• ঢাকা, বাংলাদেশ মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬, ০১:২২ পূর্বাহ্ন
  • [কনভাটার]

দানবীর আর পি সাহাঃ মানবতার দীপশিখা ও সেবার মহাকাব্য || রোকেয়া ইসলাম

রিপোর্টারের নাম / ১২৪ জন দেখেছে
আপডেট : বৃহস্পতিবার, ৭ মে, ২০২৬

এই মহান মানুষটিকে আমি কখনও দেখিনি , কিন্তু বহন করছি বিনম্র শ্রদ্ধা। টাংগাইল শহরে তখন একটাই কলেজ কুমুদিনী কলেজ। বিন্দু বাসিনী সরকারি উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়ে পড়ার সময়ই বুকের ভেতর লালন করতাম কুমুদিনী কলেজে পড়ার স্বপ্ন। আমার ফুফুরা পড়তেন কুমুদিনী কলেজে। কলেজে প্রতি বছর “মিনা বাজার ” নামে একটা মেলা হতো ফুফুদের পিড়াপিড়িতে মা যেতেন সাথে আমিও।

পবিত্র অঙ্গনে পা রাখতাম বুকের স্বপ্ন ছলকে উঠতো, আপ্লুত হতাম। “আমিও আসব ”
আমরা ম্যাডাম বলতাম না বলতাম আপা। ফুফু দূর থেকে চেনাতেন তার প্রিয় শিক্ষকদের। সবচেয়ে ভাল লাগতো প্রিন্সিপাল আপাকে। হামিদা কোরাইশী নামে বিশাল বপু কথা বলতেন উর্দু ভাষায়, পোশাকও ছিল সালোয়ার কামিজ। ফুফাদের কাছে শুনতাম কলেজের প্রতিষ্ঠাতা আর পি সাহার কথা। পাড়ার সিনিয়র আপারা পড়তেন, কত গল্প যে করতেন তারা।
দল বেঁধে তারা জ্যাঠা মশাইয়ের জন্মদিনে মির্জাপুর যেতেন। লুচি আস্ত বেগুন ভাজা আর রসগোল্লা খাওয়ার কথা ছাপিয়ে যে কথা স্পষ্ট হতো শ্রদ্ধায় সেটা হলো আর পি সাহার প্রতি কৃতজ্ঞতা শ্রদ্ধা সম্মান।

আব্বা অনেকবার বলতেন তিনি যদি টাংগাইলে নারী শিক্ষার জন্য কুমুদিনী কলেজে প্রতিষ্ঠিত না করতেন তাহলে টাংগাইলের অগণিত মেয়ের কলেজে পড়ার স্বপ্ন কোনদিনই পূর্ণ হতো না। তারা উচ্চ শিক্ষার আলো বঞ্চিত হয়ে জীবনে অপ্রতিষ্ঠিত থাকতো। মেয়েদের জীবনে জ্ঞানের বার্তা নিয়ে অর্থনৈতিক মুক্তির আলো জ্বেলে দিয়েছিলেন রণদা প্রসাদ সাহা। লোকমুখে শুনে নিজের ভেতরের তাড়নায় জানতে পড়তে শুরু করলাম মহান মানুষটিকে। বিস্ময়কর তার জীবন ভাবনা কর্ম।

কতটুকু তাকে ধারণ করেছি, শিক্ষা সনদে তার প্রতিষ্ঠিত কলেজের নামটা আমাকে দেখিয়েছে নারীর আত্মমর্যাদা স্বাবলম্বি পথ চিনিয়েছে আলোকোজ্জ্বল জ্ঞানের পথ।
বিনম্র শ্রদ্ধায় জাতি স্মরণ করে তাকে।
বাংলার ইতিহাসে এমন কিছু মানুষ আছেন, যাদের জীবন কেবল ব্যক্তিগত সাফল্যের গল্প নয়—বরং তা হয়ে উঠেছে এক বিশাল মানবিক মহাকাব্য। সেইসব বিরল ব্যক্তিত্বদের অন্যতম হলেন রণদা প্রসাদ সাহা যিনি আমাদের কাছে বেশি পরিচিত দানবীর আর পি সাহা নামে। তাঁর জীবনকাহিনি সংগ্রাম, আত্মত্যাগ, মানবপ্রেম এবং সমাজগঠনের এক অনন্য দৃষ্টান্ত। শৈশব ও জীবনের প্রথম অধ্যায় ১৮৯৬ সালে টাঙ্গাইল জেলার এক সাধারণ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন রণদা প্রসাদ সাহা। খুব অল্প বয়সেই তিনি মাতৃহারা হন। নিজের মায়ের বিনা চিকিৎসায় মৃত্যু তার ভেতর প্রভাব ফেলে।

শৈশব থেকেই জীবনের কঠোর বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হয় তাঁকে। দারিদ্র্য, অনিশ্চয়তা, এবং সীমাহীন কষ্ট ছিল তাঁর জীবনের নিত্যসঙ্গী। কিন্তু এই দারিদ্র্য তাঁকে ভেঙে দেয়নি—বরং গড়ে তুলেছিল এক অদম্য মানসিক শক্তি। খুব অল্প বয়সেই জীবিকা অর্জনের জন্য তাঁকে শ্রম নির্ভর কাজ করতে হয়। কখনও তিনি হকার, কখনও ছোটখাটো ব্যবসায়ী—জীবনের প্রতিটি ধাপে তিনি সংগ্রামের মধ্য দিয়েই এগিয়ে গেছন।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর সঙ্গে কাজ করার সুযোগ পান তিনি। সেখান থেকেই তাঁর ব্যবসায়িক জীবনের ভিত্তি তৈরি হয়। যুদ্ধকালীন সময়ে সরবরাহ ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত থেকে তিনি ধীরে ধীরে অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হয়ে ওঠেন।
অসাধারণ প্রজ্ঞা, সততা এবং কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে তিনি ব্যবসায়িক জগতে প্রতিষ্ঠিত হন। কিন্তু তাঁর এই সাফল্য কখনোই কেবল ব্যক্তিগত ভোগবিলাসের জন্য ছিল না। বরং তিনি বিশ্বাস করতেন—“অর্থের প্রকৃত মূল্য তখনই, যখন তা মানুষের কল্যাণে ব্যবহৃত হয়।”মানবসেবার দিকে আত্মনিয়োগ রণদা প্রসাদ সাহার জীবনের সবচেয়ে উজ্জ্বল দিক হলো তাঁর মানবসেবা। তিনি উপলব্ধি করেছিলেন, সমাজের প্রকৃত উন্নয়ন সম্ভব কেবল শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা এবং সমাজ কল্যাণকর কর্মের প্রসারের মাধ্যমে।

টাঙ্গাইলের মির্জাপুরে প্রতিষ্ঠিত কুমুদিনী হাসপাতাল তাঁর মানবপ্রেমের এক অনন্য নিদর্শন। এই হাসপাতালটি প্রতিষ্ঠার মূল উদ্দেশ্য ছিল দরিদ্র ও অসহায় মানুষের জন্য বিনামূল্যে বা স্বল্পমূল্যে চিকিৎসাসেবা প্রদান।
এই হাসপাতাল আজও হাজার হাজার মানুষের চিকিৎসার ভরসাস্থল। এখানে শুধু চিকিৎসা নয়—মানুষের প্রতি ভালোবাসা, সহানুভূতি এবং মানবিকতা প্রতিফলিত হয় প্রতিটি সেবায়।

রণদা প্রসাদ সাহা বিশ্বাস করতেন, শিক্ষা ছাড়া কোনো জাতির উন্নয়ন সম্ভব নয়। তাই তিনি প্রতিষ্ঠা করেন অসংখ্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, যার মধ্যে অন্যতম নারী শিক্ষার প্রসারের জন্য কুমুদিনী কলেজ ভারতেশ্বরী হোমস দেবেন্দ্র কলেজ অন্যতম এছাড়াও অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে তিনি অকাতরে দান করেছেন নারী শিক্ষার প্রসারে তাঁর অবদান বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তিনি বুঝেছিলেন, নারীদের শিক্ষিত না করলে সমাজ কখনোই পূর্ণতা পাবে না। তাঁর প্রতিষ্ঠিত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো আজও হাজার হাজার শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ গড়ে তুলছে।

রণদা প্রসাদ সাহার জীবনের মূল দর্শন ছিল মানবতা। তিনি ধর্ম, বর্ণ, শ্রেণি—সবকিছুর ঊর্ধ্বে উঠে মানুষকে ভালোবাসতেন। তাঁর কাছে প্রতিটি মানুষই ছিল সমান মর্যাদার অধিকারী। তিনি বিশ্বাস করতেন—মানুষের সেবা করাই হলো জীবনের শ্রেষ্ঠ সাধনা।”এই দর্শনই তাঁকে আলাদা করেছে সাধারণ মানুষের থেকে। তিনি কেবল দান করতেন না—তিনি মানুষের দুঃখকে নিজের দুঃখ হিসেবে অনুভব করতেন।

১৯৭১ সালে এই ভূখন্ডে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে, রণদা প্রসাদ সাহা তাঁর সকল সম্পদ ও প্রতিষ্ঠান নিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের পাশে দাঁড়ান। তাঁর প্রতিষ্ঠিত হাসপাতাল ও প্রতিষ্ঠানগুলো মুক্তিযোদ্ধাদের সেবা ও আশ্রয়ের কেন্দ্র হয়ে ওঠে। কিন্তু এই মহান মানবপ্রেমই শেষ পর্যন্ত তাঁর জীবনের করুণ পরিণতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী তাঁকে তাঁর পুত্রসহ অপহরণ করে নিয়ে যায়, এবং তিনি আর কখনো ফিরে আসেননি। তাঁর এই আত্মত্যাগ বাংলাদেশের ইতিহাসে এক অনন্ত বেদনার অধ্যায়।

রণদা প্রসাদ সাহার মৃত্যুর পরও তাঁর প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠানগুলো আজও তাঁর আদর্শ বহন করে চলেছে। কুমুদিনী ওয়েলফেয়ার ট্রাস্ট আজও শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং সমাজকল্যাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। তাঁর জীবন আমাদের শিখিয়ে দেয়—সম্পদ কেবল নিজের জন্য নয়, সমাজের জন্য মানবতা সবকিছুর ঊর্ধ্বে সত্যিকারের সাফল্য হলো অন্যের মুখে হাসি ফোটানো

আজকের বিশ্বে, যেখানে ভোগবাদ ও আত্মকেন্দ্রিকতা ক্রমেই বাড়ছে, সেখানে রণদা প্রসাদ সাহার জীবন আমাদের জন্য এক উজ্জ্বল দিকনির্দেশনা। তাঁর মতো মানুষ আমাদের মনে করিয়ে দেন—মানবিকতা হারিয়ে গেলে উন্নয়ন অর্থহীন।

বাংলাদেশসহ সমগ্র বিশ্বের জন্য তাঁর জীবন এক অনন্ত প্রেরণা। বিশেষ করে নতুন প্রজন্ম তাঁর জীবন থেকে শিখতে পারে কীভাবে ব্যক্তিগত সাফল্যকে সমাজকল্যাণের সঙ্গে যুক্ত করা যায়। রণদা প্রসাদ সাহা কেবল একজন ব্যক্তি নন—তিনি এক দর্শন, এক আদর্শ, এক আলোকবর্তিকা। তাঁর জীবন আমাদের শেখায়, সত্যিকারের মহত্ত্ব ধন-সম্পদে নয়, বরং মানুষের জন্য আত্মনিবেদনে। তিনি যেন এক নীরব নদী—নিজে নিঃশেষ হয়ে অন্যকে সঞ্জীবিত করেছেন। তাঁর কর্ম, তাঁর আদর্শ, তাঁর আত্মত্যাগ—সবকিছু মিলিয়ে তিনি হয়ে উঠেছেন বাংলার মানবতার এক চিরন্তন প্রতীক।

আজ থেকে শতবর্ষ পরেও রণদা প্রসাদ সাহা প্রাসঙ্গিক থাকবেন চির উজ্জ্বল থাকবেন।
আজকের দিনে তাকে হানাদার বাহিনী তুলে নিয়ে যায়।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরও সংবাদ