“লেখালেখি করে কয় টাকা পাও”?
এরকম প্রশ্ন লেখক কবির জন্য নতুন নয়! সেদিন আমার এক শিক্ষিত বন্ধুও আমাকে একইভাবে প্রশ্ন করেছিল খুব তাচ্ছিল্যের স্বরেই।
লেখালেখিকে পুরোটা শ্রম বলা না গেলেও তা অবশ্যই মানসিক শ্রম ও সময়সাপেক্ষ ব্যাপার এ ব্যাপারে সন্দেহ নেই, যদিও টাকার প্রশ্ন এখানে অবান্তর। কারণ পৃথিবীর বেশিরভাগ কবি লেখকই শুধু টাকা বা অর্থ উপার্জনের জন্য লেখালেখি করেন এমন নয়।
বিষয়টা কিছুটা এরকম যে, আপনি যদি কাউকে ভালোবাসেন, তার কাছ থেকে কি অর্থ বা বিনিময় পাওয়ার আশা করে ভালোবাসেন? লেখালেখিও অনেকটা সেইরকম ব্যাপার। লেখালেখি করে কী পেলাম বা কী পাবো এই চিন্তা করে লেখক বা কবি লেখেন না৷ তবে কেউ বা কোনো সাহিত্য সংগঠন বা কোনো প্রতিষ্ঠান ভালোবেসে কোনো উপহার/পুরস্কার/ স্বীকৃতি দিলে লেখক তা গ্রহণ করেন৷ তবে প্রকৃত লেখকের লেখার সাথে অর্থের কোনো যোগসাজশ নেই বললেই চলে!
লেখালেখি শুধু একটি পেশা নয়—এটি সময়ের বিরুদ্ধে মানুষের সরব প্রতিরোধ। এটি এমন এক কাজ, যেখানে মানুষ নিজের ক্ষণস্থায়ী জীবনকে অতিক্রম করার চেষ্টা করে শব্দের ভেতর দিয়ে। তাই লেখক যখন লেখেন, তিনি কেবল বর্তমানের জন্য লেখেন না; তিনি লিখে যান ভবিষ্যতের অদেখা পাঠকের জন্য, অনাগত সময়ের হৃদয়ের জন্য।
অতীতের দিকে তাকালে দেখা যায়—রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম, জীবনানন্দ দাশ, মির্জা গালিব, রুমি—তাঁরা কেউই লেখার বিনিময়ে বিপুল অর্থ-সম্পদ পাননি। বরং অনেক সময় দারিদ্র্য, অবহেলা, কিংবা সামাজিক অস্বীকৃতির মধ্য দিয়েই তাঁদের জীবন কেটেছে। তবুও তাঁরা থামেননি। কারণ তাঁদের লক্ষ্য ছিল না সাময়িক প্রাপ্তি; তাঁদের লক্ষ্য ছিল সময়ের বুকে চিরস্থায়ী হয়ে ওঠা।
অন্যদিকে, পৃথিবীতে এমন অসংখ্য মানুষ আছেন যারা বিপুল অর্থ উপার্জন করেছেন, বিলাসে জীবন কাটিয়েছেন, কিন্তু তাঁদের অস্তিত্ব সময়ের কাছে কোনো চিহ্ন রেখে যেতে পারেনি। তাঁদের অর্থ, তাঁদের প্রাচুর্য—মৃত্যুর পর নিঃশব্দে বিলীন হয়ে গেছে। কারণ অর্থ মানুষের প্রয়োজন মেটায়, কিন্তু মানুষের আত্মাকে ছুঁয়ে যেতে পারে না। আর যে কাজ আত্মাকে স্পর্শ করে না, তা ইতিহাসের পাতায় জায়গা পায় না।
সৃজনশীল মানুষ তাই অন্যরকম এক লোভে বাঁচেন—এটি বস্তুগত লোভ নয়, এটি অস্তিত্বের লোভ। তারা চান, তাদের শব্দ, তাদের চিন্তা, তাদের অনুভূতি—তাদের মৃত্যুর পরও বেঁচে থাকুক। তারা জানেন, শরীর একদিন মাটিতে মিশে যাবে, কিন্তু একটি সত্যিকারের লেখা সময়ের দেয়ালে খোদাই হয়ে থাকে। একটি কবিতা, একটি গদ্য—মানুষের হৃদয়ে আশ্রয় পেলে তা আর মরে না।
এই কারণেই একজন কবি যখন লিখতে বসেন, তখন তিনি টাকার হিসাব করেন না। তিনি হিসাব করেন—এই শব্দগুলো কি সময়ের পরীক্ষায় টিকে থাকবে? এই অনুভূতিগুলো কি অন্য কোনো একাকী মানুষের ভেতরে আলো জ্বালাতে পারবে? তিনি জানেন, হয়তো জীবদ্দশায় তাঁর প্রাপ্য স্বীকৃতি আসবে না, কিন্তু তবুও তিনি লিখে যান। কারণ তাঁর বিশ্বাস—সত্যিকারের সৃষ্টির মূল্য সময় একদিন অবশ্যই দেয়।
লেখালেখি তাই এক ধরনের অমরত্বের সাধনা। এটি এমন এক যাত্রা, যেখানে মানুষ নিজের ক্ষুদ্র জীবনকে অসীমের সাথে যুক্ত করার চেষ্টা করে। যারা এই পথে হাঁটে, তারা জানে—তাদের প্রাপ্তি তৎক্ষণাৎ নয়, কিন্তু গভীর। তারা জানে—তাদের শ্রমের মজুরি টাকা নয়, বরং সময়ের বুকে টিকে থাকা।
যারা অর্থের জন্য বাঁচে, তারা অর্থের সাথেই শেষ হয়ে যায়। আর যারা সৃষ্টির জন্য বাঁচে, তারা সৃষ্টির ভেতর দিয়েই অনন্ত হয়ে বেঁচে থাকে।



