• ঢাকা, বাংলাদেশ বৃহস্পতিবার, ২৫ জুন ২০২৬, ০৪:২২ পূর্বাহ্ন
  • [কনভাটার]

একাকী প্রবীণের বিয়ে: সমাধান, নাকি নতুন সংকট? -হাসান আলী

রিপোর্টারের নাম / ৭৮ জন দেখেছে
আপডেট : বুধবার, ১১ মার্চ, ২০২৬

মানুষের জীবনে বার্ধক্য এমন এক সময়, যখন তার সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন হয় সঙ্গ, সহানুভূতি এবং মানসিক নিরাপত্তা। দীর্ঘ জীবনের পথচলায় স্ত্রী বা স্বামী হয়ে ওঠেন সবচেয়ে কাছের মানুষ, সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য সঙ্গী। কিন্তু সেই সঙ্গী যদি হঠাৎ করেই মৃত্যুর মাধ্যমে বা অন্য কোনো কারণে বিচ্ছিন্ন হয়ে যান, তখন প্রবীণ মানুষটি যেন জীবনের এক গভীর শূন্যতার মধ্যে পড়ে যান।

আমাদের সমাজে এমন পরিস্থিতিতে একটি সাধারণ প্রবণতা দেখা যায়—প্রবীণ পুরুষ একা হয়ে পড়লে পরিবার, আত্মীয়স্বজন, এমনকি প্রতিবেশীরাও দ্রুত তার বিয়ের কথা চিন্তা করেন। তারা মনে করেন, নতুন একজন সঙ্গী এলে তার নিঃসঙ্গতা দূর হবে, জীবনে আবার স্বাভাবিকতা ফিরে আসবে। কথাটি আংশিক সত্য হলেও বাস্তবতা অনেক সময় ভিন্ন হয়।

প্রথমত, প্রবীণ বয়সে বিয়ে মানেই নতুন একটি সম্পর্কের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার কঠিন চ্যালেঞ্জ। দীর্ঘদিনের অভ্যাস, জীবনযাত্রা, মানসিকতা—সবকিছুই তখন স্থির হয়ে যায়। সেখানে নতুন একজন মানুষ এসে সেই জায়গা পূরণ করতে পারেন না সহজে। অনেক সময় দেখা যায়, এই বিয়ে প্রবীণের মানসিক শান্তি না বাড়িয়ে বরং নতুন অশান্তির জন্ম দেয়।

আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, প্রবীণ পুরুষের বিয়েতে যারা উৎসাহ দেন, তাদের উদ্দেশ্য সব সময় নিখুঁত মানবিক হয় না। কখনো কখনো পরিবার চায়, নতুন স্ত্রী এসে প্রবীণ মানুষটির দেখাশোনা করবেন, তার সেবা করবেন। অর্থাৎ বিয়েটি হয়ে ওঠে ভালোবাসার নয়, দায়িত্ব হস্তান্তরের একটি মাধ্যম। এতে প্রবীণ ব্যক্তি নিজেও অনেক সময় নিজেকে বোঝা মনে করতে শুরু করেন।

কিন্তু এই জায়গায় সবচেয়ে বড় বৈষম্যটি দেখা যায় প্রবীণ নারীর ক্ষেত্রে। একজন প্রবীণ নারী যদি স্বামী হারান, তখন তার বিয়ের কথা খুব কম মানুষই ভাবেন। বরং সমাজ তার কাছে আশা করে, তিনি একা থাকবেন, সন্তানদের সঙ্গে থাকবেন, নাতি-নাতনিদের দেখবেন এবং বাকি জীবন স্মৃতিকে আঁকড়ে ধরে কাটিয়ে দেবেন। তার ব্যক্তিগত চাওয়া, তার একাকীত্ব, তার মানসিক চাহিদা—এসব বিষয় খুব কমই গুরুত্ব পায়।
আরও আশ্চর্যের বিষয় হলো, যে ছেলে বা মেয়ে বাবার বিয়ের জন্য খুব আগ্রহ দেখায়, সেই একই ছেলে বা মেয়ে মায়ের বিয়ের প্রসঙ্গে তীব্র আপত্তি জানায়। তারা মনে করে, এটি সামাজিকভাবে গ্রহণযোগ্য নয়, এটি অসম্মানজনক। এই দ্বৈত মানসিকতা আমাদের সমাজের গভীরে থাকা বৈষম্যেরই প্রতিফলন।

ফলাফল হিসেবে দেখা যায়, প্রবীণ পুরুষের দ্বিতীয় বিয়ে অনেক সময় পারিবারিক দূরত্ব তৈরি করে। সন্তানরা মানসিকভাবে দূরে সরে যায়, নতুন স্ত্রীর সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক হয় না। অন্যদিকে, নতুন স্ত্রীও অনেক সময় নিজেকে এই পরিবারের অংশ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে পারেন না। এতে করে প্রবীণ মানুষটি দুই দিক থেকেই বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন।

সবচেয়ে বড় কথা, আমরা অনেক সময় প্রবীণ মানুষটির নিজের মতামত জানতে চাই না। তিনি সত্যিই বিয়ে করতে চান কিনা, নাকি শুধু মানসিক সঙ্গ চান—এই প্রশ্নটি আমরা করি না। আমরা ধরে নিই, বিয়েই একমাত্র সমাধান। কিন্তু বাস্তবে একজন প্রবীণ মানুষের সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন সম্মান, ভালোবাসা এবং বোঝাপড়া।

বার্ধক্যে বিয়ে কোনো অপরাধ নয়, আবার এটি কোনো বাধ্যতামূলক সমাধানও নয়। এটি সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত একটি সিদ্ধান্ত হওয়া উচিত। পরিবার, সমাজ বা আত্মীয়স্বজনের চাপের কারণে নেওয়া সিদ্ধান্ত অনেক সময় জীবনের শেষ অধ্যায়কে আরও জটিল করে তোলে।

আমাদের সমাজের উচিত প্রবীণ মানুষদের মানুষ হিসেবে দেখা—শুধু বাবা বা মা হিসেবে নয়। তাদের অনুভূতি আছে, তাদের চাওয়া আছে, তাদেরও একাকীত্ব আছে। তারা বিয়ে করবেন কিনা, সেটি তাদের নিজের সিদ্ধান্ত হওয়া উচিত।
একই সঙ্গে আমাদের এই বৈষম্যমূলক মানসিকতা থেকেও বেরিয়ে আসতে হবে। যদি আমরা প্রবীণ পুরুষের বিয়েকে স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করতে পারি, তাহলে প্রবীণ নারীর ক্ষেত্রেও একই দৃষ্টিভঙ্গি রাখা উচিত।

জীবনের শেষ সময়ে একজন মানুষ সবচেয়ে বেশি যা চান, তা হলো—একটু শান্তি, একটু সম্মান, আর একটু আপনজনের সান্নিধ্য। সেই সান্নিধ্য বিয়ের মাধ্যমে আসতে পারে, আবার সন্তানদের ভালোবাসা বা সমাজের সহানুভূতির মাধ্যমেও আসতে পারে।

তাই প্রবীণের বিয়ে নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে আমাদের উচিত তার হৃদয়ের কথা শোনা। কারণ জীবনের শেষ অধ্যায়টি যেন নতুন সংকটে নয়, বরং শান্তি ও মর্যাদায় পূর্ণ হয়—সেটিই হওয়া উচিত আমাদের সবার লক্ষ্য।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরও সংবাদ