৮৮’র বন্যা, ভয়ংকর মৃত্যু শোক অতঃপর ||. নুর এমডি চৌধুরী
রিপোর্টারের নাম
/ ৯২
জন দেখেছে
আপডেট :
সোমবার, ১৮ আগস্ট, ২০২৫
শেয়ার
১৯৮৮ সালের কথা। প্রলয়ংকারী বন্যার কবলে পড়েছিলাম আমরা গুনারীতলারবাসী। শুধু গুনারীতলাবাসী নয় সমস্ত মাদারগঞ্জবাসী মেলান্দহবাসী তথা একএক করে আমাদের পুরো দেশটাই পানিবন্দী হয়েছিল।
আশ্রয়হীন হয়ে পড়েছিল সারা দেশের ৬০ শতাংশ মানুষ।
বন্যার কারণে বিশুদ্ধ পানির অভাব দেখা দিয়েছিল। ডায়রিয় কলেরা, টাইফয়েডসহ বিভিন্ন পানিবাহিত রোগের প্রাদুর্ভাব। সাপ, পোকামাকড়ের উপদ্রব, প্রতিদিন মৃত্যু খবর লাশের সংখ্যা ক্রমশই ভারি হতে থাকে। একসময় পানির তীব্রতা এতোটাই প্রবল হয়য় যে উচু জায়গা বলতে কিছু আর অবশিষ্ট থাকেনা।
ঘরে পানি থৈথৈ রাস্তায় গরু ছাগলের জায়গা হলেও মানুষ যায় কই? মানুষ যে যেভাবে পারে বন্যার মোকাবেলা করতে থাকে। কেউ কলাগাছের ভেলায় উচু বিছানা করে কেউ ঘরের শক্ত খুটিতের সাথে চকি টাঙিয়ে কেউ আবার নির্বাক নির্ঘুম সাপ পোকা বিচ্ছুদের সাথে একাত্মতা করে রাত কাটায়।
আগেই বলেছি প্রলয়ঙ্কারী বন্যায় জীবন মত্যুর সন্ধিক্ষণে মানুষ পশুপাখি ঘরবাড়ি কোথাও কেউ ভালো নেই। তার মধ্যে মনে হয় আমাদের মাদারগঞ্জের বন্যা পরিস্থিতি ছিল একেবারেই ভয়ংকর। শত বছরের রেকর্ড ভঙ্গ করেছিল সেবার বিপদসীমার ১৬৬ সেন্টিমিটার ওপরে প্রবাহিত হয়েছিল পানি।
সেকালে বিদ্যুৎ এর বালাই ছিলোনা। ঘুটঘুটে অন্ধকার রাত আর মেঘের গুমুরগুমুর ডাক, বেঙের ঘেঙর ঘেঙর বাতাসের শোশো শব্দে মনে হয়েছিল এই বুঝি মহাপ্রলয়ের ডাক এলো।। মরন তখন চোখের খুব কাছাকাছি বাস করতো।
সেকালে অধিকাংশ মানুষ দারিদ্র্য সীমার নীচে বাস করতো। দিনমজুরগুলোর সংসার চলতো প্রতিদিনের উপার্জনের টাকা দিয়ে। তখনতো বন্যায় প্লাবিত ফসলের মাঠ। গ্রামের যারা বিত্তবান ছিলেন তাদের ফসলের ক্ষেততো ডুবে গেছে কাজের লোক নিয়ে করবে কি? হায়রে জীবন! বিচিত্র জীবন! এক-একটা জীবনের যেন এক-একটা বিচিত্র গল্প। যে গল্প দুঃখ আর বেদনা দিয়ে গড়া। অসুখে কাতরাচ্ছে বয়োবৃদ্ধ মানুষগুলো। ঔষধ নেই পথ্য নেই চুলা জ্বালাবার কোন ব্যবস্থা নেই।এমনিতেই দুঃখী আর সেসময় যেন দুঃখের আকাশ ভেঙে ভেঙে পড়ছে। একজন যে আরেকজনের বিপদে এগিয়ে আসবে সে উপয়াও নেই। একটা কেয়ামতের নিদর্শন যেন দেখেছি আমরা।
তখনও ঝারকাটা নদীর পানি রাস্তায় উঠতে তিন ফিট বাকী। তবে স্রোতের এতটাই তীব্রতা ছিল যে এর ঘূর্ণণ দেখলে ভিতরটা দুমড়ে মুচড়ে একাকার হয়ে যায়। আমি একাই আমার পড়ার ঘরে। ঘরটা আমাদের মেইন ঘর থেকে অনেকটাই দূরে। বড় সখ করে কত দূর দূরান্ত থেকে ফুলের চাড়া সংগ্রহ করে বাগান তৈরি করেছি। মাধবীলতা গাছটি দিয়ে সুন্দর একড়া ইউ সেপ গেইট করেছি। চতুর্দিকটা কুচকাটা গাছ দিয়ে দীর্ঘদিনে বাউন্ডারি করে তুলেছি। রজনীগন্ধা, গন্ধরাজ ,বেলী,জুই,চামেলি, গোলাপ,গাদা, রক্তজবা,ডালিয়া, সূর্যমুখী, ছোটছোট নানা প্রকার টাইমফুলে সুসজ্জিত করে তুলেছি স্বাধের বাগানটি। দুপায়ে চলার রাস্তা, রাস্তা দুপাশ দিয়েই নিজ হাতে ইট গেরে গেরে পরিপাটি রাস্তা করেছি যাতে করে গেইট দিয়ে ঢুকে সুন্দর বাগানের চারদিকে ঘুরে বেরিয়ে যেতে পারে।
মন ভীষণ ভাবে বিপর্যস্থ। বারবার বাগানটার দিকে তাকাই আর অশ্রুসিক্ত হই। জীবনে সেই ছিলো আমার প্রথম হৃদয় ভাংগার কষ্ট। সারাদিন সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত একাজ ওকাজ করে করে ক্লান্ত হয়ে পড়েছি। সেদিন আর মায়ের দেওয়া কোন আদেশের অমান্য করিনি। শান্ত ছেলের মত যা বলেছেন তাই করেছি মা-ও সেদিন বেশ খুশি হয়েছিলেন।
রাতের খাবার খেয়ে পড়ার ঘরে ঢুকেছি। পড়ালেখাতো নাই যে সীমাহীন দুর্যোগের অশনি সংকেত এমন সময় কি আর পড়ার সময় থাকে। টেনশন আর টেনশন শুধু বাচার টেনশন। তারুপর ছেলে মানুষ টেনশনে বেশ কাবু হয়ে পড়েছি। শুনেছি এবার নাকি প্লাবন হবে। ছোটখাটো কত বন্যাইতো দেখেছি কিন্তু প্লাবনতো দেখিনি। বইতে পড়েছি মহা প্লাবনের কথা।
অনেক রাত জেগেছিলাম। ক্লান্ত শরীর কখন যে নুয়ে পড়েছি অগুছালো বিছানায় খেয়াল নেই হঠাৎ শুনতে পাই কলকল পানির শব্দ। ঘুম ভাঙে শব্দে। জেগে দেখি ঘরের ভেতর দিয়ে পানির স্রোত বইছে। শরীরটা শিহরিয়ে উঠে। তাড়াহুড়া করে হারিকেনটা জ্বালিয়ে নেই। দেখি কয়েক #ঘন্টা যেতে না যেতেই ঘরের চকি পর্যন্ত পানি প্রবল স্রোতের সাথে প্রবাহিত হচ্ছে।
দু’দিনেই রাস্তাঘাট হাট বাজার তলিয়ে গেলো। উঁচু বলতে মাথা গুজবার যতটুকু সুযোগ ছিলো সেও নাই হয়ে গেলো। আমরাও প্রতিকূল পরিবেশে বেঁচে থাকার জন্য সংরাম করতে লাগলাম। কে কিভাবে জীবন অতিবাহিত করছে কেউ জানছেনা। এক প্রকান্ড আত্মচীৎকার আর দীর্ঘশ্বাসের মধ্য দিয়ে কাটছে জীবনের হাহুতাশ।
আমিআগেই বলেছি মানুষের মায়া মমতা এখন আর প্রকাশের কোন মাধ্যম নেই। নিজকে আর নিজ পরিবার পরিজনকে বাচাতেই দিশেহারা কে কার সাহায্যে এগিয়ে আসবে। সেদিন যে যেভাবে পেরেছিল ভেলায় করে, নৌকায় করে ঠিক শাপুড়েদের মত ভাসমান জীবন সংসার গড়েছিল।
সেবার প্রলয়ংকরী বন্যার পানিতে ব্যপক বড়বড় মাছ এসেছিলো। আমরা ভেলায় কিংবা নৌকায় বসেঅ ট্যারা কিংবা বড়শি দিয়ে প্রচুর মাছ ধরতাম। এমন সময়ে মাছ ধরাটা যেনো সবার একটা নেশায় পরিনত হয়ে গেলো তাছাড়া খাবারের জন্যওতো মাছ লাগে। রীতিমতো মানুষ রাতদিন যার যখন ইচ্ছে হলো মাছ ধরতে থাকলো।
আমাদের পাশাপাশি থানার নাম মেলান্দহ থানা। মাঝখানে বয়ে গেছে ঝারকাটা নদী। মেলান্দহ থানার আমিরত্রী নামক গ্রামে আমার বড় বোনকে বিয়ে দিয়েছি। ঠিক পাশের আরেকটা গ্রামে বিয়ে দিয়েছি আরেকবোন। বোনদের কোন খোঁজ খবর পাচ্ছিনা। আমরা যতোটানা ব্যকুল তার চেয়ে শস্রাধিক গুনে ব্যাকুলতো মা বাবার হৃদয়। তাদের দেখতাম সারাক্ষণ নীরবে নিভৃত্তে কাঁদতে।
দিন যেতে লাগলো। প্রভুর দয়ায় একদিন লোক মারফতে বোনদের খবর পেলাম তারা বেচে আছে। বড় বোনের। সাথে একটা দুঃসংবাদও পেলাম। বেদনায় হৃদয় ক্ষীণ হয়ে গেল। চোখের পাপড়িগুলো যন্ত্রণায় দগ্ধ হতে লাগলো। এমন মৃত্যু খবর ইতিপূর্বে কেউ পেয়েছিল কিনা ভবিষ্যতেও কেউ আর পাবে কিনা রীতিমতো সন্দিহান।
আজও ৩৭ বছর পর সেই মৃত্যু খবর মনে হলে চোখদুটো ঝাপসা হয়ে আসে, বিস্ময়ে বারবার চমকে উঠি। শিকারি মাছ ধরার নেশায় যে রাতের আধারে ভেলার উপর ক্যাটা হাতে আপন দুধের শিশুটিকেই শিকার করবে তাকি সে জানতো।
সত্যি আস্ত মাথা মন্ডু উলোটপালোট হয়ে যাওয়ার খবর। অবিশ্বাস্য হলেও সত্য। দুখের উপর দাবদাহ, ঝড়ের উপর ঝড়। এমন ঝড় যে প্রলংকারী ঝড় কেউ হার মানায়।
আমিত্রী গ্রামের নছর মিয়া। সে প্রতিদিন বড়বড় মাছ ধরতো ক্যাটায়। মাছ ধরতে ধরতে নেশায় পরিনত হয়ে গেছে। সেদিন ছিলো গভীর রাত। ক্যাটা হাতেই ঘুমিয়ে পড়েছিল ভেলায়। তার ছোট পরিবার। বিয়ের বয়স খুব বেশিনা। দুইটা সন্তান তার। বড়টা মেয়ে বয়স আড়াই কি তিন ছোটটা একেবাকেরেই দুধের শিশু।
ভেলায় ছোট বাচ্চাটার জন্য স্বামী স্ত্রী একজন জেগে থাকলে আরেকজন ঘুমিয়ে নেয়। নিয়তির নির্মম পরিহাস নছর সেদিন ক্যাটা হাতে অকস্মাৎ ঘমিয়ে পড়েছিল। দুধের শিশুটিও এক ফাকে পানিতে পড়ে গিয়ে হাবুডুবু খেতে থাকে। বিধির বাম পানির শব্দ নছরের কানে যায় মাছের নেশায় মরিয়া হয়ে উঠে। ক্যাটাতো তার হাতেই ছিলো। প্রতিদিনের মতো বড় মাছ ধরার নেশায় নছর আলী আপন শিশুটিকেই ক্যাটা বন্দী করে ফেলে। তারপর কি হয়েছিল জানিনা। হয়তো ক্যাটাসহ পানির জলে ভাসিয়ে দিয়েছিল লাশ নয়তো….।