• ঢাকা, বাংলাদেশ বৃহস্পতিবার, ২৩ জুলাই ২০২৬, ০৯:৩৪ পূর্বাহ্ন
  • [কনভাটার]
শিরোনাম:

শত বছরের ইতিহাস ঐতিহ্যে লালিত গুনারীতলা গ্রাম : নুর মোহাম্মদ নুর

রিপোর্টারের নাম / ৮৫ জন দেখেছে
আপডেট : বৃহস্পতিবার, ২৬ মার্চ, ২০২৬

ব্রিটিশ শাসনামলে নীলকরদের অত্যাচার আর লুন্ঠনে ঐতিহাসিক ইউনিয়ন ৩ নং গুনারীতলা বাসীর জনজীবনে কিরুপ ছিল?

ব্রিটিশ শাসনামলে নীলকরদের অত্যাচারে গুনারীতলা (জামালপুর জেলার মাদারগঞ্জ উপজেলার একটি ইউনিয়ন) বাসীর দুরবস্থার ইতিহাস অত্যন্ত বেদনদায়ক। ব্রিটিশ আমলে এই অঞ্চলে নীল চাষের জন্য চাষীদের ওপর অবর্ণনীয় নির্যাতন চালানো হতো।

গুনারীতলা বাসীর ওপর নীলকরদের অত্যাচারের প্রধান দিকগুলো ছিল:

জোরপূর্বক নীল চাষ: কৃষকদের উর্বর জমিতে ধান বা পাটের বদলে জোর করে নীল চাষ করতে বাধ্য করা হতো।

দাদন প্রথা: নীলকররা চাষীদের অগ্রিম টাকা (দাদন) দিয়ে চুক্তিতে আবদ্ধ করত, যা পরবর্তীকালে চাষীদের জন্য ঋণের জালে পরিণত হতো।

শারীরিক নির্যাতন: নীল চাষে অস্বীকৃতি জানালে বা অবহেলা করলে চাষীদের নীলকুঠিতে ধরে নিয়ে গিয়ে চাবুক মারা, কারারুদ্ধ করা এবং এমনকি ঘরবাড়িতে আগুন দেওয়ার মতো ঘটনা ঘটত।

অর্থনৈতিক শোষণ: উৎপাদিত নীলের ন্যায্য মূল্য দেওয়া হতো না এবং চাষীদের ওপর নানা ধরনের অতিরিক্ত কর চাপিয়ে দেওয়া হতো।

গুনারীতলার এই নীলকুঠিগুলোকে কেন্দ্র করে স্থানীয়দের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ দেখা দিয়েছিল, যা পরবর্তীকালে বৃহত্তর নীল বিদ্রোহের অংশ হিসেবে এই অঞ্চলেও দানা বেঁধেছিল।

বৃটিশ নীলকরদের অত্যাচারের বিরুদ্ধে তৎকালীন সময়ে গুনারীতলা ইউনিয়ন এর ক’জন ব্যক্তির নাম ও তাদের বলিষ্ঠ ভুমিকা ইতিহাসের পাতায়।

জামালপুর জেলার মাদারগঞ্জ উপজেলার গুনারীতলা ইউনিয়নের ইতিহাসে ব্রিটিশ নীলকরদের সময়ের সুনির্দিষ্ট কয়েকজন ব্যক্তির নাম লোকমুখে এবং স্থানীয় ইতিহাস থেকে জানা যায়। তৎকালীন সময়ে নীলকরদের অত্যাচার প্রতিরোধে বা তাদের অধীনে কাজ করার ক্ষেত্রে স্থানীয় কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তিত্বের ভূমিকা ছিল উল্লেখযোগ্য।

তবে বিশেষভাবে গুনারীতলা ইউনিয়নের প্রেক্ষাপটে নীলকরদের সময়ের কিছু নাম নিচে উল্লেখ করা হলো:

উমর সরদার: গুনারীতলা এলাকায় নীলকরদের অত্যাচারের বিরুদ্ধে স্থানীয়ভাবে প্রতিরোধ গড়ে তোলার ক্ষেত্রে তার নাম বিশেষভাবে উচ্চারিত হয়।

হাতেম আলী মিঞা: তিনি তৎকালীন সময়ে গুনারীতলা এলাকার একজন প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব ছিলেন এবং নীলকরদের কর্মকাণ্ডের সাক্ষী হিসেবে তার পরিবারের নাম লোকগাঁথায় পাওয়া যায়।

নায়েব উল্লাহ মন্ডল: তিনি ব্রিটিশ আমলে গুনারীতলা এলাকার একজন মাতব্বর ছিলেন, যিনি কৃষকদের নীল চাষে বাধ্য করার নীলকরদের চাপের মুখে স্থানীয়দের সংগঠিত করার চেষ্টা করেছিলেন।

উল্লেখ্য যে, নীলকরদের অত্যাচারের বিরুদ্ধে বৃহত্তর আন্দোলনের নেতা হিসেবে নদীয়ার বিষ্ণুচরণ বিশ্বাস ও দিগম্বর বিশ্বাস, পাবনার কাদের মোল্লা এবং মালদার রফিক মন্ডল সমগ্র বাংলায় পরিচিত ছিলেন।

গুনারীতলাসহ জামালপুর অঞ্চলে নীলকরদের জন্য শরশাবাদ ও এর আশেপাশে কয়েকটি নীলকুঠি ছিল, যেখানে নীলকরদের লাঠিয়াল হিসেবে কাজ করতে বা তাদের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে অনেক স্থানীয় ব্যক্তি সাহসী ভূমিকা রেখেছিলেন।

বৃটিশ নীলকরদের সময় গুনারীতলা ইউনিয়ন শাসন করতো কে?
ব্রিটিশ নীলকরদের সময় জামালপুরের মেলান্দহ উপজেলার গুনারীতলা ইউনিয়ন সরাসরি কোনো একক ব্যক্তি দ্বারা শাসিত হতো না, বরং এটি ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির প্রশাসনিক কাঠামোর অধীনে ছিল। তবে স্থানীয়ভাবে নীল চাষ ও শাসন পরিচালনায় এই এলাকায় কাতলামারী নীলকুঠি অত্যন্ত প্রভাবশালী ছিল।

গুনারীতলা ইউনিয়নের ইতিহাস ও নীলকরদের প্রভাব সম্পর্কে নিচের তথ্যগুলো উল্লেখযোগ্য:

কাতলামারী নীলকুঠি: ১৮৬১ সালে ইংরেজ বণিকরা গুনারীতলা ইউনিয়নের কাতলামারী গ্রামে এই নীলকুঠি স্থাপন করে। যমুনা নদীর মোহনায় অবস্থিত হওয়ায় এখান থেকে নৌপথে সহজে নীল পরিবহন করা যেত।

নীলকরদের নিয়ন্ত্রণ: নীলকররা এই এলাকার কৃষকদের ওপর চরম অত্যাচার চালিয়ে নীল চাষে বাধ্য করত। ব্রিটিশ সরকার ১৮৩৩ সালের একটি আইনের মাধ্যমে নীলকরদের অবাধ ক্ষমতা প্রদান করেছিল, যার ফলে তারা স্থানীয় শাসনের ওপর প্রভাব বিস্তার করত।
স্থানীয় নেতৃত্ব ও বিদ্রোহ: ১৮২৯ সালে ময়মনসিংহের জামালপুর অঞ্চলে ৫০০ লাঠিয়াল নিয়ে নীলকররা আক্রমণ করেছিল বলে ইতিহাসে উল্লেখ আছে। এই নির্যাতনের বিরুদ্ধে স্থানীয় গ্রাম্য মোড়ল বা মণ্ডলরা প্রায়ই কৃষকদের সংগঠিত করে নীল বিদ্রোহে নেতৃত্ব দিতেন।

সংক্ষেপে, গুনারীতলা ইউনিয়ন সে সময় ব্রিটিশ রাজ বা কোম্পানির জেলা প্রশাসনের অধীনে থাকলেও বাস্তবিকভাবে এলাকার নিয়ন্ত্রণ ও ত্রাস ছিল কাতলামারী নীলকুঠির সাহেবদের হাতে।

বৃটিশ নীলকরদের সময় গুনারীতলা ইউনিয়ন এর রাস্তাঘাট কেমন ছিল সে সময় কোন বিল ছিল এবং নাম কিি?

জামালপুর জেলার মাদারগঞ্জ উপজেলার গুনারীতলা ইউনিয়নে ব্রিটিশ আমলে নীলকরদের ইতিহাস এবং তৎকালীন ভৌগোলিক অবস্থা বেশ বৈচিত্র্যময় ছিল। নিচে আপনার জিজ্ঞাসিত তথ্যগুলো তুলে ধরা হলো:
ব্রিটিশ আমলে গুনারীতলার রাস্তাঘাট
ব্রিটিশ শাসনকালে এবং বিশেষ করে নীলকরদের সময়ে গুনারীতলা ইউনিয়নের রাস্তাঘাটের অবস্থা বর্তমানের মতো উন্নত ছিল না।

কাঁচা রাস্তা ও নৌপথ: সে সময় যাতায়াতের প্রধান মাধ্যম ছিল নৌপথ। বর্ষাকালে নৌকা ছিল একমাত্র ভরসা। স্থলপথে চলাচলের জন্য ছোট ছোট সরু ও আঁকাবাঁকা কাঁচা রাস্তা বা আলপথ ব্যবহৃত হতো।

নীলকুঠির সংযোগ: নীলকররা তাদের উৎপাদিত নীল পরিবহনের সুবিধার্থে কুঠি থেকে প্রধান ঘাট বা আড়ত পর্যন্ত কিছু মাটির রাস্তা তৈরি করেছিল, যা মূলত পণ্য পরিবহনের কাজে ব্যবহৃত হতো। সাধারণ মানুষের চলাচলের জন্য সুপরিকল্পিত কোনো সড়ক তখন ছিল না।

তৎকালীন বিলগুলোর নাম
গুনারীতলা এবং এর আশপাশের অঞ্চলে সে সময় বেশ কিছু বড় বিল ছিল, যেগুলোর অনেকগুলো আজও টিকে আছে। নীলকরদের নীল চাষের জন্য বিলের ধারের উর্বর জমিগুলো বেছে নেওয়া হতো। উল্লেখযোগ্য কিছু বিল হলো:

ডাওয়াতলা বিল (এটি গুনারীতলার অন্যতম প্রধান ও পরিচিত বিল)।
খরকা বিল।
পাগলা বিল।
নাদাগাড়ী বিল।
নীল চাষের জন্য নীলকররা সাধারণ কৃষকদের ওপর চরম অত্যাচার চালাত। গুনারীতলার আশপাশে এখনও প্রাচীন কিছু নীলকুঠির ধ্বংসাবশেষের অস্তিত্বের কথা স্থানীয় লোকমুখে প্রচলিত আছে, যা সেই দুঃসহ সময়ের সাক্ষী বহন করে।

ব্রিটিশ নীলকরদের আমলে জামালপুর জেলার মাদারগঞ্জ উপজেলার অন্তর্গত গুনারীতলা এবং এর পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া ঝাড়কাটা নদীর অবস্থা ছিল অত্যন্ত ভয়াবহ ও শোষণের ইতিহাসমণ্ডিত। গুনারীতলার নীলকুঠিটি এই অঞ্চলে ব্রিটিশদের অত্যাচার ও নীল চাষের একটি প্রধান কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত ছিল।

ব্রিটিশ আমলে ঝাড়কাটা নদীর অবস্থা এবং প্রাসঙ্গিক ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট নিচে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:

১. নীল পরিবহনের প্রধান মাধ্যম হিসেবে নদী:
ব্রিটিশ নীলকররা সাধারণত নদীপথের কাছাকাছি নীলকুঠি স্থাপন করত যাতে উৎপাদিত নীল সহজেই কলকাতায় পাঠানো যায়। ঝাড়কাটা নদী ছিল গুনারীতলা অঞ্চলের যাতায়াত ও পণ্য পরিবহনের অন্যতম ধমনী। নীলকররা এই নদী পথ ব্যবহার করে কৃষকদের কাছ থেকে সংগৃহীত নীল গাছ কুঠিতে নিয়ে আসত এবং প্রক্রিয়াজাত করার পর তা নৌকায় করে অন্যত্র পাঠাত।

২. ঝাড়কাটা নদীর তীরে নীল চাষের বিস্তার: ঝাড়কাটা নদীর অববাহিকায় পলিমাটি সমৃদ্ধ উর্বর জমি নীল চাষের জন্য অত্যন্ত উপযোগী ছিল। নীলকররা স্থানীয় কৃষকদের এই উর্বর জমিতে ধান বা পাটের পরিবর্তে নীল চাষ করতে বাধ্য করত। নদীর ধারের সবচেয়ে ভালো জমিগুলো নীলকররা দখল করে নিত, যা কৃষকদের খাদ্য সংকটে ফেলত।

৩. নীলকুঠির অত্যাচার ও নদীর ভূমিকা
গুনারীতলা নীলকুঠিতে অবাধ্য কৃষকদের ওপর নির্মম অত্যাচার চালানো হতো। লোকমুখে প্রচলিত আছে যে, যেসব কৃষক নীল চাষে অস্বীকৃতি জানাত, তাদের ওপর চালানো নির্যাতনের চিহ্ন হিসেবে অনেক সময় তাদের নদীতে নিক্ষেপ করা হতো। নীল প্রক্রিয়াজাতকরণের সময় ব্যবহৃত বিভিন্ন রাসায়নিক ও বর্জ্য নদীর পানিতে মিশে নদীর প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট করত বলে ধারণা করা হয়।

৪. নীল বিদ্রোহ ও নদীর স্মৃতি
১৮৫৯-৬০ সালের দিকে যখন সারা বাংলায় নীল বিদ্রোহ ছড়িয়ে পড়ে, তখন এই অঞ্চলের কৃষকরাও ঝাড়কাটা নদীর তীরবর্তী এলাকাগুলোতে নীলকরদের বিরুদ্ধে সংগঠিত হতে শুরু করেন। কৃষকরা একজোট হয়ে নীলবীজ নদীতে ফেলে দিয়ে এবং চুক্তিপত্র পুড়িয়ে ফেলে বিদ্রোহের সূচনা করেছিল।

বর্তমান অবস্থা:
বর্তমানে ঝাড়কাটা নদী তার পূর্বের সেই খরস্রোতা রূপ হারিয়েছে। গুনারীতলার সেই নীলকুঠিটি এখন ধ্বংসাবশেষ হিসেবে টিকে আছে, যা ব্রিটিশদের অত্যাচারের নীরব সাক্ষী। কালক্রমে নদীটি ভরাট হয়ে অনেক জায়গায় সরু খালে পরিণত হয়েছে।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরও সংবাদ

Archive Calendar

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
 
১০১১১২
১৩১৪১৫১৬১৭১৮১৯
২০২১২২২৩২৪২৫২৬
২৭২৮২৯৩০৩১