• ঢাকা, বাংলাদেশ মঙ্গলবার, ০৯ জুন ২০২৬, ০৪:১৬ পূর্বাহ্ন
  • [কনভাটার]

জাতীয় পতাকার নকশার প্রকৃত ইতিহাস

রিপোর্টারের নাম / ১৯৬ জন দেখেছে
আপডেট : শুক্রবার, ১৩ ডিসেম্বর, ২০২৪

ফেইসবুক এর পাতায় ছোখে পড়লো Kamrul Hassan ভাই যিনি বরাবর সুন্দর লিখা পোস্ট করে থাকেন। এবারের লেখাটাও বেশ সমসাময়িক প্রেক্ষাপটের। লেখাটিতে মন্তব্য করেছেন দেশের নামীদামী কবি সাহিত্যিক কলামিস্টগণ। শ্রদ্ধেয় কামরুল হাসান ভাইয়ের লেখাটি ছিল:
বাংলাদেশের লাল-সবুজ পতাকা বাংলার সবুজ প্রান্তরে উদিত স্বাধীনতার লাল সূর্যকে ধারণ করে। ধারণ করে ১৯৭১-এ মুক্তিকামী সাত কোটি বাঙালির আকাঙ্ক্ষা ‍ও স্বপ্নকে। কোটি প্রাণের প্রতীক ওই লাল সবুজ পতাকা। সবুজ আয়তক্ষেত্রের মাঝে স্থাপিত লাল বৃত্তের এ পতাকাটি কে নকশা করেছেন, কার মাথায় প্রথম এসেছিল সৃজনশীল মহৎ ধারণাটি― তা নিয়ে বিতর্ক কম নয়। সবাই জানে, উইকিপিডিয়াও লিখেছে জাতীয় পতাকার নকশা করেছেন শিব নারায়ণ দাস। উইকিপিডিয়ায় আরও যে তথ্য মেলে তা হলো জাতীয় পতাকার নকশা করেছেন পটুয়া কামরুল হাসান। আসলে উইকিপিডিয়া তো তাই জানে যা জানে মানুষ, কারণ মানুষই তাতে লেখে, লিপিবদ্ধ করে তাদের অর্জিত ধারণা, জ্ঞান, অভিজ্ঞতা।

প্রকৃত ইতিহাস হলো জাতীয় পতাকার নকশা করেছেন খালেদা বেগম মঞ্জি নামের এক গোপন বিপ্লবী যিনি এ কৃতিত্বের সাথে জড়িয়ে নেন তার স্বামী ও সহযোদ্ধা সামিউল্লাহ আজমীকে। উল্লেখ করা প্রয়োজন এরা দুজনেই ছিলেন কমরেড সিরাজ সিকদারের নেতৃত্বাধীন পূর্ববাংলা শ্রমিক আন্দোলনের সার্বক্ষণিক কর্মী। পূর্ববাংলা শ্রমিক আন্দোলন গঠিত হয় ১৯৬৮ সালে এবং শুরু থেকেই এর ম্যানিফেস্টো ছিল পূর্ববাংলা বা বাংলাদেশের স্বাধীনতা। প্রকাশ্য রাজনৈতিক দলগুলো, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগই যার নেতৃত্বে, যখন সর্বোচ্চ স্বায়ত্তশাসনের দাবী তুলছিল, তখন একটি গোপন বামপন্থী সংগঠন, তখনও পার্টি হয়ে ওঠেনি, স্বাধীনতার দাবী তুলেছিল। এটিও ইতিহাস, যা লিপিবদ্ধ হয়নি।

একাত্তরের টালমাটাল অগ্নিগর্ভ দিনগুলোয়, পশ্চিম পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠি যখন শান্তিপূর্ণভাবে শেখ মুজিবের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরে টালবাহানা করছিল, যখন মূর্ত হয়ে উঠছিল স্বাধীনতার অনিবার্যতা, তখন খালেদা বেগম মঞ্জি পতাকার নকশাটি আঁকেন। তিনি এ নকশা সংগঠন প্রধান সিরাজ সিকদার ও অন্যান্য কমরেডদের দেখান। স্বাধীনতাকামী বামপন্থী দলগুলোর এক সমন্বয়সভায় সিরাজ সিকদার জাতীয় পতাকার নকশাটি নিয়ে যান। সেখান থেকেই নকশাটি ‘চুরি’ হয়ে যায়। আওয়ামী লীগের অঙ্গসংগঠন ছাত্রলীগের নেতা আসম আবদুর রব মার্চের ২ তারিখে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা ভবনের সম্মুখে যে পতাকাটি উত্তোলন করেন তা ছিল এই নকশার। শিবনারায়ন দাস সেই পতাকটি সেলাই মেশিনে সেলাই করেছিলেন মাত্র। দর্জির নাম কী করে নকশাবিদের নাম হলো সে ইতিহাস অনুসন্ধানের প্রয়োজন আছে। সামিউল্লাহ আজমীর নেতৃত্বে পূর্ববাংলা শ্রমিক আন্দোলন মার্চের ৮ তারিখে এ পতাকা উত্তোলন করে তৎকালীন বিএনআর অফিসের সম্মুখে (জাতীয় প্রেসক্লাবের বিপরীতে ছিল বিএনআর)।

এ পতাকা যে তাদের নিজেদের নকশা করা নয় তা জানত আওয়ামী লীগ নেতারা। নকশাটিকে আলাদা করে নিতে তারা লাল বৃত্তের মাঝে বাংলাদেশের মানচিত্র হলুদ রঙে রাঙিয়ে বসিয়ে দেন। মুক্তিযুদ্ধের নয় মাস বাংলাদেশের পতাকার নকশা ছিল ওই― আয়তকার সবুজ পটভূমিতে লাল বৃত্ত, বৃত্তের মাঝে বসানো হলুদ রঙে অঙ্কিত বাংলাদেশের মানচিত্র। যেহেতু মানচিত্র সঠিকভাবে আঁকা ও বসানো হচ্ছিল না, বিকৃতি হচ্ছিল মানচিত্রের, বাংলাদেশ স্বাধীন হবার পরে সরকার পতাকা থেকে মানচিত্র তুলে নেয়, পতাকা ফিরে আসে তার আদিরূপে। পটুয়া কামরুল হাসান এর সঠিক মাপজোখ, পতাকার দৈর্ঘ্য, প্রস্থ, বৃত্তের ব্যাসার্ধ,আয়তক্ষেত্রটির ঠিক কোথায় বসবে বৃত্তটি― এসব ঠিক করে দেন। তিনি এর রঙও ঠিক করে দেন― কেননা সবুজের অনেক শেড (Shade) বা ভেরিয়েশন (Variation), লালেরও অনেক শেড ও ভেরিয়েশন রয়েছে।

বহুকাল ধরে মিথ্যা কৃতিত্ব নিয়েছেন শিব নারায়ণ দাস। বা বলা যায় তাকে আমরা ভুল কৃতিত্ব দিয়েছি। এর কারণ যিনি প্রকৃত নকশাকার তিনি আত্মপ্রচারবাদী নন, বরং খুবই লুকিয়ে রাখেন তাঁর পরিচয়। ধারণা করি গোপন সশস্ত্র দলে বহুকাল লুকিয়ে থেকে রাজনীতি করে তার ওই স্বভাবটি অর্জিত হয়েছে। তিনি যে এক গৌরবময় ইতিহাসে যুক্ত হতে পেরেছেন, রেখেছেন অমোচনীয় এক সাক্ষর― তাতেই তিনি আনন্দিত। আমরা যারা তাকে ঘনিষ্ঠভাবে চিনি তারা জানি ইতিহাসের এক অমলিন যুগসন্ধিক্ষণে কী অসামান্য গৌরবের কাজটি তিনি করেছেন।

বলা ভালো খালেদা বেগম মঞ্জি কোচবিহার শহরে জন্মগ্রহণ করেন। দেশবিভাগের পর তার পবিবারের একাংশ বাংলাদেশে চলে আসে, কেউ কেউ রয়ে যায় কোচবিহারে। সামিউল্লাহ আজমীর বাড়ি উত্তরপ্রদেশে। ১৯৭১ এ তিনি একদল মুক্তিযোদ্ধা নিয়ে মুক্তিযুদ্ধ করছিলেন সাভার অঞ্চলে। সাভারের একটি বিরাট এলাকা তিনি শত্রুমুক্ত করেছিলেন। পরিতাপ ও ঘৃণার বিষয় এই মহান দেশপ্রেমিককে তার নয়জন সহেয়োদ্ধাসহ যৌথভাবে পাকবাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াই করার মিথ্যে প্রস্তাব দিয়ে ডেকে নিয়ে টাঙ্গাইলের এক বাড়িতে ঘুমন্ত অবস্থায় রাতের আঁধারে হত্যা করে কাদের সিদ্দিকীর বাহিনী।

বাংলাদেশে ইতিহাস বিকৃতি ঘটেছে প্রচুর। একপেশে ইতিহাস শুনতে শুনতে আমাদের কান ভারী হয়েছে। সব কৃতিত্ব এক নেতা আর এক দলকে দেবার ইতিহাস থেকে বেরিয়ে এসে সময় এসেছে সত্য উদঘাটনের। কারণ সত্য সত্যই, ইতিহাস ইতিহাসই। তা জানার অধিকার আছে আমাদের সকলের।

কামরুল হাসান ভাইয়ের লেখাটির বিপরীতে অনেক জ্ঞাণী জনের মন্তব্য এসেছে তাদের মধ্যে প্রথম মন্তব্যটি করেছেন লেখিকা হাসিদা মুন তিনি তার মন্তব্যে লিখেন, সত্যের নিজস্ব এক ভিত্তি আছে- সহজে নড়ানো যায় না, আপন মহিমায় প্রকাশ পায়।

আরেক মন্তব্যে Mahbub Shawkat লিখেছে,
আপনার লেখায় নতুন তিনটি তথ্য আছে।
১. খালেদা মঞ্জি জাতীয় পতাকার নকশাকার।
২. ছাত্রলীগ গোপনে সেই নকশা চুরি করেছে।
৩. সামিউল্লাহ আজমী সহ নয়জনকে ডেকে নিয়ে টাঙ্গাইলে ঘুমন্ত অবস্থায় মেরে ফেলা।

বিজয় দিবসের প্রাক্কালে আপনার এই লেখা নিয়ে না জানি কতো বিতর্ক হয়।

Mahmud Hafiz তিনি লেখাটি পড়ে ব্যক্তিগত সমালোচনা করে বলেন যে কোন ইতিহাস লেখা ও পরিচিত হয়ে ওঠার শুরুতে বিকৃতি অগৃহীত না হলে তা প্রতিষ্ঠা পেয়ে যায়। আপনার এই তথ্য এখন গবেষকদের গবেষণার আকর হতে পারে। প্রতিষ্ঠিত ইতিহাসের বিপরীতে এ প্রায় বিপরীতধর্মী তথ্য। এই লেখা পূর্ব ইতিহাসের বিপরীতে কতোটা প্রতিষ্ঠিত হতে পারে জানি না, তবে তা নিয়ে এন্তার বিতর্কের সুযোগ আছে।

Mahmud Hafiz ভাই এর মন্তব্যের বিপরীতে লেখক কামরুল হাসান ভাই লিখেন, তালিকায় নাম ওঠালেই যেমন কেউ মুক্তিযোদ্ধা হয়ে যায় না, তেমনি false claim করেও কেউ পতাকার নকশাকার হতে পারবেন না।

Alpona Chakma লিখেন, মনে হয় নারী বলেই কেউ ততোটাও গুরুত্ব দেয়নি। যাইহোক, চমকপ্রদ একটি তথ্য তুলে ধরেছেন, আপনার এই লেখা না পড়লে আমাদের মতো সাধারণদের পক্ষে কখনো জাতীয় পতাকা নিয়ে আসল ইতিহাস জানা সম্ভব হতো না। আপনাকে ধন্যবাদ এবং শুভকামনা জানাই।

Jahan E Gulshan মন্তব্য করে বলেন, ইতিহাসের প্রকৃত সত্য তুলে ধরবার জন্য অসংখ্য ধন্যবাদ কামরুল ভাই। খালেদা বেগম মন্জি, কমরেড তাহেরদের অবদানের গৌরবময় স্বকৃীতি এই জাতি দেরিতে হলেও দেবেন, প্রত্যাশা করি। মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত ইতিহাসের প্রকৃত নায়কদের লাল সালাম♥️


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরও সংবাদ