন তিনি ছিলেন পশ্চিমবঙ্গের৷ ফলে তার ভাষার টান ছিল বি/হারিদের মতো৷ তাই আমরা যে সত্যি মুক্তিযোদ্ধা তার প্রমাণ চাইল৷ তখন পরিস্থিতির শিকার হয়ে আমাদের একজন বলতে বাধ্য হলো যে, ‘আপনারা কি আকাশবাণীতে শিরিন বানুর কথা শুনেছেন?’ তারা বলল যে, ‘হ্যাঁ, আমরা তাঁর কথা শুনেছি৷’
‘তখন বলা হলো, আমাদের সঙ্গে সেই শিরিন বানু আছে৷ সেই সময় আমি খুব সন্দিহান ছিলাম যে, এতো বড় দলের ভেতরে ছদ্মবেশে একজন মেয়ে আছে, এটাকে তারা হয়তো অন্যভাবে দেখবে৷ কিন্তু, আমার পরিচয় জানার পরেই দেখা গেল, তারা সবাই আমাকে ঘিরে ধরল৷ তাদের মধ্যে এক বৃদ্ধ পিতা আমার কাছে এগিয়ে এসে আমার মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন, ‘মা আমরা আর ভয় করি না৷ আমাদের মেয়েরা যখন আমাদের সঙ্গে অ/ স্ত্র হাতে যু/ দ্ধ করে তখন বিজয় আমাদের হবেই৷’ তার কথা শুনে আমি খুব অবাক হয়েছিলাম এবং তখন মনে হয়েছিল, সারাদেশের মানুষ কীভাবে স্বাধীনতার জন্য উদ্দীপনা ও উৎসাহ নিয়ে পরস্পরের দিকে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিচ্ছে৷’
সবচেয়ে কষ্টের বিষয় হলো- দেশ স্বাধীনের পর আমরা এই অসামান্য মুক্তিযোদ্ধাকে যথাযোগ্য সম্মান দিতে পারিনি। আমলাতান্ত্রিক জটিলতার অজুহাতে দীর্ঘদিন বন্ধ রাখা হয়েছিল তার মুক্তিযোদ্ধা ভাতা। জীবিত থাকাকালে মুক্তিযোদ্ধা তালিকায় স্থগিত করে রাখা হয়েছিল তাঁর নাম। যদিও তিনি মুক্তিযোদ্ধা ভাতা কিংবা সম্মানের আশা কখনোই করেননি।