• ঢাকা, বাংলাদেশ সোমবার, ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৬:৩৬ অপরাহ্ন
  • [কনভাটার]

আমার ঠিকানা তাই বৃদ্ধাশ্রম

রিপোর্টারের নাম / ২১৩ জন দেখেছে
আপডেট : মঙ্গলবার, ২৪ ডিসেম্বর, ২০২৪

আমার ঠিকানা তাই বৃদ্ধাশ্রম – ভারতের নচিকেতা চক্রবর্তীর কন্ঠে এই গান ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়েছে। বহু মানুষ এই গান শুনে চোখের পানিতে বুক ভাসিয়েছেন। হৃদয় ছোঁয়া এই গান শুনে এবং গেয়ে কেউ কেউ নিজেদের স্বান্তনা দেবার চেষ্টা করে। জনপ্রিয় এই গানের শ্রোতাদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা রেখে কয়েকটি প্রশ্ন উত্থাপন করতে করতে চাই। খোকার বাবার আমলের আসবাব পত্র,ঘড়ি, ছড়ি সারাজীবন সংরক্ষণ করতে হবে? খোকার লালন পালন সবাই কি একই ভাবে করে না?খোকার সাথেই থাকতে হবে কেন? একশো বছর বেঁচে থেকে খোকাকে বৃদ্ধাশ্রমে পাবার মানসিকতা কতখানি গ্রহণযোগ্য? নিজকে কমদামি ভাবতে হবে কেন?বৃদ্ধাশ্রম কি জেলখানা? খোকার পদ পদবীকে ‘ মস্ত অফিসার ‘ বলে ব্যঙ্গ করা কতটুকু শোভন হয়েছে? এই প্রশ্ন গুলোর মিমাংসা জরুরি হয়ে পড়েছে।

প্রথমত আসবাব পত্র, বাসাবাড়ি, থালা বাসন,হাঁড়ি পাতিল প্রতিনিয়ত নানা কারণে পরিবর্তন করতে হয়। কোন ব্যক্তির আয় রোজগার কম থাকার সময় কিংবা জীবনের শুরুতে ছোট ফ্ল্যাটে বা ঘরে বসবাস করতে হয়েছে। এখন সামর্থ্য হয়েছে বড় ফ্ল্যাটে থাকে অথবা আলীশান বাড়িতে থাকার সুযোগ হয়েছে। মানুষ তো এই সুযোগ করবে। পুরাতন আসবাব পত্র নিয়ে উঠতে হবে কেন? নতুন ফার্নিচার, পর্দা,সোফা, ডাইনিং টেবিল, হাঁড়ি পাতিল,চুলা, ওভেন,ফ্রীজ,গীজার কিনতে হবে না? পুরনো আসবাবপত্রের উপর জীবন চালিয়ে দিতে হবে? নাতি নাতনিরা ও এসব স্মৃতি আঁকড়ে পড়ে থাকবে? স্মৃতি সংরক্ষণ করতে থাকলে উন্নয়ন মুখ থুবড়ে পড়ে থাকবে। সব পরিবারে নানান রকমের স্মৃতি থাকে সে সব সংরক্ষণ করতে শুরু করলে সারা দেশকে যাদুঘর বানিয়ে ফেলতে হবে। মানুষকে বেশি অতীত মুখী করে কি অর্জন হবে? মানুষকে কি অতীতে বসবাস করতে হবে? সন্তান লালন পালনের আকুলতা প্রকৃতি প্রদত্ত সহজাত প্রবৃত্তি। প্রাণী জগতে সকল প্রাণী অনেক কষ্ট করে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বাচ্চা পালন করে। বাচ্চা পালনে মায়ের বড় ধরনের ভূমিকা থাকে। এই ভূমিকা পালনের জন্য কোন প্রাণীই সন্তানের কাছে কোন কিছু প্রত্যাশা করে না।

মা জীবন বাজী রেখে সন্তানকে যোগ্য করে গড়ে তোলার চেষ্টা চালায়।মা নিজের মৃত্যুর বিনিময়ে সন্তান রক্ষা করে। সন্তানের সাথে মায়ের সম্পর্ক শর্তহীন। দেশে হাজার হাজার শিশুকে বোর্ডিং স্কুল, এতিমখানা, লিল্লাহ বোর্ডিং এ পাঠানো হয়।বহু শিশু ডে কেয়ার সেন্টারে দিনের প্রায় পুরো সময় ধরে থাকে কিংবা বাসায় গৃহকর্মীর তত্ত্বাবধানে থাকে। মায়ের অভাব নিয়ে বড় হওয়া শিশুদের মনোবেদনা নিয়ে তো কোন গান হয়না!

কখনো কখনো সন্তান ফেলে মা চলে যায়। অনেক কর্মজীবী মা সন্তানকে নানি কিংবা দাদির কাছে রেখে আসে। বাবা মা দুজন কর্মজীবী হলে সন্তান বাবার কাছে থাকার ঘটনা চোখে পড়ে। এসব সন্তান মায়ের অভাব নিয়ে অনাদরে অবহেলায় বড় হয়।নচিকেতার গানটি বিদ্বেষ মূলক যা গ্রহণ করা ন্যায় সঙ্গত নয়।

গানের মা কতটা প্রতিহিংসা পরায়ন হলে একশো বছর বাঁচতে চেয়েছেন শুধুমাত্র ছেলেকে একই বৃদ্ধাশ্রমে পাবার আশায়। নিজের জীবনের বিনিময়ে মা সন্তানকে রক্ষা করে আর গানের মা নিজের প্রাপ্ত কস্ট সন্তানকে ভোগ করতে দিতে চান। এ যেনো চোখের বদলে চোখ তোলার দাবি। খোকার মা নিজেকে সবচেয়ে কমদামি বলে অভিহিত করেছেন। মা নিজেকে এতটা তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে না ভাবলেও চলতো।সংসারে কার কত দাম তার মূল্য তালিকা টাঙানো থাকে না। জীবনের শেষ দিনগুলোতে সন্তানের সাথে থাকা, সেবা যত্ন পাওয়া গেলে জীবন অনেক মূল্যবান কিংবা দামী হবে এটা ভাবার কোন মানে হয় না। বহু মানুষের ছেলে মেয়ে বিদেশে চাকরি করে কিংবা পড়তে যায়। চাকরি ব্যবসা বানিজ্যের কারণে মানুষের কর্মক্ষেত্র পরিবর্তন হয়ে যায় ফলে সাধ থাকলে ও সাধ্য থাকে না বাবা মাকে নিজের সাথে রাখতে। আবার যাঁরা আদরের খোকার সাথে থাকেন তাঁরা আনন্দে আহ্লাদে আছেন তাও শোনা যায় না। জীবনের লক্ষ্য শুধু সন্তানের সাথে থাকতে পারা নয়।লক্ষ্য হবে শান্তি পূর্ণ স্বস্তি দায়ক জীবন। একা একা এরকম জীবন পাওয়া দুস্কর।সবাইকে যুক্ত করে ন্যায় ভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা চালিয়ে যাওয়ার মধ্যে শান্তি ও স্বস্তি নিহিত আছে।

মানুষ জীবন যাপনে আত্মকেন্দ্রিক আর সেবা পাবার ক্ষেত্রে সামাজিক। বড়ই বিচিত্র মনোভাব!
বৃদ্ধাশ্রমকে জেল খানা হিসেবে বিবেচনা করলে ভুল হবে। সামাজিক পরিবর্তনের ফলে যৌথ পরিবার বিলুপ্ত হবার পথে। একক পরিবার নানা কারণে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। স্বামী স্ত্রীর কর্মস্থল পর্যন্ত আলাদা হয়ে গেছে। ছেলে মেয়ে কে বোর্ডিং স্কুলে দিতে বাধ্য হচ্ছে। সন্তান লালন পালন কে করবে এসব দুঃশ্চিন্তায় দম্পতিরা সন্তান নিতে অনাগ্রহী হয়ে উঠেছে।

মান সম্পন্ন বৃদ্ধাশ্রমে প্রবীণরা বরং ভালো থাকেন।আমাদের তরুণ তরুণীরা প্রতিনিয়ত নানা ধরনের সংকটের কবলে পড়ে দিশেহারা। অনেক সময় তারা কাংখিত লক্ষ্যে পৌঁছাতে ব্যর্থ হয়।ফলে তৈরি হয় হতাশা, আসে সংকট, জাগে উৎকন্ঠা।আজকের তরুণদের ক্যারিয়ার,উচ্চ শিক্ষা, প্রতিষ্ঠা লাভ, উদ্যোক্তা হবার জন্য নানান ধরনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হচ্ছে। এই সময়ে তাদেরকে নচিকেতার গান ইমোশনাল চ্যালেঞ্জ তৈরি করবে। মনে রাখতে হবে, সন্তান বাবা মার মাধ্যমে পৃথিবীতে আসলেও সে সমাজের সম্পদ।মানুষ সামাজিক জীব তাই বার্ধক্য মোকাবিলা সমাজ কে প্রধান ভূমিকা পালন করতে হবে।

খোকার মা খোকাকে ‘ মস্ত অফিসার ‘ বলে ব্যঙ্গ করাটা অশোভন হয়েছে। সব বাবা মা সন্তানকে ভালো মানুষ হবার চাইতে বড় অফিসার হিসেবে দেখতে পছন্দ করে। বড় অফিসারের বড় ক্ষমতা, দাপট, আয় রোজগার, গাড়ি বাড়ি দেখে নিজের সন্তানকে সেই জায়গায় নেবার জন্য ব্যাকুল হয়ে উঠেন।নানা কারণে আমাদের দেশের বড় অফিসারদের প্রতি নেতিবাচক মনোভাব তৈরি হয়ে আছে। নচিকেতার গান বড় অফিসারদের প্রতি বিরক্তি বাড়াতে সহায়তা করবে। আমি একজন মাকে জানি যাঁর দশটি সন্তান রয়েছে। তাঁরা সবাই উচচ শিক্ষিত এবং স্ব স্ব ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত। মা নিজ বাড়িতে স্বেচ্ছায় একা থাকেন।তাঁকে আমি আক্ষেপ করে বলতে শুনেছি, আমার একটা সন্তান মুর্খ থাকলে এখন আমার সাথে থাকতো। আমাদের প্রবীণদের মধ্যে মেনে নেয়া, মানিয়ে চলার, নতুন পরিস্থিতিকে সহজ ভাবে গ্রহণ করার মানসিকতা কতখানি তা চিন্তা করার সময় এখনই। বৃদ্ধাশ্রম নিয়ে নচিকেতার এই একটি গান আমাদের চিন্তা ভাবনায় সন্তানের প্রতি বিরূপ মনোভাব তৈরি করতে সহায়তা করছে।

সকল নেতিবাচক বিষয়ের একটি ইতিবাচক দিক থাকে । এই গানটির ইতিবাচক দিক হলো,ছেলে মস্ত অফিসার হলে মাকে বৃদ্ধাশ্রমে পাঠায়।ফলে মানুষ আগে থাকতেই মানসিকভাবে প্রস্তুতি নিতে থাকবেন।

ছেলের উপর ভরসা করা বোকামি এটা মনের মধ্যে গেঁথে থাকবে। সন্তান নির্ভর প্রবীণ জীবন ঝুঁকি পূর্ণ হবে বিধায় সমাজ নির্ভর প্রবীণ জীবনের প্রস্তুতি শুরু করবে। মানুষ শুধু সন্তান লালন পালন করে না,সমাজকে নানা ভাবে পালন করে, সেবা দেয়,কর-ভ্যাট দেয়। ফলে বার্ধক্যের দায় শুধু সন্তানের নয় সমাজএবং রাস্ট্রের।

তাই প্রবীণদের নানা ধরনের সামাজিক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলে বার্ধক্যকে স্বস্তি দায়ক এবং শান্তি পূর্ণ করতে হবে। প্রবীণরাই তাঁদের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে প্রধান ভূমিকা পালন করতে এগিয়ে আসবে। নচিকেতার গান গেয়ে, শুনে সমস্যার সমাধান হবে কিনা তাতে অনেক সন্দেহ আছে।

 


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরও সংবাদ

Archive Calendar

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
 
১০১১১২১৩
১৪১৫১৬১৭১৮১৯২০
২১২২২৩২৪২৫২৬২৭
২৮২৯৩০