আশির দশকের কথা। সেকালে অধিকাংশ পরিবারই ছিলো অর্থহীন অভাবগ্রস্থ। এখন যেমন কাজের লোক খুজতে জায়গায় জায়গায় গিয়ে লেবার সংগ্রহ করতে হয় তখন ভোরবেলা হলে কামলারাই একটা ক্ষেত নিড়ানি পাছুন কিংবা ধান কাটার মৌসুম হলে ধানকাটার কাঁচি বগলের নীচে নিয়ে উঠান দিয়ে হাক দিতে দিতে যেতো।
“কামলে লাগবে কামলা”
তবে অভাবগ্রস্থ হলেও কামলাদের মধ্যে একটা নীতিবোধ সবসময় কাজ করতো তা হলো বিশেষ তলব ছাড়া এক পাড়ার কামলা আরেক পাড়ায় গিয়ে কাজ করতোনা। বিশেষ করে সেকালে বছর মাইনে কামলার প্রচলন ছিল বেশ।
একটা পাড়ায় শতাধিক পরিবারের বসবাস থাকলেও কামলা খাটানোর মত মোড়লের সংখ্যা ছিলো খুবই কম। সেকারণে দেখা যেতো কামলা খাটা মানুষগুলো মোড়লদের প্রভুজ্ঞানে সমীহ করতো।
মাইনে দেবার সিস্টেম ছিলো সপ্তাহে দুই দিন। প্রতি হাটবার বৃহস্প্রতি ও রবিবার। এদিকে দিন এনে দিন খাওয়া মানুষগুলো যে কেমনে চলছে দিন সে দিকটা মোড়লগণ একেবারেই ভাবতোনা। তবে মোড়লদের মধ্যে যাদের পরিবারের কর্তৃগণ হৃদয়বান ছিল তারা গোপনে হতদরিদ্র পরিবারের গৃহিনীদেরকে ডেকে নিয়ে টুকটাক হাত ফরমাইজ করাইয়ে ধান থাকলে ধান চাল থাকলে চাল আটা গম কিংবা পেরার ছাতু যাই থাকতো তার হাতে দিয়ে দিতো গৃহিনীগুলো ওসব পেয়ে কি যে খুশি হতো কাউকে বলে বুঝানো যবেনা।
যাদের কোন বাচ্চাকাচ্চা ছিলোনা তারা মোড়ল বাড়ির উঠানে গাছের ছায়ার নীচে বসে বসে নকসীকাঁথা সেলাই করে দিতো। কেউ দস্তরখানা সেলাই কেউ আবার,ঢেঁকিভানা বিনিময়ে না হলেও সকালে একটা আটার পিঠা একগ্লাস পানি খেয়ে হরহামেশাই দুপুরবধি কাজ করে দিতো।
স্বামী দিনশেষে একপোয়া চাল গামছার মাথায় বেঁধে জোরকদম বাড়ি ফিরতো। উঠানে এসেই হাক দিতো -কইগো অমুক কই গেলা। নাম বানেছা হলে বানেছা পরি, আনেছা হলে আনেছা পরি কইয়া চিল্লায় চিল্লায় ডাকতো। যদি মুখে একটু হাসির আভাস দেখতে পাইতো স্বামী খুশি হয়ে বলতো, তাইলে আইজ মোড়লবাড়ি কিছু খাইতে পারছিলা শত বেদনার মাঝেও হাসি উপচে পড়তো দুজনার।
১৯৮৫ সাল। আমি তখন ক্লাস ফাইভে পড়ি। ধানকাঁটার পুরো মৌসুম শুরু হয়ে গেছে। কাহালু নামের আমাদের একজন বছর মাইনে কামলা ছিল। বয়স ছিল ৫০ ছুই ছুই। আমরা সংক্ষেপে হালু চাচা বলে ডাকতাম। হালু চাচার একটা বদ অভ্যাস ছিলো রীতিমতো বিড়ি টানতো। যদিও রাতদিন যক্ষা রোগীর মত খকখক করে কাঁশতো। এ নিয়ে বাবা তাকে অনেকবার বিড়ি টানতে বারণ করেছে কোন কাজে আসেনি। বরং বিড়ি টানতে বারণ করলে নাকি নেশা আরও দ্বিগুন বেড়ে যায়।
সেদিন ভোরবেলা। উঠানে ‘হেই হেই, যা যা’ ডাইনে যাহ বামে যাহ, ঘুরঘুরঘুর, নানা শব্দে আমার ঘুম ভেংগে যায়। জানালা খুলে তাকিয়ে দেখি হাদু চাচা মলন দিচ্ছে।
চাচার সাথে আমার সেই রকম দহরম মহরম। আমাকে পেলেই জ্যাঠা, জ্যাঠা তার মুখের মিষ্টি কথার আদরেই পাগল হয়ে যেতাম তারউপর রাতভর আনেছা পরি, বানেছা পরি, রহিম বাদশার মত অসংখ্য রুপকথার গল্প শুনাতো। বিশেষ করে রুপকথার গল্প চাচা এমনভাবে জ্যোৎস্না রাতে শুনাতো দিব্বি নিজেই এক্সেনো পরিস্থানে কখনও মেঘের কোলে ভেসে বেড়াতাম। আর একারণেই আমিও তার কথামত যখন যা বলত তাই করে দিতাম।
বহুবার মাকে না বলেই মাচার উপর থেকে পাকা ভেইমটে কলা, মুড়ির টিন খুলে মুড়ি এনে চাচাকে দিতাম। কোন দিন যদি কলা না থাকতো কইতো জ্যাঠা যাও কয়ড়্যা কাচা মরিচ আনো।আহ কি যে মজা করে খাইতো চাচা আজও মনে পড়ে।
এভাবেই আমাদের চাচা ভাতিজার সখ্যতা গড়ে উঠেছিল। তো সেদিন চোখ কচলাতে কচলাতে চাচার কাছে গিয়ে দাড়াইছি মাত্র। আমাকে দেখেই সে যেন আরেকটা প্রাণ ফিরে পেলো। দারুন উচ্ছাসে জ্যাঠা জ্যাঠা আইছো।
আমি জানতাম তুমি আমার শব্দ পেলেই ছুইটে আসবা আর হে কারণে জোরে জোরে মলন খেদাইছি। আমি খুব বেশি উচ্ছ্বসিত হতে পারি নাই কারণ তখনও ঘুম আমার চোখ ভরা।
এবার চাচা, আমার হাতটা ধরে বললো, জ্যাঠা, একটা কাম করতে পারবা। কি কাম? বাপুরে বিড়ি খাওয়াত এতো নেশা হইছে যে সারা রাত ঘুমাইতে পারি নাই। তাই আইসে রাইত থাকতেই মলন জুড়ছি। তুমি আলগুস্তে তোমাদের ঘরে যাও। তোমার আব্বার শিতনে দেখবা পাঞ্জাবি আছে খাটের উপর। আলগুস্তে পকেট থেকে একটা বিড়ি নিবা আর ম্যাচটা নিবা। নিয়ে খাটের নীচে মাথা দিয়ে বিড়িটা লাগাই নিয়ে আইবা। টের পায়না যেনো।
প্রথমে আমি পারবোনা বলে মানা করলাম। কিন্তু নাছুড় বান্দা বিড়ির নেশা বলে কথা। এমন করে তোষামোদ করতে লাগলো যে আমি না এনে দিয়ে পারলাম না।
কিন্তু সে কি আর আনা হলো। তুলকামাল কান্ড। আমি বাবার পাঞ্জাবি ধরছি মাত্রই বাবা টের পাইছে। একএক করে আমার সকল কর্মকান্ড বাবা পরখ করছে। যখনি খাটের নীচে মাথাটা দিয়ে বিড়িটা মুখে ধরে ম্যাচে খুচা দিছি।
ক্যাড়ার? ক্যাড়ারে? একেবারে লাফ দিয়ে উঠেই শুরু করলো চড় থাপ্পর। চিল্লাচিল্লিতে মায়ের তাৎক্ষণিক ঘুম ভাংগলে মা আমাকে বাবার প্রহার থেকে বাঁচিয়ে দরজা দিয়ে বের করে দিলো।