বিশ্বের ইতিহাস বলতে এখানে পৃথিবী নামক গ্রহে বসবাসকারী মানবজাতির ইতিহাস বোঝানো হয়েছে, গ্রহ হিসেবে পৃথিবীর ইতিহাস নয়। মানুষের ইতিহাস মূলত পুরাপ্রস্তর যুগে পৃথিবী জুড়ে শুরু হয়। আদিম যুগ থেকে প্রাপ্ত সকল প্রত্নতাত্ত্বিক ও লিখিত দলিল এর আওতাভুক্ত। লিখন পদ্ধতি আবিষ্কারের মধ্য দিয়ে প্রাচীন প্রামাণ্য ইতিহাসের শুরু হয়। যদিও লিখন পদ্ধতি আবিষ্কারের পূর্ববর্তী যুগেও সভ্যতার নিদর্শন পাওয়া গেছে। প্রাগৈতিহাসিক যুগের সূচনা ঘটে পুরাপ্রস্তর যুগে। সেখান থেকে সভ্যতা প্রবেশ করে নব্যপ্রস্তর যুগে এবং এসময় কৃষি বিপ্লবের (খ্রিস্টপূর্ব ৮০০০-খ্রিস্টপূর্ব ৫০০০ অব্দ) সূচনা ঘটে। নব্যপ্রস্তর যুগের বিপ্লবে উদ্ভিদ ও পশুর গৃহপালন এবং নিয়মানুগ কৃষিপদ্ধতি রপ্ত করা মানব সভ্যতার একটি অনন্য মাইলফলক হিসেবে চিহ্নিত। কৃষির উন্নয়নের সঙ্গে সঙ্গে বেশির ভাগ মানুষ যাযাবর জীবনযাত্রা ত্যাগ করে স্থায়ীভাবে কৃষকের জীবন গ্রহণ করে। তবে বহু সমাজে যাযাবর জীবনব্যবস্থা রয়ে যায়, বিশেষ করে ভৌগোলিকভাবে বিচ্ছিন্ন অঞ্চলগুলিতে ও যেখানে আবাদযোগ্য উদ্ভিদ প্রজাতির অভাব ছিল। কৃষি থেকে প্রাপ্ত খাদ্য নিরাপত্তা ও উদ্বৃত্ত উৎপাদনের ফলে গোষ্ঠীগুলি ধীরে ধীরে বৃদ্ধি পেয়ে আরও বড় সামাজিক প্রতিষ্ঠানের জন্ম দেয়। যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নও এক্ষেত্রে একটি উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখে।
কৃষির উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে শস্য উৎপাদন ব্যবস্থারও বিকাশ ঘটে, যা সমাজে শ্রমবিভাগকে ত্বরান্বিত করে। শ্রমবিভাগের পথ ধরে সমাজে সুবিধাপ্রাপ্ত উচ্চশ্রেণীর উন্মেষ ঘটে ও শহরগুলো গড়ে উঠে। সমাজে জটিলতা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে লিখন ও হিসাব পদ্ধতির ব্যবহার জরুরি হয়ে পড়ে। হ্রদ ও নদী তীরবর্তী এলাকাগুলোতে খ্রিস্টপূর্ব ৩০০০ অব্দের মধ্যে অনেক শহর গড়ে উঠে। এদের মধ্যে উন্নতি ও উৎকর্ষতার দিক দিয়ে মেসোপটেমিয়ার সভ্যতা, মিশরের নীল নদ তীরবর্তী সভ্যতা ও সিন্ধু সভ্যতা উল্লেখ্যযোগ্য। একই ধরনের সভ্যতা সম্ভবত চিনের প্রধান নদীগুলোর তীরেও গড়ে উঠেছিল কিন্তু প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনগুলো থেকে এব্যাপারে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়া সম্ভব হয়নি।
প্রাচীন পৃথিবীর (প্রধানত ইউরোপ, তবে নিকট প্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকাও এর অন্তর্ভুক্ত) ইতিহাসকে কয়েকটি ভাগে ভাগ করা হয়। ৪৬৭ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত প্রাচীন যুগ; পঞ্চম থেকে পঞ্চদশ শতাব্দী পর্যন্ত মধ্য যুগ বা ধ্রুপদী-উত্তর যুগ, যার মধ্যে রয়েছে ইসলামি স্বর্ণযুগ(৭৫০- ১২৫৮ খ্রিষ্টাব্দ) ও ইউরোপীয় রেনেসাঁ (১৩শ শতক থেকে শুরু)। আধুনিক যুগের সূচনাকাল ধরা হয় ১৫শ শতক থেকে ১৮শ শতকের শেষ পর্যন্ত যার মধ্যে রয়েছে ইউরোপের আলোকিত যুগ। শিল্প বিপ্লব হতে বর্তমান সময় পর্যন্ত আধুনিক যুগ বলে বিবেচিত। পাশ্চাত্য ইতিহাসে রোমের পতনকে প্রাচীন যুগের শেষ ও মধ্যযুগের সূচনা হিসেবে ধরা হয়। কিন্তু পূর্ব ইউরোপ রোমান সাম্রাজ্য থেকে বাইজেনটাইন সাম্রাজের অধীনে আসে, যার পতন আরো অনেক পরে ঘটে। ১৫ শতকের মাঝামাঝি গুটেনবার্গ আধুনিক ছাপাখানা আবিষ্কার করেন যা যোগাযোগের ক্ষেত্রে বৈপ্লবিক পরিবর্তন নিয়ে আসে। ফলে মধ্যযুগের সমাপ্তি ঘটে এবং বৈজ্ঞানিক বিপ্লবের সূত্রপাত হয়। ১৮ শতকের মধ্যে ইউরোপে জ্ঞান-বিজ্ঞানের প্রসার এমন একটি চরম অবস্থায় উপনীত হয় যা শিল্প বিপ্লবকে অবধারিত করে তুলে।
বিশ্বের অন্যান্য অংশে, বিশেষ করে প্রাচীন নিকট প্রাচ্য, প্রাচীন চীন ও প্রাচীন ভারতে সভ্যতা ভিন্নভাবে বিবর্তিত হয়, যেমন চিনের চার অনন্য আবিষ্কার, ইসলামের স্বর্ণযুগ, ভারতীয় গণিত। তবে ১৮ শতকের পর হতে ব্যাপক ব্যবসা-বাণিজ্য ও উপনিবেশায়নের ফলে সভ্যতাগুলো বিশ্বায়িত হতে থাকে। গত পাঁচশো বছরে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার, জ্ঞান-বিজ্ঞান, ব্যবসা-বাণিজ্য, অস্ত্রের ধ্বংসক্ষমতা, পরিবেশগত ক্ষতি প্রভৃতি অসামান্য গতিতে বৃদ্ধি পেয়েছে, যা বর্তমান বিশ্বের মানুষের সামনে একই সঙ্গে ব্যাপক সম্ভাবনা ও বিপদ এর দ্বার উন্মোচন করেছে।
বিজ্ঞানীদের মতে পৃথিবীতে আজ থেকে প্রায় ৩৮০ কোটি বছর আগে জীবনের উদ্ভব।[২৯] কিন্তু আধুনিক মানব-সদৃশ জীব তথা হোমিনিডদের আবির্ভাব ঘটে আজ থেকে প্রায় ৭০ লক্ষ বছর আগে। তারা প্রাইমেট বর্গীয় জীবদের মত গাছের উপরে বসবাস করত। ফসিল বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে আজ থেকে প্রায় ৪০ লক্ষ বছর আগে আফ্রিকা মহাদেশে অস্ট্রালোপিথেকাস জাতীয় প্রাণীরা বাস করত (অস্ট্রালোপিথেকাস অর্থ “দক্ষিণাঞ্চলীয় এপ”)। ১৯৭৪ সালে ইথিওপিয়াতে ৩০ লক্ষ বছরের পুরনো একটি অস্ট্রালোপিথেকাস প্রাণীর ফসিলের সন্ধান পাওয়া যায়, যার নাম লুসি। অস্ট্রালোপিথেকাসরা মাটিতে দুই পায়ে হাঁটতে পারত। এরপর আজ থেকে ২৫ থেকে ১৫ লক্ষ বছর আগে আফ্রিকাতে হোমো হাবিলিস (অর্থাৎ “হাতের কাজে পটু মানব”) নামের প্রাণীর আবির্ভাব ঘটে, যাদেরকে প্রথম যথার্থ মানব হিসেবে গণ্য করা যায়। তাদের মস্তিষ্ক বড় ছিল এবং তারাই প্রথম লাঠি ও পাথর দিয়ে বানানো হাতিয়ার ব্যবহার করা শুরু করে। এর ১০ লক্ষ বছর পরে, অর্থাৎ আজ থেকে ১৫ লক্ষ বছর আগে হোমো ইরেক্টাস (“দণ্ডায়মান মানব”) নামক আরেকটি মানব প্রজাতির আবির্ভাব ঘটে। এই প্রজাতিটিই প্রথম আফ্রিকা মহাদেশ থেকে ইউরোপ ও এশিয়া মহাদেশে ছড়িয়ে পড়ে। তাদের হাতিয়ার ও সরঞ্জামগুলি উন্নততর ছিল যা দিয়ে তারা শিকার করত, তারা আশ্রয়স্থল বানাতে পারত এবং আগুনের ব্যবহার জানত। এই হোমিনিডগুলি থেকেই ধীরে ধীরে বিবর্তনের মাধ্যমে আধুনিক মানব বা হোমো স্যাপিয়েন্স (“বুদ্ধিমান মানব”) নামক প্রজাতির আবির্ভাব ঘটে। তবে হোমো সেপিয়েন্সের দুইটি উপপ্রজাতি বহুদিন পাশাপাশি বাস করত। একটি ছিল নিয়ানডার্থাল মানব, যারা ইউরোপ, আফ্রিকা ও এশিয়াতে বাস করত। অন্যটি ছিল হোমো সেপিয়েন্স সেপিয়েন্স, তথা বর্তমান মানব প্রজাতি, যাদের আবির্ভাব আজ থেকে প্রায় ৪০ হাজার বছর আগে। নিয়ান্ডার্থাল মানবেরাই প্রথম মৃতদের সমাধি দেওয়া শুরু করে। কিন্তু আজ থেকে ২০ হাজার বছর আগে তারা বিলুপ্ত হয়ে যায় এবং তাদের জায়গার এশিয়া, ইউরোপ ও আফ্রিকাতে কেবল হোমো সেপিয়েন্স সেপিয়েন্স উপপ্রজাতিটি বাস করা শুরু করে। একই সময়ে তারা এশিয়া অতিক্রম করে আমেরিকা মহাদেশে প্রবেশ করে। আধুনিক মানুষদের হাতগুলি পায়ের চেয়ে দীর্ঘ ছিল, তারা দুই পায়ে সোজা হয়ে হাঁটত এবং মুক্ত হাত দিয়ে হাতিয়ার ও অস্ত্রশস্ত্র ব্যবহার করত।
প্রাচীন যুগ
পুরাপ্রস্তর যুগে মানুষেরা পাথরে নির্মিত অস্ত্র, সরঞ্জাম ও উপকরণ ব্যবহার করা শুরু করে। এসময় তারা প্রকৃতিতে পশু শিকার করত এবং খাদ্য সংগ্রহ করত। তারা পাহাড় কেটে গুহাতে বাস করত এবং গুহার দেওয়ালে অনেক সময় তাদের শিকারকাহিনীর চিত্র এঁকে রাখত; অনেক সময় ধর্মীয় কারণেও তারা গুহাচিত্র আঁকত। ধারণা করা হয় এই যুগেই মানব ইতিহাসে বিজ্ঞান, শিল্পকলা ও ধর্মের উৎপত্তি ঘটে।
নব্যপ্রস্তর যুগে খামার পশুপালন ও কৃষিকাজের উদ্ভব ঘটে। এর আগে মানুষ খাবারের জন্য বন্য শস্যদানার ভান্ডারের উপর নির্ভরশীল ছিল। কিন্তু প্রতিকূল শুষ্ক আবহাওয়ার সময় এগুলি খাবারের অযোগ্য হয়ে পড়ত। তাই মানুষেরা শস্যদানাগুলিকে আবার পুনরুজ্জীবনের চেষ্টা চালাতো এবং এভাবে ধীরে ধীরে কৃষিকাজের জন্ম হয়। পশুপালন ও কৃষিকাজের উদ্ভব ছিল মানব ইতিহাসের একটি বৈপ্লবিক ঘটনা। এর ফলে খাদ্য সংগ্রহ ও উৎপাদনের ক্ষেত্রে মানুষের কর্মকাণ্ড ও আচরণে স্থায়ী পরিবর্তন আসে। তবে এই বিপ্লব সহসা একবারের জন্য ঘটেনি। প্রায় কয়েক হাজার বছর ধরে বিভিন্ন মানব বসতিতে বিভিন্ন সময়ে এরকম একাধিক কৃষি বিপ্লব ঘটেছিল।
কৃষিকাজ ও খামারে পশুপালনের মাধ্যমে খাদ্য উৎপাদন ব্যবস্থায় পরিবর্তনের সাথে সাথে সমাজব্যবস্থাতেও পরিবর্তন আসে। কৃষিকাজের কারণে অনেক মানুষ এক জায়গায় বাস করা শুরু করে। খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধি এবং খাদ্য নিরাপত্তা বৃদ্ধির কারণে জনসংখ্যাও বৃদ্ধি পায়। এভাবে ধীরে ধীরে পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানে একাধিক মানবসভ্যতার পত্তন হয়। শ্রমবিভাজন এবং সরকারের আবির্ভাব ছিল এই সভ্যতাগুলির অন্যতম দুই বৈশিষ্ট্য। জেরিকো ও চাতাল হুইউক এরকম দুইটি সভ্যতার উদাহরণ। অনেকে ধারণা করেন কৃষিভিত্তিক সভ্যতার মাধ্যমে মানবসমাজে পুরুষতান্ত্রিকতার জন্ম হয়। এর আগে পুরাপ্রস্তর যুগে পুরুষেরা শিকার করত এবং নারীরা খাদ্য সংগ্রহ করত, ফলে তাদের মধ্যে পরিষ্কার শ্রমবিভাজন ছিল এবং কেউই কারও চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিল না। কিন্তু কৃষিভিত্তিক সমাজে পুরুষেরাই কৃষিকাজ করত এবং নারীদেরকে গৃহস্থালি কাজে সীমিত করে রাখা হয়; ফলে সমাজে নারীর মর্যাদার অবনতি ঘটে।
নব্য প্রস্তরযুগের শেষ পর্বে এসে ধাতু বিশেষ করে তামা এবং লোহার সরঞ্জাম তৈরি করা শুরু হয়। কিন্তু এগুলি পাথরের তুলনায় নরম ও বেশি ভঙ্গুর ছিল তখনও প্রস্তরনির্মিত সরঞ্জামের কদর কমে যায়নি।
মধ্যযুগ বা ধ্রুপদী-উত্তর যুগ
বাইজেন্টীয় সাম্রাজ্য
প্রায় ৫০০ বছর ধরে রোমান সাম্রাজ্য ইউরোপ এবং উত্তর আফ্রিকার এক বিশাল এলাকা জুড়ে এক অনন্য জীবনধারার প্রবর্তন করেছিল। কিন্তু ৪৭৬ খ্রিষ্টাব্দে সাম্রাজ্যটির পশ্চিম অর্ধাংশে ধ্স নামে। হানাদার জার্মান গোত্রগুলি সাম্রাজ্যের এই অংশে ছড়িয়ে পড়ে ও দখল করতে শুরু করে। কিন্তু পূর্ব অর্ধাংশে রোমান শাসন সুস্থসবলভাবে অব্যাহত থাকে। এই পূর্বাঞ্চলীয় রোমান সাম্রাজ্যটির আরেক নাম ছিল বাইজেন্টীয় সাম্রাজ্য।
বাইজেন্টিয়াম ছিল গ্রিকদের প্রতিষ্ঠিত একটি প্রাচীন বন্দর শহর। এটিই বর্তমানে তুরস্কের ইস্তাম্বুল শহর হিসেবে পরিচিত। বাইজেন্টিয়াম ছিল বাইজেন্টীয় বা পূর্ব রোমান সাম্রাজ্যের কেন্দ্রবিন্দু। এই সাম্রাজ্যের প্রথম সম্রাটের নাম ছিল মহান কোনস্তানতিন। তিনিই রোমের প্রথম খ্রিস্টধর্মাবলম্বী সম্রাট ছিলেন। তিনি ৩৩০ সালে রোমান সাম্রাজ্যের রাজধানী রোম থেকে সরিয়ে বাইজেন্টিয়ামে নিয়ে আসেন। তার নামে বাইজেন্টিয়ামের নাম বদলে কোনস্তানতিনোপল রাখা হয়। এটি বাইজেন্টীয় সম্রাটদের রাজধানী এবং পূর্বী খ্রিস্টান গির্জার কেন্দ্রে পরিণত হয়। বাইজেন্টীয় সাম্রাজ্যে গ্রিক ও রোমান শিল্পকলা ও শিক্ষাপদ্ধতিকে সংরক্ষণ করে রাখা হয়। বাইজেন্টীয় গির্জাগুলিতে (যেমন মাত্র ৬ বছরে নির্মিত ও ৫৩৭ খ্রিষ্টাব্দে চালু হওয়া হাগিয়া সোফিয়া গির্জাটি) বহু শত রঙিন কাচ বা পাথরের টুকরো দিয়ে নির্মিত সূক্ষ্ম ফ্রেস্কো ও মোজাইক জাতীয় চিত্রকর্ম দেখতে পাওয়া যায়। ৪০৮ খ্রিষ্টাব্দে সম্রাট থেওডসিয়ুস কোনস্তানতিনোপলকে রক্ষার জন্য একটি মহাপ্রাচীন নির্মাণ শুরু করেন। ৪৭৬ খ্রিষ্টাব্দে রোমকেন্দ্রিক পশ্চিমা রোমান সাম্রাজ্যের পতন ঘটে। ৫০১ খ্রিষ্টাব্দে বাইজেন্টীয়দের সাথে পারস্যের ধারাবাহিকভাবে অনেকগুলি যুদ্ধের সূচনা ঘটে। ৫২৭ খ্রিষ্টাব্দে সম্রাট ১ম জুস্তিনিয়ান ক্ষমতায় আরোহণ করেন। তিনি ৫৬৫ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত ক্ষমতায় ছিলেন। জুস্তিনিয়ান ও তার সমরনেতা বেলিসারিয়ুসের অধীনে বাইজেন্টীয় সাম্রাজ্য সমৃদ্ধির শিখরে পৌঁছে। এসময় ইতালি, গ্রিস, তুরস্ক এবং স্পেন, উত্তর আফ্রিকা ও মিশরের অংশবিশেষ এই সাম্রাজ্যের অধীনে ছিল। জুস্তিনিয়ানকে তার ক্ষমতাশালী রাণী থেওদোরা শাসনকর্মে সহায়তা করেন। জুস্তিনিয়ান একটি আইন-সঙ্কলন প্রণয়ন করেন, যার উপর ভিত্তি করে পরবর্তীতে বহু ইউরোপীয় দেশের আইনব্যবস্থা সৃষ্টি করা হয়।
কোনস্তানতিনোপল একটি ব্যস্ত বন্দর ছিল। এখানে সুদূর স্পেন, চীন ও রাশিয়া থেকে বণিকেরা এসে মিলিত হত। ৫৬৫ খ্রিষ্টাব্দে জুস্তিনিয়ানের মৃত্যু ঘটলে বেশ কিছু যুদ্ধে অংশগ্রহণের পরে সাম্রাজ্যটি দুর্বল হয়ে পড়ে। ৬৭৮ খ্রিষ্টাব্দে আরবরা কোনস্তানতিনোপল শহরকে অবরোধ করে কিন্তু শেষে পরাজিত হয়। ১০ম শতকে এসে বাইজেন্টীয় সাম্রাজ্যের দ্বিতীয় স্বর্ণযুগ আরম্ভ হয়। বলকান উপদ্বীপ এবং রাশিয়া বাইজেন্টীয় প্রভাব বলয়ের অধীনে আসে। ১০৫৪ সালে কোনস্তানতিনোপলের গির্জা রোমের ক্যাথলিক গির্জা থেকে বিভক্ত হয়ে যায়। ১০৮১ সালে ১ম আলেক্সিয়ুস ক্ষমতায় আসেন এবং সরকারের সংস্কারসাধন করেন। কিন্তু পূর্বদিক থেকে আগত হানাদার গোত্ররা, বিশেষ করে আভার, স্লাভ ও বুলগার জাতির লোকেরা সাম্রাজ্যটির জন্য হুমকির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। ১২০০ খ্রিষ্টাব্দের দিকে তুর্কি ও বুলগারদের আক্রমণে সাম্রাজ্যটিতে ভাঙন ধরা শুরু করে। ১২০৪ সালে ক্রুসেড বা খ্রিস্টীয় ধর্মযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী যোদ্ধারা এসে কোনস্তানতিনোপল শহরটিতে লুটতরাজ করে। ১৩৪১ সালে সাম্রাজ্যের অভ্যন্তরে গৃহযুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ে এবং ১৩৫৪ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত এই যুদ্ধ চলে। শেষ পর্যন্ত ১৪৫৩ সালে তুর্কিরা কোনস্তানতিনোপল পুরোপুরি দখল করলে অবশেষে হাজার বছরেরও বেশিদিন ধরে টিকে থাকা বাইজেন্টীয় সাম্রাজ্যটির পতন ঘটে।
জাহাজ নির্মাণ ও শিল্পকারখানার সাথে জড়িত লোকজনের সাথে সাক্ষাৎ করেন। এমনকি নেদারল্যান্ডসের একটি জাহাজনির্মাণস্থলে তিনি কিছু সময়ের জন্য কর্মী ছিলেন। শেষ পর্যন্ত পিওতর যখন রাশিয়াতে ফেরত আসেন, তিনি তখন তার নবলব্ধ জ্ঞান কাজে লাগাতে নেমে পড়েন। তিনি রাশিয়ার নৌবাহিনী গড়ে তোলেন এবং কৃষিখামার ও শিল্পকারখানা গড়তে উৎসাহ প্রদান করেন। তিনি রাশিয়ার সেনাবাহিনীর উন্নয়ন ও সম্প্রসারণ সাধন করেন। বাণিজ্যের সুবিধার জন্য রাস্তা নির্মাণ ও খাল খনন করেন। ১৭০০ থেকে ১৭২১ সাল পর্যন্ত সুইডেনের সাথে মহান উত্তরীয় যুদ্ধ সম্পাদন করে পিওতর রাশিয়ার জন্য বাল্টিক সাগরে উপকূল জয় করেন। ফলে রাশিয়া এমন একটি সমুন্দ্রবন্দর লাভ করে যা শীতকালে বরফে জমে বন্ধ হয়ে যায় না। ১৭০৩ সালে বাল্টিক সাগরের উপকূলে তিনি সাংত পিতেরবুর্গ শহর প্রতিষ্ঠা করেন, যার ডাকনাম দেওয়া হল “ইউরোপমুখী জানালা”। তিনি ১৭১২ সালে রাশিয়ার রাজধানী মস্কো থেকে সরিয়ে সাংত পিতেরবুর্গ শহরে নিয়ে আসেন। সাংত পিতেরবুর্গ ছিল একাধারে রাশিয়ার রাজধানী ও প্রধান বন্দর। ইউরোপের বিখ্যাত স্থপতিরা এখানে সম্রাট পিওতরের গ্রীষ্মকালীন প্রাসাদ ও অন্যান্য প্রাসাদোপম বাসভবনগুলি নকশা করেন। শহরটি অনেকগুলি দ্বীপের উপরে দাঁড়িয়ে আছে, যেগুলি একে অপরের সাথে সেতুর মাধ্যমে সংযুক্ত। পিওতরের অধীনে চাষীদের বেশি আয়কর দিতে হত, ফলে তাদের অর্থনৈতিক অবস্থার অবনতি ঘটে। ফসল ভাল না উঠলে তাদের অনেক সময় না খেয়েও দিনযাপন করতে হত। পিওতর ছিলেন বেশ নিষ্ঠুর প্রকৃতির। এক পর্যায়ে তিনি তার নিজের পুত্রসন্তানকেও কারাবন্দী করে নির্যাতন করেন। এসব সত্ত্বেও ১৭২৫ সালে যখন পিওতরের মৃত্যু হয়, সামগ্রিকভাবে রাশিয়া অনেক বেশি নিরাপদ ও উন্নত একটি রাষ্ট্র হিসেবে পরিচিতি পায়। তার আগে ১৭২২-১৭২৩ সালে পারস্যের সাথে যুদ্ধ করে কাস্পিয়ান সাগরে রাশিয়ার প্রবেশগম্যতা প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৭৬২ সালে আরেকজন ক্ষমতাধর শাসক রাশিয়ায় আবির্ভূত হন: ২য় একাতেরিনা বা ক্যাথেরিন। তিনি ছিলেন প্রুশীয় (জার্মান) বংশোদ্ভূত, ১৭২৯ সালে তার জন্ম হয়। কিন্তু ১৭৪৫ সালে রাশিয়ার শাসনক্ষমতার উত্তরাধিকারী ও পারিবারিক ভাই ৩য় পিওতরের সাথে তার বিয়ে হয়। জার হিসেবে ক্ষমতালাভের ৬ মাস পরেই তার স্বামীকে হত্যা করা হয় এবং ১৭৬২ সালে একাতেরিনা নিজেকে রাশিয়ার সম্রাজ্ঞী হিসেবে ঘোষণা দেন। মহান একাতেরিনা ছিলেন নির্দয় ও উচ্চাভিলাষী। পিওতরের মতো তিনিও পশ্চিমা ঘরানার ধ্যানধারণাকে উৎসাহ প্রদান করেন। তিনি রাশিয়ার শিক্ষা ব্যবস্থা ও আইনের সংস্কার সাধনের জন্য পরিকল্পনা করেন, তবে এগুলি কোনটিই বাস্তবায়িত হয়নি। উসমানীয় সাম্রাজ্যের সাথে ১৭৭৪ ও ১৭৯২ সালে এবং সুইডেনের সাথে ১৭৯০ সালে যুদ্ধ করে তিনি রাশিয়ার জন্য নতুন নতুন অঞ্চল দখল করেন। এছাড়া তিনি পোল্যান্ডের বিশাল অঞ্চল করায়ত্ত করেন। তবে কৃষকদের জীবনযাত্রার কোনও মানোন্নয়ন হয়নি, ফলে ১৭৭৩ সালে তার বিরুদ্ধে একটি বিদ্রোহ জেগে ওঠে, যা তিনি শক্ত হাতে দমন করেন। ১৭৮৭ সালে একাতেরিনা রাশিয়া সফরে বের হন কিন্তু অভুক্ত কৃষকদের বদলে তাকে সুস্থ, সুন্দর পোশাক পরিহিত কৃষক ভূমিকায় অভিনেতাদের সাথে পরিচয় করানো হয়। ১৭৯৬ সালে একাতেরিনার মৃত্যু ঘটে এবং তার পুত্র সিংহাসনে আরোহণ করেন।
স্যামুয়েল জনসন প্রকাশ করে কমপ্লিট ডিকশনারি অফ দ্য ইংলিশ ল্যাংগুয়েজ বা ইংরেজি ভাষার পূর্ণাঙ্গ অভিধান। এতে ৪৪ হাজার শব্দ ছিল। ১৭৬৮ সালে প্রথম এনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকা প্রকাশিত হয়। ১৭৮৮ সালে লন্ডনে প্রথমবারের মত দ্য টাইমস দৈনিক পত্রিকাটি প্রকাশিত হয়।
আরেকজন ফরাসি দার্শনিক ভোলত্যার (১৬৯৪-১৭৭৮) তাঁর সমসাময়িক গির্জা ও সরকার উভয়েরই তীব্র সমালোচনা করতেন। ভলত্যারের আসল নাম ছিল ফ্রঁসোয়া মারি আরুয়ে। তিনি ছিলেন একাধারে বিজ্ঞানী, চিন্তাবিদ ও ক্ষুরধার বুদ্ধিসম্পন্ন লেখক। তিনি একবার বলেছিলেন “আমি তোমার সাথে একমত না হতে পারি, কিন্তু আমি প্রাণ দিয়ে হলেও তোমার মত প্রকাশের অধিকার রক্ষা করব।” জঁ-জাক রুসো (১৭১২-১৭৭৮) একই কাজ করেন, এবং তার ধারণাগুলির উপর ভিত্তি করে পরবর্তীতে মার্কিন ও ফরাসি বিপ্লব সংঘটিত হয়। ১৭৯১ সালে টমাস পেইনের দ্য রাইটস অফ ম্যান ব্রিটিশ শাসন থেকে স্বাধীনতা অর্জনের সময় মার্কিনীদেরকে প্রভাবিত করে। ম্যারি ওলস্টোনক্রাফট তার আ ভিন্ডিকেশন অফ দ্য রাইটস অফ উইমেন গ্রন্থে শিক্ষাক্ষেত্রে নারীদের সম-অধিকারের ব্যাপারে যুক্তি দেন। সেসময় ধর্নাঢ্য মহিলাদের বাসভবনগুলিতে শিল্প ও শিক্ষাজগতের মানুষেরা নিয়মিত আসর করতেন এবং সেখানে তারা সাম্প্রতিক বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার, নাটক, গ্রন্থ ও আলোচ্য বিষয়গুলি নিয়ে ভাবের আদানপ্রদান করতেন।
আলোকময় যুগের অন্যান্য উজ্জ্বল জ্যোতিষ্কতুল্য ব্যক্তিত্ত্বের মধ্যে আছেন অ্যাডাম স্মিথ (অর্থনীতিবিদ), ডেভিড হিউম (ইতিহাসবিদ) এবং এমানুয়েল কান্ট (দার্শনিক) । প্রতিটি মানুষের অধিকার আছে জ্ঞান, স্বাধীনতা ও সুখের অধিকারী হওয়ার –- আলোকময় যুগের এই বিশ্বাস এক নতুন বৈপ্লবিক ও গণতান্ত্রিক উৎসাহ-উদ্দীপনায় মানুষকে অনুপ্রাণিত করে তোলে, যা ১৯শ শতকে গিয়ে বিশ্বকে নতুন করে বদলে দেয়।
সেগুলির মালিকদেরকে বেড়া তুলে দেওয়ার অধিকার দেওয়া হয়। জমির আয়তন বাড়ানোর জন্য অনেক সময় সমগ্র গ্রাম ধ্বংস করে ফেলা হয়। শিল্পশহরগুলিতে যত বেশি বেশি লোকজন অভিবাসী হতে থাকে, খাদ্য যোগানদার কৃষকের সংখ্যা ততই কমতে থাকে। ১৭৯৬ সালে হাঙ্গেরিতে কৃষকদের জন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করা হয়। ১৮০০ সালের মধ্যে ব্রিটেনে মনোযোগ দিয়ে সংকর প্রজননের সুবাদে গড়ে একটি গাভীর ওজন ১৭০০ সালের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ হয়ে যায়। ১৭০০ থেকে ১৮৫০ সালের মধ্যে কৃষিক্ষেত্রের পরিবর্তনগুলি কৃষকদেরকে ক্রমবর্ধনশীল জনসংখ্যার ক্ষুধা মেটাতে সাহায্য করে। ১৮৪০ সালে কৃষিকাজে রাসায়নিক দ্রব্য ব্যবহারের উপর প্রথম গ্রন্থ প্রকাশিত হয়।
১৩টি উপনিবেশ ছিল। এছাড়া সাত বছরের যুদ্ধে (১৭৫৬-১৭৬৩) যুক্তরাজ্য ফ্রান্সকে হারিয়ে কানাডার নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে নিয়ে আসে। মার্কিন উপনিবেশগুলি কীভাবে শাসিত হবে, সে ব্যাপারে যুক্তরাজ্যের কোন মত পরিবর্তন না হলেও ঔপনিবেশিক জনগণ, যাদের নিজের শাসনব্যবস্থার উপর কোনও নিয়ন্ত্রণ ছিল না, তারা এ ব্যাপারে বিদ্রোহী হয়ে ওঠে। মার্কিন বিপ্লবের ফলে উপনিবেশগুলি স্বাধীন হয় এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।
যুক্তরাজ্য তার মার্কিন নাগরিকদের থেকে কর আদায় করত এবং করের টাকা দিয়ে উত্তর আমেরিকার প্রতিরক্ষা ব্যয় মেটাত। সেসময় প্রায় ২০ লক্ষ ব্রিটিশ বংশোদ্ভূত মার্কিনী ছিল। তারা নিজেদের প্রায় সমস্ত খাদ্য ও অন্যান্য দ্রব্য উৎপাদন করত। তারা আমদানিকৃত চা এবং আইনি দলিলাদির উপর কর প্রদানের ব্যাপারে অত্যন্ত নাখোশ ছিল। ব্রিটিশ আইন প্রণয়নকারী সংসদে তাদের কোনও প্রতিনিধি ছিল না। ১৭৬৫ সালে তারা এই অন্যায্য ব্রিটিশ করের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করা শুরু করে। তাদের শ্লোগান ছিল “প্রতিনিধিত্ব ছাড়া কর প্রদান হল স্বৈরাচার”। যুক্তরাজ্যে এই বিদ্রোহ দমনের জন্য মার্কিন উপনিবেশগুলিতে সেনা মোতায়েন করে। ১৭৭০ সালে বস্টন গণহত্যা নামক ঘটনায় ব্রিটিশ সেনারা ঔপনিবেশিক জনতার ভিড়ে গুলি চালায় এবং এতে ৫ জনের মৃত্যু হয়। ১৭৭৩ সালে বস্টন পোতাশ্রয়ে ঔপনিবেশিকেরা চায়ের উপর বসানো করের প্রতিবাদে অনেক জাহাজের মালামাল সমুদ্রের পানিতে ফেলে দেয়, যে ঘটনার নাম দেওয়া হয় “বস্টন টি পার্টি”।
১৭৭৫ সালের এপ্রিল মাসে ম্যসাচুসেট্সের লেক্সিংটন শহরে ঔপনিবেশিক ও ব্রিটিশ সেনাদের মধ্যে সশস্ত্র সংঘর্ষ সংঘটিত হয়। ঔপনিবেশিকেরা জর্জ ওয়াশিংটনের নেতৃত্বে একটি সেনাবাহিনী গঠন করে এবং ১৭ই জুন বস্টনের কাছে বাংকার হিল নামক এলাকায় দুই সেনাবাহিনী ছোট আকারের এক যুদ্ধে লিপ্ত হয়। সেই যুদ্ধে ব্রিটিশরা জয়ী হলেও মার্কিন বিপ্লব তথা মার্কিনীদের স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরু হয়ে যায়। পল রিভিয়ার এই যুদ্ধের অন্যতম বীর ছিলেন। তিনি বস্টন থেকে লেক্সিংটন পর্যন্ত ঘোড়ায় চড়ে গিয়ে ব্রিটিশ সেনাদের আগমনের আগাম খবর দেন। যদিও তিনি ব্রিটিশদের হাতে ধরা পড়েন, তাকে মার্কিন ইতিহাসে শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করা হয়।
ব্রিটিশ সেনারা ইউরোপীয় বিভিন্ন যুদ্ধে অংশগ্রহণ করতে অভ্যস্ত ছিল। তারা আমেরিকাতে যুদ্ধ করতে এসে সমস্যার সম্মুখীন হয়। তারা কাঁধে কাঁধ লাগিয়ে সারিবদ্ধভাবে অগ্রসর হত এবং একসাথে গুলি ছুঁড়ত। কিন্তু মার্কিন দক্ষ গুলিচালক বা শার্পশুটারদের জন্য তারা সহজ লক্ষ্যে পরিণত হয়। ব্রিটিশ সৈনিকেরা লাল রঙের ও লম্বা পশ্চাদলেজবিশিষ্ট কোট পড়ত, এ জন্য তাদেরকে “লাল কোটের দল” বা “রেডকোট্স” বলা হত।
১৭৭৬ সালের ৪ঠা জুলাই যুদ্ধ চলাকালে ঔপনিবেশিক নেতারা মহাদেশীয় কংগ্রেস বা সম্মেলনে স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র স্বাক্ষর করেন। ব্রিটিশ সরকার এটিকে গ্রহণ করতে অস্বীকার করে। ওয়াশিংটনের নেতৃত্বে ঔপনিবেশিকদের সেনাবাহিনী ব্রিটিশ সেনাদের পরাজিত করতে শুরু করে। ১৭৭৭ সালে নিউ ইয়র্কের সারাটোগা শহরটি ব্রিটিশদের হাতছাড়া হয়। কিন্তু ব্রিটিশরা পেনসিলভেনিয়ার ফিলাডেলফিয়া শহরটি আয়ত্তে নিয়ে আসে। ফ্রান্স (১৭৭৭), স্পেন (১৭৭৯), নেদারল্যান্ডস (১৭৮০) – সবাই ঔপনিবেশিকদের পক্ষ নেয়। ছয় বছর ধরে যুদ্ধ চলে ১৭৮১ সালে এর সমাপ্তি হয়। ঐ বছর এক অবরোধের পর ভার্জিনিয়ার ইয়র্কটাউন শহরে ব্রিটিশ সেনারা আত্মসমর্পণ করে। এর দুই বছর পরে ১৭৮৩ সালে যুক্তরাজ্য স্বাধীন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে স্বীকৃতি প্রদান করে।
নেপোলিয়নের যুদ্ধসমূহ
নাপোলেওঁ বোনাপার্ত (১৭৬৯-১৮২১) গোলন্দাজ বাহিনীর পদস্থ কর্মকর্তা থেকে ফ্রান্সের সম্রাটের মর্যাদায় আসীন হন।
কানাডা
১৭৫৯ সালে জেনারেল জেমস উলফের নেতৃত্বে ব্রিটিশেরা ফরাসিদের কাছ থেকে কেবেক অঞ্চলটি দখল করে নেয়। ফলে নতুন ফ্রান্স বা ফরাসি কানাডা ১৭৬৩ সাল নাগাদ ব্রিটিশ কানাডার অংশে পরিণত হয়। কানাডীয় জনগণ ফরাসি, ব্রিটিশ ও আদিবাসী আমেরিকান ঐতিহ্যের সংমিশ্রণে একটি নতুন, অনন্য সংস্কৃতি গঠন করে। ১৭৭৪ সালে কেবেক অধ্যাদেশের মাধ্যমে ব্রিটিশ-শাসিত কানাডাতে ফরাসি-বংশোদ্ভূত কানাডীয়দের অধিকারকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। কানাডা ছিল সুবিশাল এক ভূমি যেখানে খুবই স্বল্প সংখ্যক লোক বাস করত। মার্কিন বিপ্লবের সময় (১৭৭৫-১৭৮৩) হাজার হাজার সংযুক্ত সাম্রাজ্য অনুসারীরা (United Empire Loyalists) মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে কানাডায় অভিবাসন করে। ১৭৭৫ সালেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কানাডা দখল করার চেষ্টা করে। ব্রিটেন ১৭৯১ সালে কানাডাকে দুই ভাগে বিভক্ত করে দেয়: নিম্ন কানাডা (মূলত ফরাসিভাষী) এবং ঊর্ধ্ব কানাডা। পরবর্তীতে ১৮১২ সালের যুদ্ধে কানাডীয়রা মার্কিনীদের আগ্রাসন প্রতিরোধ করে। শুরুর দিকে শুধুমাত্র কানাডার পূর্ব অংশেই ইউরোপীয়রা বসতি স্থাপন করেছিল। দেশের পশ্চিম ও উত্তর মেরু-অঞ্চলীয় অংশগুলি আদিবাসী আমেরিকান ও ইনুইট জাতির লোকদের কাছে ছেড়ে দেওয়া হয়। কিন্তু শীঘ্রই অভিযাত্রী ও পশুলোমের ব্যবসায়ীরা পশ্চিমদিকে অগ্রসর হতে থাকে এবং কৃষক ও রেলপথ নির্মাতারা তাদের অনুসরণ করে। ১৮২১ সালে হাডসনস্ বে কোম্পানিকে বৃহৎ হ্রদগুলির (Great Lakes) পশ্চিমের অঞ্চলগুলির নিয়ন্ত্রণ দেওয়া হয়। ১৮৪১ সালে যুক্তরাজ্য ঊর্ধ্ব ও নিম্ন কানাডাকে একত্রিত করে এবং ১৮৬৭ সালে কানাডা ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের একটি স্বশাসিত রাজ্যে পরিণত হয়। ১৮৬৯ সালে লোহিত নদী বিদ্রোহ (Red river rebellion) ঘটে কিন্তু তা কানাডাকে বিভক্ত করতে পারেনি। ১৮৭৫ সালে রাজকীয় কানাডীয় অশ্বারোহী পুলিশ (Royal Canadian Mounted Police) বা সংক্ষেপে “মাউন্টিজ” প্রতিষ্ঠা করা হয়। শুরুতে বাহিনীটিতে প্রায় ৩০০ জন অশ্বারোহী ছিল, যাদের কাজ ছিল দুর্গম জনহীন এলাকাগুলি টহল দেওয়া। ১৮৮০-র দশকে কানাডীয় প্রশান্ত মহাসাগরীয় রেলপথ নির্মাণের কাজ ১৮৮৬ সালে সমাপ্ত হলে বিশাল এই দেশটির পূর্ব ও পশ্চিম অর্ধাংশদ্বয় একত্রিত হয়। ১৮৯০ সালের মধ্যে দেশটি পূর্বে আটলান্টিক মহাসাগর থেকে পশ্চিমে প্রশান্ত মহাসাগর পর্যন্ত বিস্তৃতি লাভ করে এবং এর মধ্যে ইউকন অঞ্চলটিও অন্তর্ভুক্ত ছিল।
দক্ষিণ আমেরিকার স্বাধীনতা
এবং বায়ু চলাচলের জন্য দরজা খুলে দিত ও বন্ধ করে দিত। ১৮১১ সালে নতুন যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে শিল্পকারখানা চালানোর বিরুদ্ধে “লাডাইট” বিদ্রোহ শুরু হয়। ১৮১৫ সালে হামফ্রি ডেভি একটি সতর্কতামূলক বাতি উদ্ভাবন করেন, যা খনিশ্রমিকদের বিস্ফোরক গ্যাস সম্পর্কে আগেই সাবধান করে দিত।
১৮২৫ সালে ইংল্যান্ডের স্টকটন থেকে ডার্লিংটন পর্যন্ত সর্বপ্রথম জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত রেলপথ চালু করা হয়। ১৮৩০ সালে সর্বপ্রথম আন্তঃশহর বাষ্পীয় ইঞ্জিনচালিত রেলগাড়ি ইংল্যান্ডে নকশা ও নির্মাণ করা হয়, যার নাম ছিল “দ্য রকেট”। এরপর থেকে বাষ্পচালিত ইঞ্জিন দ্বারা যাত্রীবাহী আচ্ছাদিত রেলগাড়ি টানা হত। ১৮৪২ সালে ব্রিটিশ সংসদ সমস্ত নারী ও ১০ বছরের নিচের শিশুদের মাটির নিচের কয়লা খনিতে কাজ করা নিষিদ্ধ ঘোষণা করে।
সেগুলি ফুরিয়ে যায়নি। অনেক সরকার বুঝতে পারল যে তাদেরকে কিছু কিছু সংস্কার করতে হবে। সংস্কারকরা প্রশাসন চালানো এবং সম্পদ আরও ন্যায্য বণ্টনের জন্য উপায় খুঁজে বের করলেন। ১৮৪৪ সালে ফ্রিডরিশ এঙেলস ইংল্যান্ডের ম্যানচেস্টার শহরে শ্রমিকদের জীবন নিয়ে গবেষণা করেন। ১৮৪৮ সালে জার্মান সমাজতন্ত্রবাদী কার্ল মার্ক্স এবং ফ্রিডরিশ এঙেলস তাদের ধারণাগুলি সাম্যবাদী ইশতেহার নামক গ্রন্থে প্রকাশ করেন। এটি ভবিষ্যতের ঘটনাবলির উপরে বিশাল প্রভাব ফেলে।
করেছিলেন।
১৯১৪ সালে আফ্রিকা দখলের প্রতিযোগিতাশেষে সাতটি ইউরোপীয় জাতি লাইবেরিয়া ও ইথিওপিয়া বাদে সমগ্র আফ্রিকা মহাদেশকে তাদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসে। ১৮৮৪ সালের মধ্যেই বেলজিয়াম, ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য, পর্তুগাল ও স্পেন হয় আফ্রিকাতে নতুন নতুন উপনিবেশ দাবী করেছিল কিংবা পুরনো উপনিবেশগুলিকে সম্প্রসারিত করেছিল। ১৮৮০ সালে বেলজিয়ামের রাজা ২য় লেওপোল্দ গোটা কঙ্গো অঞ্চলটিকে তার নিজস্ব ব্যক্তিগত সম্পত্তি হিসেবে দাবী করেন। ১৮৮২ সালে যুক্তরাজ্য সুয়েজ খালে তার প্রবেশাধিকার সুরক্ষিত করতে মিশরের নিয়ন্ত্রণ হাতে নেয়। সদ্য-একীভূতকরণের ফলে প্রতিষ্ঠিত জার্মানি ও ইতালি রাষ্ট্রদ্বয়ও আফ্রিকাতে তাদের ভাগ বসায়। বিরাট কোন সংঘাত যাতে না হয়, সেজন্য ইউরোপীয় শক্তিগুলি ১৮৮৪ সালে বার্লিনে আফ্রিকা বিষয়ক একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলনে অংশ নেয়। এই সম্মেলনে আফ্রিকান জাতিগুলির ইচ্ছা, সংস্কৃতি বা প্রাকৃতিক সীমানার ব্যাপারে কোনই ভ্রূক্ষেপ না করে ইউরোপীয়রা নিজেদের মধ্যে আফ্রিকাকে ভাগ-বাটোয়ারা করে নেয়। কৃষ্ণাঙ্গ আফ্রিকান, এমনকি শ্বেতাঙ্গ বুর আফ্রিকানদের সমস্ত প্রতিরোধ ইউরোপের অস্ত্রশস্ত্রে সুসজ্জিত সেনাবাহিনীগুলি কঠোরভাবে দমন করে। ১৮৮৯ সালে ব্রিটিশরা মাতাবেলে জাতির বিরুদ্ধে যুদ্ধে জয়ী হয় এবং তাদের ভূমি দখল করে তার নাম দেয় রোডেশিয়া। ১৮৯০ সালে ইতালীয়রা ইরিত্রিয়া নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেয়। তারা আবিসিনিয়াও (বর্তমান ইথিওপিয়া) দখলে নিতে চেয়েছিল, কিন্তু ব্যর্থ হয়। ১৮৯১ সালে জার্মানি তাংগানিকা (বর্তমান তানজানিয়া) দখলে নেয়। ফরাসিরা আলজেরিয়ার উত্তরাংশকে ফ্রান্সের উপনিবেশে পরিণত করে। ১৮৯৩ সালে ফরাসিরা মালি দখল করে। ১৮৯৪ সালে উগান্ডা ব্রিটিশ শাসনাধীন অঞ্চলে পরিণত হয়। ১৮৯৫ সালে কেনিয়ারও একই পরিণতি ঘটে এবং এটি পূর্ব আফ্রিকান রক্ষিত অঞ্চল হিসেবে পরিচিতি পায়। ১৮৯৯ সালে দক্ষিণ আফ্রিকাতে ব্রিটিশ এবং স্থানীয় শ্বেতাঙ্গ বুরদের মধ্যে যুদ্ধ শুরু হয়। ১৯১০ সালে দক্ষিণ আফ্রিকা সংযুক্তরাষ্ট্রটি প্রতিষ্ঠা করা হয়। ১৯১১ সালে ব্রিটিশদের অধীন রোডেশিয়াকে ভেঙে উত্তর রোডেশিয়া (বর্তমান জাম্বিয়া) ও দক্ষিণ রোডেশিয়া (বর্তমান জিম্বাবুয়ে) গঠন করা হয়। ১৯১২ সালে মরক্কোকে ভেঙে এক অংশ ফ্রান্স ও অপরংশ স্পেনের অধীনে নিয়ে আসা হয়।
এই যুদ্ধগুলিতে হাজার হাজার আফ্রিকান মারা যায়। যারা বেঁচে ছিল, তাদের ঐতিহ্যবাহী জীবনধারণ পদ্ধতি ধ্বংস হয়ে যায়, ফলে তাদের অনেক ক্ষুধা ও কষ্টের মধ্যে পড়তে হয়। কিছু আফ্রিকানকে খনিতে সস্তা শ্রমিক হিসেবে বা কৃষি খামারের কর্মী হিসেবে জোর করে কাজ করানো হয়। তারা ইউরোপে রপ্তানির জন্য তুলা, চা, কফি ও কোকো উৎপাদন করত। ইউরোপীয়রা তাদের উপনিবেশগুলির সুবিধাজনক স্থানে খামার শুরু করে এবং সড়ক ও রেলপথ নির্মাণ করে। যেসমস্ত ইউরোপীয় উপনিবেশগুলির পরিচালনার মান উন্নত ছিল, সেখানে স্থানীয় জনগণের জন্য বিদ্যালয় ও চিকিৎসাকেন্দ্র স্থাপন করা হয়। কিন্তু যেসমস্ত ইউরোপীয় উপনিবেশের পরিচালনার মান খুবই নিম্ন ছিল, সেখানে আফ্রিকানদেরকে ক্রীতদাসের চেয়ে খুব বেশি মর্যাদা দেওয়া হত না। ইউরোপীয় শাসনের অধীনে আফ্রিকানরা নতুন নতুন ধ্যানধারণার সাথে পরিচিত হলেও তাদের জীবনধারা কীভাবে পরিচালিত হবে, সে ব্যাপারে তাদের কোন বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ ছিল না।
অস্ট্রিয়া সীমান্ত, আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্যেও যুদ্ধ সংঘটিত হয়।
ঘোড়া ও খচ্চর ব্যবহার করে সৈনিকদের জন্য খাদ্য ও অস্ত্রশস্ত্র সরবরাহ করা হত। উভয় পক্ষই পরিখা খনন করে যুদ্ধে রত হয়। পরিখাগুলি ছিল ঠান্ডা, কর্দমাক্ত, ভেজা ও অস্বাস্থ্যকর। এগুলিতেই সেনারা খেত ও ঘুমাত এবং উপর থেকে নির্দেশ আসলে যুদ্ধে বের হত। অনেকসময় তারা শত্রুদের ছোঁড়া গোলার আক্রমণ থেকে রক্ষা পাবার জন্য ভূগর্ভে গর্ত বা বাংকার বানিয়ে সেখানে আশ্রয় নিত। কোন সেনাবাহিনীর পক্ষেই বিশাল ক্ষয়ক্ষতির সম্মুখীন হওয়া ছাড়া সম্মুখে অগ্রসর হওয়া সম্ভব ছিল না। সেনাদেরকে পরিখা থেকে বেরিয়ে এসে উপরে উঠে নিজেদের বসানো তারকাঁটার বেড়া অতিক্রম করে খোলা মাঠ (জনহীন ভূমি) পার হয়ে শত্রুপক্ষের শিবিরে পৌঁছাতে হত। মেশিনগান এবং ভারী আর্টিলারি কামানগুলি এত দ্রুত ও শক্তিশালী ছিল যে একেকবারে হাজার হাজার সেনা মৃত্যুবরণ করত। ১৯১৬ সালে কেবল সমের যুদ্ধেই ১০ লক্ষ সৈনিক মারা যায়।
১৯১৭ সালে রাশিয়া এত দুর্বল হয়ে পড়ে যে তারা জার্মানির সাথে শান্তিচুক্তির ব্যাপারে আলোচনা শুরু করে। এসময় কিছু সময়ের জন্য জার্মানি সুবিধাজনক অবস্থানে ছিল। একই বছরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র মিত্রশক্তির পক্ষ নিয়ে যুদ্ধে যোগদান করে। ১৯১৭ সালের জুলাই মাসে ইপ্রের তৃতীয় যুদ্ধটি সংঘটিত হয়। ১৯১৮ সালে প্রায় ১০ লক্ষ মার্কিন সেনা মিত্রশক্তির শিবিরে যোগদান করলে মিত্রশক্তিরা সামনের দিকে এগোতে থাকে। অন্যদিকে জার্মানিতে খাদ্যাভাব ও অশান্তির সৃষ্টি হয়। সম্রাট দ্বিতীয় ভিলহেল্ম সিংহাসন ছেড়ে দেন। ১৯১৮ সালের ৩রা মার্চ রাশিয়া ও জার্মানির মধ্যে যুদ্ধবিরতি হয়। ১৯১৮ সালের ১১ই নভেম্বর সকাল ১১টায় জার্মানি এবং মিত্রশক্তির দেশগুলি যুদ্ধে বিরতি দেয় ও একটি সমাপনী শান্তিচুক্তিতে স্বাক্ষর করে। ফলে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের অবসান ঘটে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে প্রথমবারের মত কোন যুদ্ধে যুদ্ধবিমানের ব্যাপক ব্যবহার করা হয়। প্রথমে এগুলিকে শত্রুদের পরিখা ও শত্রুসেনাদের গমনাগমন গোপনে নজরদারি করার জন্য ব্যবহার করা হত। পরবর্তীতে এগুলিকে আকাশযুদ্ধ এবং বোমাবর্ষণের কাজেও ব্যবহার করা হয়।
রুশ বিপ্লব
১৯শ শতকে রাশিয়াকে আধুনিকীকরণের লক্ষ্যে চাষীদেরকে মুক্ত করে দেওয়া হয়, কলকারখানা নির্মাণ করা হয় এমনকি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাও প্রচলন করা হয়, কিন্তুর এ উদ্দেশ্য সফল হয় নি। রুশ জার বা সম্রাট ২য় আলেকজান্ডার সংস্কার সাধন করলেও ১৮৮১ সালে তাকে হত্যা করা হয়। তার পুত্র সম্রাট ৩য় আলেকজান্ডার ক্ষমতায় আসার পর পূর্বের সমস্ত সংস্কার রদ করে দেন। ফলে কিছু রুশ বেপরোয়া হয়ে বিপ্লবের সূত্রপাত ঘটায়।
ভ্লাদিমির ইলিয়িচ উলিয়ানর, যিনি লেনিন নামেই বেশি পরিচিত, ১৮৮৭ সালে একজন মার্ক্সবাদীতে পরিণত হন। তিনি ১৮৯৮ সাল থেকে বলশেভিকদের নেতায় পরিণত হন। পরবর্তীতে তিনি রুশ বিপ্লবের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন।
১৯০৫ সালে রাশিয়ার রাজধানী সাংত পিতেরবুর্গ বা সেন্ট পিটার্সবার্গ শহরে দুই লক্ষ লোক শীতকালীন প্রাসাদের সামনে মিছিল সমাবেশ করে। সেসময় সেনাবাহিনীর সদস্যরা ধর্মঘটরত শ্রমিকদের উপর গুলিবর্ষণ করলে প্রথম গুরুত্বপূর্ণ বিদ্রোহটি শুরু হয়, যা খুব শীঘ্রই দমন করা হয়। লেনিনসহ বিদ্রোহের অন্য নেতারা নির্বাসনে যান। লেনিন ১৯০৫ থেকে ১৯১৭ সাল পর্যন্ত নির্বাসনে ছিলেন। সেসময় রাশিয়ার নতুন সম্রাট ২য় নিকোলাস জনগণকে আরও বেশি নাগরিক অধিকার ও সুবিধা প্রদানের প্রতিশ্রুতি দেন, কিন্তু শীঘ্রই তিনি এই প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করেন।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হলে রাশিয়ার বেশিরভাগ জনগণের জীবনের মান মন্দ থেকে মন্দতর হতে থাকে। রেলপথে শহরগুলিতে খাদ্য, জ্বালানি ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় দ্রব্য সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়। অর্থনীতি প্রায় ধ্বসে পড়ে ও দুর্ভিক্ষের সৃষ্টি হয়। অনেক রুশ রাসপুতিনকে অভিযুক্ত করে এই বলে যে তার কারণেই সম্রাট জনগণের অভিযোগ অগ্রাহ্য করেন। রাসপুতিন ছিলেন একজন ধর্মযাজক; তিনি দাবী করেন যে সম্রাটের অসুস্থ পুত্রকে তিনি সারিয়ে তুলতে পারবেন। ১৯১৭ সালে মার্চ মাসে আবার দাঙ্গা ছড়িয়ে পড়ে। এবার সেনাবাহিনীও দাঙ্গাকারী জনগণের পক্ষ নেয়। সম্রাট নিকোলাস ও তার মন্ত্রীরা পদত্যাগ করেন। আলেকজান্ডার কেরেন্স্কির নেতৃত্বে একটি অস্থায়ী প্রজাতান্ত্রিক সরকার গঠন করা হলেও অশান্তি অব্যাহত থাকে। ১৯১৭ সালে লেনিন রাশিয়াতে ফেরত আসেন এবং তার নেতৃত্বে বলশেভিকেরা রাষ্ট্রযন্ত্র দখল করার পরিকল্পনা করেন। নভেম্বর মাসে বিপ্লবীরা সাংত পিতেরবুর্গের শীতকালীন প্রাসাদে আক্রমণ করে এবং রাশিয়ার ক্ষমতা দখল করে। রাশিয়াতে তখন ভিন্ন একটি পঞ্জিকা ব্যবহৃত হত বলে এই ঘটনাটিকে “অক্টোবর বিপ্লব” নামে আখ্যা দেওয়া হয়। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে ক্লান্ত রুশ সেনারাও বলশেভিকদের সমর্থন দেয়। রাজপরিবারের সবাইকে (সম্রাট নিকোলাস, তার স্ত্রী আলেকজান্দ্রা এবং তাদের পাঁচ সন্তান) প্রথমে কারাবন্দী করা হয় ও পরে তাদের মৃত্যুদন্ড কার্যকর করা হয়।
বলশেভিকেরা রাশিয়ার রাজধানী মস্কোতে সরিয়ে নিয়ে আসে। তারা জার্মানির সাথে শান্তিচুক্তি সম্পাদন করে ও প্রথম বিশ্বযুদ্ধ থেকে রাশিয়াকে প্রত্যাহার করে নেয়। তারা বিশালাকার জমিদারিগুলিকে ভেঙে ফেলে এবং দরিদ্র চাষীদেরকে জমি বণ্টন করে দেয়। শ্রমিকেরা কলকারখানার দায়িত্ব নেয় এবং রাষ্ট্র ব্যাংকব্যবস্থার নিয়ন্ত্রণ নেয়। ১৯১৮ সালে বলশেভিক লোহিতবাহিনী এবং সাম্যবাদ-বিরোধী শ্বেতবাহিনীর মধ্যে গৃহযুদ্ধ শুরু হয় যা ১৯২০ সাল পর্যন্ত অব্যাহত থাকে। ১৯২১ সালে বলশেভিকেরা যুদ্ধে বিজয় লাভ করে। এর পরের বছর ১৯২২ সালে রুশ সাম্রাজ্যের নাম বদলে সোভিয়েত সাম্যবাদী প্রজাতন্ত্রগুলির ইউনিয়ন তথা সোভিয়েত ইউনিয়ন প্রতিষ্ঠা করা হয়। ১৯২৪ সালে লেনিন মৃত্যুবরণ করেন। এসময় লেনিনের পরেই আরেক বলশেভিক নেতা লেওন ত্রোত্স্কি ছিলেন রাশিয়ার ২য় সবচেয়ে ক্ষমতাধর ব্যক্তি। কিন্তু লেনিনের মৃত্যুর পর স্তালিন ক্ষমতা দখল করলে ত্রোত্স্কি নির্বাসনে যান এবং পরে তাকে বিদেশেই স্তালিনের চরেরা হত্যা করে। স্তালিন একনায়কতান্ত্রিক পদ্ধতিতে রাশিয়া শাসন করেন। তার শাসনামলে লক্ষ লক্ষ ভিন্ন মতাবলম্বীকে হত্যা করা হয় বা বন্দীশিবিরে পাঠানো হয়, যেখানে তারা মারা যায়।
সর্বাধিনায়ক ছিলেন জিন্নাহ। ঠিক তার পরের দিন ১৫ই অগাস্ট ভারতীয় উপমহাদেশের বাকী অংশ ভারত নামক রাষ্ট্র হিসেবে আবির্ভূত হয়, যার নেতৃত্বে ছিলেন প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহেরু। তাৎক্ষনিকভাবে ভারতের সর্বত্র দাঙ্গা-হাঙ্গামা দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে। কোটি কোটি মানুষ ভারত থেকে পাকিস্তানে এবং পাকিস্তান থেকে ভারতের দিকে অভিবাসন শুরু করে। এই অত্যন্ত বিশৃঙ্খল, সংঘর্ষময় প্রক্রিয়াতে লক্ষ লক্ষ লোক মারা যায়। ১৯৪৮ সালে শ্রীলঙ্কা স্বাধীনতা লাভ করে। ১৯৭১ সালে পূর্ব পাকিস্তান পাকিস্তান থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় এবং স্বাধীন বাংলাদেশ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। মহাত্মা গান্ধী দিল্লিতে এক শান্তি সমাবেশ চলাকালীন সময় একজন হিন্দু উগ্রবাদীর দ্বারা নিহত হন।
নেহেরু ও সমাজতান্ত্রিক গণতন্ত্র
নেহেরু পরবর্তী পর্ব
ইন্দিরা গান্ধী ও রাজীব গান্ধী
অযোধ্যার মসজিদ ধ্বংস ও বিজেপি-র উত্থান
বেনজির ভুট্টোকে ক্ষমতা থেকে অপসারণ ও পাকিস্তানে সামরিক শাসন
ফিলিস্তিন ও ইসরায়েল
জেরুসালেম শহর ও তার আশেপাশের এলাকাগুলি প্রাচীন যুগে ইহুদী বা হিব্রুভাষীদের বাসভূমি ছিল। সময়ের সাথে ইহুদীদেরকে বিভিন্ন শাসকগোষ্ঠী তাদের মূল ভূখণ্ড থেকে বিতাড়িত করে। ১৯শ শতকের শেষে এসে বেশিরভাগ ইহুদী ইউরোপের বিভিন্ন দেশ, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং রাশিয়াতে বিক্ষিপ্ত উদ্বাস্তু সংখ্যালঘু সম্প্রদায় হিসেবে বসবাস করত। অন্যদিকে ৭ম শতকেই আরব মুসলমানেরা বাইজেন্টীয় রোমান সাম্রাজ্যের কাছ থেকে ইহুদীদের প্রাচীন বাসভূমিটি বিজয় করে ও এর নাম রাখে ফিলিস্তিন। তখন থেকে বহু শতাব্দী ধরে এটি আরব মুসলমানদের বাসভূমিতে পরিণত হয়। ২০শ শতকের শুরুতে এটি মুসলমান উসমানীয় সাম্রাজ্যের একটি অংশ ছিল। কিন্তু ১৯শ শতকের শেষে এসে ইউরোপীয় ইহুদীরা একাধিক হাজার বছর পরে তাদের আদি বাসভূমিতে ফেরত যাওয়ার চেষ্টা করলে সেখানে হাজার বছরেরও বেশি কাল যাবৎ বিদ্যমান আরব জনগোষ্ঠীর সাথে তাদের এক দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের সৃষ্টি হয়। ফিলিস্তিনে বসবাসরত বেশির ভাগ অধিবাসীই ছিল আরব। ১৮৮০-র দশকে স্বল্পসংখ্যক ইউরোপীয় ইহুদী ফিলিস্তিনে বসতি স্থাপন করতে শুরু করে। ১৮৮২ সালে প্রথম বসতিটি গঠিত হয়। এই ইহুদীদেরকে জায়নবাদী বলে ডাকা হত। ১৯১৭ সালে বালফুর ঘোষণার মাধ্যমে ব্রিটিশ সরকার ফিলিস্তিনে একটি ইহুদী বাসভূমি স্থাপনের ব্যাপারে তাদের সমর্থন জানায়। ১ম বিশ্বযুদ্ধে পরাজয়ের প্রেক্ষিতে তুর্কি উসমানীয় সাম্রাজ্যে ভাঙন ধরে। ১৯২০ সালে সেভ্রের চুক্তিতে উসমানীয় সাম্রাজ্যের সমাপ্তি ঘোষণা করা হয়। নবগঠিত লিগ অফ নেশন্স ১৯২২ সালে যুক্তরাজ্যকে সাময়িকভাবে স্বল্পমেয়াদের জন্য ফিলিস্তিন পরিচালনার অনুমোদন বা ম্যান্ডেট দেয়। ১৯২০-এ দশকে ইহুদীরা ফিলিস্তিনে বসতি স্থাপন অব্যাহত রাখে এবং ১৯২৯ সালে ইহুদী ও আরবদের মধ্যে প্রথম বড় ধরনের সংঘর্ষ ঘটে। ১৯৩০-এর দশকে, বিশেষ করে ১৯৩৩ সালের পর থেকে জার্মানিতে সেখানকার ইহুদীদের উপর অত্যাচার নির্যাতন শুরু হয়। কারাবন্দিত্ব বা মৃত্যু এড়াতে যেসব ইহুদীদের সামর্থ্য ছিল তারা জার্মানি পরিত্যাগ করা শুরু করে। কিছু ইহুদী অন্যান্য ইউরোপীয় রাষ্ট্র বা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমায়। অন্যান্য ইহুদীরা ফিলিস্তিনের উদ্দেশ্যে রওনা দেন। ফিলিস্তিনের ইহুদী অভিবাসীদের সংখ্যা দ্রুত বৃদ্ধি পাওয়ার সাথে সাথে স্থানীয় আরবদের সাথে তাদের সংঘর্ষের সংখ্যা ও মাত্রাও বাড়তে থাকে। যুক্তরাজ্য ফিলিস্তিনে ইহুদী অভিবাসীর সংখ্যা নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করে।
২য় বিশ্বযুদ্ধের পরে আরও অনেক ইহুদী ফিলিস্তিনে অভিবাসনে আগ্রহী হয়। যুক্তরাজ্য বিষয়টি জাতিসংঘে উত্থাপন করে। ১৯৪৭ সালে জাতিসংঘে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় যে ফিলিস্তিনকে ভেঙে দুইটি রাষ্ট্র গঠন করা হবে যার একটি আরব এবং অন্যটি ইহুদী। আরও সিদ্ধান্ত হয় যে জেরুসালেম একটি আন্তর্জাতিক শহরে পরিণত হবে, কেননা এটি ইহুদী, খ্রিস্টান ও মুসলমান সবার জন্যই একটি পবিত্র নগরী। ইহুদীরা জাতিসঙ্ঘের এই প্রস্তাবে রাজী হলেও আরবরা রাজী ছিল না। যুক্তরাজ্য ১৯৪৮ সালের ১৪ই মে তার নিয়ন্ত্রণ উঠিয়ে নেয় এবং একই দিনে ইহুদী নেতা দাভিদ বেন গুরিয়ন (ইসরায়েলের ১ম প্রধানমন্ত্রী ও জাতির জনক) ইসরায়েল রাষ্ট্রের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। আরব রাষ্ট্রসমূহের সংগঠন আরব লীগ (সিরিয়া, লেবানন, ইরাক, ইরান, জর্দান ও মিশর) ইসরায়েলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে। কিন্তু ইসরায়েল খুব দ্রুত তাদের সম্মিলিত সেনাবাহিনীকে পরাজিত করে এবং আগের চেয়ে বেশি ভূমি দখল করে নিতে সক্ষম হয়। জেরুসালেমের অংশবিশেষ জর্দানের দখলে আসে। ১৯৪৯ সালে জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় যুদ্ধবিরতি ঘটে এবং এর ফলে ইসরায়েল ১৯৪৭ সালের প্রস্তাবে উল্লিখিত ইহুদী রাষ্ট্রের শাসনক্ষমতা লাভ করে। ১৯৬৭ সালে আরেকটি যুদ্ধে ইসরায়েল সমগ্র জেরুসালেম পুনরায় দখলে আনতে সক্ষম হয় এবং শহরটিকে ইসরায়েলের রাজধানী হিসেবে ঘোষণা দেয়। আরব দেশগুলি ইসরায়েলকে স্বীকৃতি দেয়নি। ইসরায়েলও যুদ্ধে অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূমি ফেরত দেওয়ার ব্যাপারে সদিচ্ছা প্রকাশ করেনি।
জাতিসংঘের প্রতিষ্ঠা
ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা
ঠান্ডা যুদ্ধ
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধশেষে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং সোভিয়েত ইউনিয়ন বিশ্বের দুই পরাশক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। অতীতে মিত্র হলেও তাদের মধ্যে এক ধরনের প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক পরোক্ষ যুদ্ধ শুরু হয়, যার নাম দেওয়া হয় ঠান্ডা যুদ্ধ। সোভিয়েত ইউনিয়ন লোহিত বাহিনীর সাহায্যে পূর্ব ইউরোপের দেশগুলির সরকার পরিবর্তন করে সাম্যবাদী সরকার গঠন করালে এই ঠান্ডা যুদ্ধের সূচনা হয়। এর ফলে কার্যত ইউরোপে একটি লৌহপর্দার সৃষ্টি হয়, যার একপাশে ছিল মার্কিন প্রভাব-বলয়ভুক্ত পশ্চিম ইউরোপ এবং অপর প্রান্তে ছিল সোভিয়েত প্রভাবাধীন পূর্ব ইউরোপ। সাম্যবাদ যেন পশ্চিম ইউরোপেও ছড়িয়ে না পড়ে, সেজন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ১৯৪৭ সালে “মার্শাল পরিকল্পনা” নামের একটি প্রকল্প হাতে নেয়, যেখানে যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশগুলির অর্থনীতিকে চাঙা করতে অর্থনৈতিক সাহায্যের ব্যবস্থা করা হয়।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে জার্মানিকে বিভিন্ন মিত্রশক্তির মধ্যে ভাগ করে দেওয়া হয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্স দেশটির পশ্চিমভাগ নিয়ন্ত্রণ করত; অন্যদিকে দেশটির পূর্বভাগ নিয়ন্ত্রণ করত সোভিয়েত ইউনিয়ন। দেশটির রাজধানী বার্লিন শহরের পুরোটাই সোভিয়েত নিয়ন্ত্রিত অংশে পড়লেও সেটিও পশ্চিম ও পূর্ব এই দুই ভাগে বিভক্ত ছিল। ১৯৪৮ সালে সোভিয়েতরা ৫ মাস ধরে পশ্চিম বার্লিন অবরোধ করে রাখে; তখন মিত্রশক্তিরা বিমানে করে প্রয়োজনীয় দ্রব্য সরবরাহ করে। ১৯৪৯ সালে জার্মানি পূর্ব ও পশ্চিম দুই জার্মানিতে বিভক্ত হয়ে যায়। অনেক পরে ১৯৬১ সালে পূর্ব বার্লিনের সাম্যবাদীরা দুই বার্লিনের মধ্যে প্রাচীর নির্মাণ করে।
১৯৪৯ সালের ৪ঠা এপ্রিল উত্তর আটলান্টিক চুক্তিভিত্তিক সংস্থা তথা নেটো (North Atlantic Treaty Organization, NATO) প্রতিষ্ঠিত হয়; এর সদর দপ্তর বেলজিয়ামের ব্রাসেল্সে অবস্থিত ছিল। এটি ছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা এবং বেশ কিছু পশ্চিম ইউরোপীয় রাষ্ট্রের মধ্যে যেকোন বহিরাক্রমণ প্রতিরোধের জন্য সৃষ্ট একটি সামরিক মৈত্রী। একই বছরে চীনের মূল ভূখণ্ডে মাও সে তুংয়ের নেতৃত্বে সাম্যবাদীরা ক্ষমতায় আরোহণ করে। ১৯৫০ থেকে ১৯৫৩ সাল পর্যন্ত কোরীয় যুদ্ধ শুরু হয়। চীনের মদদে উত্তর কোরিয়া দক্ষিণ কোরিয়াকে আক্রমণ করে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র দক্ষিণ কোরিয়াকে সামরিক সমর্থন দেয়। ১৯৫৩ সালে সোভিয়েত নেতা স্তালিনের মৃত্যু হয়। ১৯৫৫ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন সাম্যবাদী রাষ্ট্রগুলির সাথে মিলে একটি মৈত্রী গঠন করে, যার নাম ছিল ওয়ারস’ চুক্তি। মার্কিন ও সোভিয়েত দুই পরাশক্তিই পারমাণবিক অস্ত্রশস্ত্রের এক বিশাল ভাণ্ডার গড়ে তোলে। ১৯৫৮ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সন্নিকটে অবস্থিত রাষ্ট্র কিউবাতে ফিদেল কাস্ত্রো একনায়ক হিসেবে ক্ষমতায় আসেন এবং সোভিয়েত ইউনিয়নের সাথে মৈত্রী স্থাপন করেন। এর সূত্র ধরে ১৯৬২ সালে আরেকটি সংকটের সৃষ্টি হয়। সে বছর কাস্ত্রো তার দেশে সোভিয়েত ইউনিয়নকে ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষপণকেন্দ্র নির্মাণের অনুমতি দেন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জন এফ কেনেডি মার্কিন নৌবাহিনীকে কিউবাকে অবরোধের আদেশ দেন। শেষ পর্যন্ত সোভিয়েতরা ক্ষেপণাস্ত্রকেন্দ্র নির্মাণ প্রকল্পটি প্রত্যাহারে সম্মত হয়। পারমাণবিক যুদ্ধ যাতে শুরু না হয়, সেজন্য সোভিয়েত নেতা নিকিতা ক্রুশ্চেভের আদেশে ক্ষেপণাস্ত্রবহনকারী সোভিয়েত জাহাজগুলি ফেরত নিয়ে আসা হয়। অন্যদিকে ১৯৬০ সাল থেকে রুশ-চীনা সম্পর্কে ফাটল ধরা শুরু হয়।
ঠান্ডা যুদ্ধের সময় মার্কিন ও সোভিয়েত দুই পরাশক্তিই অস্ত্র নির্মাণের পেছনে বিশাল অঙ্কের অর্থ খরচ করে। যদিও তারা নিজেদের মধ্যে কখনও যুদ্ধ করেনি, ১৯৫০-এর দশকে কোরীয় যুদ্ধে এবং ১৯৬০ ও ১৯৭০-এর দশকে ভিয়েতনাম যুদ্ধে তারা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে অংশ নেয়। এছাড়াও বহু দশক ধরে তারা একে অপরের বিরুদ্ধে গুপ্তচরবৃত্তি ও নেতিবাচক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রচারণায় লিপ্ত ছিল। পূর্ব ইউরোপের সাম্যবাদী রাষ্ট্রগুলিতে যেকোন প্রকার বিদ্রোহ সোভিয়েতরা শক্ত হাতে দমন করে। যেমন সোভিয়েতরা সাম্যবাদী শাসন বজায় রাখার জন্য ১৯৫৬ সালে হাঙ্গেরিতে এবং ১৯৬৮ সালে চেকোস্লোভাকিয়াতে সেনা অভিযান চালায়। ১৯৬৩ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়ন পারমাণবিক অস্ত্র পরীক্ষা বাতিলের একটি চুক্তি স্বাক্ষর করে।
এবং ১৯৭১ সালে মঙ্গলগ্রহে অবতরণ করে। ১৯৭২ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র শেষবারের মত চাঁদে মানববাহী অ্যাপোলো মিশন পরিচালনা করে। ১৯৭৫ সালে মার্কিন ও সোভিয়েত মহাকাশযান মহাশূন্যে একে অপরের সাথে সংযুক্ত হয়। ১৯৭৭ সালে মার্কিন মহাশূন্যযান ভাইকিং মঙ্গলগ্রহে অবতরণ করে। ১৯৮২ সালে সোভিয়েত অনুসন্ধানী মহাকাশযান শুক্রগ্রহে অবতরণ করে ও সেখান থেকে শুক্রগ্রহের পৃষ্ঠের রঙিন আলোকচিত্র পৃথিবীতে প্রেরণ করে। ১৯৮৬ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন প্রথম মহাশূন্য স্টেশন মির উৎক্ষেপন করে। ১৯৯৫ সালে রুশ নভোচারী ভালেরি পোলিইয়াকভ মির মহাকাশ স্টেশনে টানা ৪৩৭ দিন সময় কাটান। মির মহাকাশ স্টেশনটি ২০০১ সাল পর্যন্ত কক্ষপথে ছিল।
১৯৮০-র দশকে ফ্লোরিডার কার্নাভাল অন্তরীপ থেকে বহু মার্কিন মহাকাশ মিশন উৎক্ষেপ করা হয়। ১৯৭৯ থেকে ১৯৮৯ সাল পর্যন্ত মার্কিন মহাকাশ অনুসন্ধানী যান ভয়েজার ২ বৃহস্পতি, শনি, ইউরেনাস ও নেপচুন গ্রহের পাশ দিয়ে উড়ে যায় ও অনেক আলোকচিত্র তুলে পাঠায়। ১৯৮১ সালে ফেরতযোগ্য মহাকাশযান বা শাটলগুলির উড্ডয়ন শুরু হয়। সেবছর প্রথম এরকম একটি যান কলাম্বিয়া পৃথিবীকে প্রদক্ষিণ করে। দু’বার দুর্ঘটনার কারণে এই মহাকাশযানগুলি হারানো যায়। এর মধ্যে ১৯৮৬ সালের চ্যালেঞ্জার দুর্ঘটনাটি উল্লেখযোগ্য। এর আগে ১৯৮৪ সালে দুইজন মার্কিন নভোচারী মহাকাশযানের সাথে সংযোগ ছিন্ন করে মহাকাশে ওড়াওড়ি করেন।
১৯৯০ সালে একটি মার্কিন ফেরতযোগ্য মহাশূন্যযান হাবল দূরবীণটি মহাকাশে স্থাপন করে আসে। ঠান্ডা যুদ্ধের অবসানের পর ১৯৯০-র দশক থেকে মার্কিন ও রুশ বিজ্ঞানীরা বিভিন্ন প্রকল্পে একত্রে কাজ করেছেন। আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশন এমন একটি প্রকল্প। ইতোমধ্যে কম্পিউটার প্রযুক্তির অনেক উন্নতি ঘটে এবং ১৯৯৭ সালে মার্কিন প্যাথফাইন্ডার মহাকাশযানটি মঙ্গলগ্রহে অবতরণ করে। সেটি পৃথিবী থেকে নিয়ন্ত্রণযোগ্য সোজোর্নার নামের একটি চলমান অনুসন্ধানী যন্ত্র বা রোবট সেখানে রেখে আসে যাতে মঙ্গলগ্রহের পৃষ্ঠ পর্যবেক্ষণ করা যায়। এর পাঠানো মঙ্গলের ছবিগুলি মানুষেরা পৃথিবীতে বাসায় বসে তাদের টেলিভিশনের পর্দায় দেখতে পায়। ২০০০ সালে গ্লোবাল সার্ভেয়ার নামক যন্ত্র মঙ্গলগ্রহে পানির অস্তিত্বের সন্ধান পায়।
সালের যুদ্ধবিরতি চুক্তি পর্যন্ত যুদ্ধ অব্যাহত থাকে। দুই পক্ষের সেনাবাহিনীর সম্মুখভাগের সারিগুলি ধীরে ধীরে একটি নিয়ন্ত্রণ রেখাতে স্থিতিশীল হয়। এই রেখা পেরিয়ে মাঝে মাঝেই ভারত ও পাকিস্তান বিচ্ছিন্ন লড়াই চালাতে থাকে এবং ১৯৬৮ সালে (ও পরবর্তীতে ১৯৯৯ সালেও) হালকা যুদ্ধে অংশগ্রহণ করে। তবে ১৯৭১ সালে দুই দেশের মধ্যে একটি বিশাল আকারের যুদ্ধ হয়। ঐ বছর তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান বাংলাদেশ নামে স্বাধীনতা ঘোষণা করে এবং পশ্চিম পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে বিজয়ী হয়। ভারত বাংলাদেশ থেকে আগত শরণার্থীদের আশ্রয় দেবার পাশাপাশি বাংলাদেশী মুক্তিবাহিনীকে গুরুত্বপূর্ণ সামরিক সহায়তা দান করে।
ইরান-ইরাক যুদ্ধ
১৯৭৯ সালে সাদ্দাম হুসেইন ক্ষমতাসীন দল বাথ পার্টির অভ্যন্তরীণ এক কু-এর বদৌলতে ইরাকের রাষ্ট্রপতিতে পরিণত হন। সাদ্দাম হুসেইন একজন অত্যন্ত উচ্চাভিলাষী নেতা ছিলেন। তিনি ইরাককে কৌশলগতভাবে মধ্যপ্রাচ্যের একটি অন্যতম শক্তিশালী রাষ্ট্রে পরিণত করার প্রচেষ্টা চালান। একই সময় ইরানে ধর্মীয় বিপ্লব ঘটে। ইরাকি সরকার আশঙ্কা করছিল যে ইরাকের বৃহৎ শিয়া সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ে এই বিপ্লবের আগুন ছড়িয়ে পড়বে। এছাড়া শাত-এল-আরব নদীর অধিকার নিয়ে ইতোমধ্যেই বিরাজমান সমস্যা আবারও চাঙ্গা হয়ে ওঠার ঝুঁকি ছিল। সাদ্দাম ইরানের সামরিক দুর্বলতা আঁচ করে ১৯৮০ সালের ২২শে সেপ্টেম্বর তার সেনাবাহিনীকে ইরান সীমান্ত অতিক্রম করার আদেশ দেন। কিন্তু যেমনটি সহজ হবে ভেবেছিলেন ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ তেমন সহজ হয়নি। ইরানিরা জানপ্রাণ দিয়ে তাদের ভূখণ্ড রক্ষা করতে শুরু করে এবং ১৯৮১ সালের মার্চ মাস নাগাদ ইরাকি আক্রমণে ভাটা পড়ে। ১৯৮২ সালের জুন নাগার ইরানিরা তাদের সমস্ত হারানো ভূখণ্ড ফেরত পেতে সক্ষম হয়। এরপর কোন পক্ষই যুদ্ধ জেতার মত কোন বিশাল ও সফল আক্রমণ গড়ে তুলতে পারেনি। আক্রমণগুলির জন্য বিপুল পরিমাণ ব্যয়ের বিপরীতে প্রকৃত অগ্রগতির পরিমাণ ছিল সামান্য। যুদ্ধটি ধীরে ধীরে ইরান-ইরাকের একে অপরের প্রধান প্রধান শহরে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপের যুদ্ধে সীমাবদ্ধ হয়। শেষ পর্যন্ত দুই পক্ষ স্বীকার করতে বাধ্য হয় যে কেউই যুদ্ধে বিজয়ী হতে পারবে না এবং ১৯৮৮ সালের আগস্টে তারা একটি যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে স্বাক্ষর করে। কিন্তু অর্ধযুগেরও বেশি সময় ধরে চলা ফলহীন এই যুদ্ধে প্রায় ১৫ লক্ষ লোক প্রাণ হারায়।
ইসলামী সন্ত্রাসবাদের উত্থান
কম্পিউটার প্রযুক্তি ও যোগাযোগ বিপ্লব
জৈব প্রযুক্তি
জনসংখ্যা বিস্ফোরণ
২০শ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে এসে বিশ্বের জনসংখ্যার সূচকীয় হারে বৃদ্ধি ঘটে। ১৯শ শতকের শুরুতে বিশ্বের জনসংখ্যা ১০০ কোটিতে পৌঁছেছিল। ২০ শতকের দ্বিতীয় দশকে এসে সেটি ২০০ কোটি ও ১৯৫০ সালে ২৫০ কোটি হয়। এরপর মাত্র ৭০ বছরের মধ্যে জনসংখ্যা তিনগুণেরও বেশি বৃদ্ধি পেয়ে ২১শ শতাব্দীর ৩য় দশকে এসে ৮০০ কোটি ছাড়িয়ে যায়। ২০৫০ সাল নাগাদ এটি ১০০০ কোটির কাছাকাছি পৌঁছাবে বলে অনুমান করা হচ্ছে। স্বাস্থ্যসেবা, পয়োনিষ্কাশন ও নির্মল সুপেয় জলের সরবরাহ, পুষ্টি, ইত্যাদি খাতে উন্নতির ফলে মৃত্যুহার কমে গিয়ে ও আয়ু বেড়ে গিয়ে জনসংখ্যা দ্রুত বৃদ্ধি পেয়েছে। এছাড়া টিকা ও জীবাণুনাশকের ব্যবহারের ফলে সংক্রামক রোগে মৃত্যুর হার কমে গেছে। জনসংখ্যা বিস্ফোরণের ফলে প্রাকৃতিক সম্পদের হ্রাস, দূষণ বৃদ্ধি, জীববৈচিত্র্য লোপ, জলবায়ু পরিবর্তনসহ অনেক পরিবেশগত অবক্ষয়মূলক সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে। অতিরিক্ত জনসংখ্যার খাদ্যের চাহিদা বিশ্ব খাদ্য উৎপাদন ব্যবস্থার উপর চাপ সৃষ্টি করেছে এবং খাদ্য নিরাপত্তা ও অপপুষ্টির ঝুঁকি সৃষ্টি করছে। নগরায়ন ও গ্রাম থেকে শহরে অভিবাসনের ফলে গাদাগাদি শহরে বসবাস, বস্তি, মৌলিক সেবাদানে অপর্যাপ্ততার মতো সমস্যাগুলি বিদ্যমান। জনসংখ্যার চাহিদা মেটাতে প্রাকৃতিক কাঁচামালের ভাণ্ডার ফুরিয়ে আসছে। জনসংখ্যা বিস্ফোরণের নেতিবাচক প্রভাবগুলি হ্রাসে শিক্ষা, পরিবার পরিকল্পনা, টেকসই উন্নয়ন, দায়িত্ববান ভোগ ও উৎপাদন, ইত্যাদি সহায়ক হতে পারে।
চিকিৎসাবিজ্ঞানের উন্নতি এবং নতুন রোগব্যাধি
১৯শ শতকের শেষে এসে লুই পাস্তর ও রোবের্ট কখের মতো বিজ্ঞানীরা আবিষ্কার করেন যে মানবদেহের বহুসংখ্যক রোগ আসলে ব্যাকটেরিয়া ও ভাইরাসের মতো জীবাণুদের দ্বারা সংঘটিত হয়, এবং এর সূত্র ধরে ঐসব রোগ প্রতিরোধ ও নিরাময়ের জন্য টিকা ও রোগ সংক্রমণ সারাতে ব্যাকটেরিয়ানিরোধক ঔষধ নির্মাণের ধারার প্রচলন হয়। ফলে কোটি কোটি জীবন রক্ষা পায়। ২০শ শতক জুড়ে রোগনির্ণয়ের জন্য চিত্রণ কৌশলগুলির বিকাশ ঘটে। রঞ্জন রশ্মি (এক্সরে), পরিগাণনিক স্তরচিত্রণ (সিটি স্ক্যান), চৌম্বক অনুরণন চিত্রণ (এমআরআই), ইত্যাদি চিকিৎসকদেরকে মানবদেহের অভ্যন্তরীণ অঙ্গগুলিকে প্রত্যক্ষ করতে ও বিভিন্ন ধরনের অসুস্থাবস্থা ও রোগ নির্ণয় করতে সাহায্য করে। অবেদন ও নির্বীজন (জীবাণুমুক্তকরণ) কৌশলগুলির বিকাশের সাথে সাথে গুরুত্বপূর্ণ শল্যচিকিৎসার বিকাশ ঘটে, অঙ্গ প্রতিস্থাপন সহজ হয়ে ওঠে এবং ন্যূনতম অনুপ্রবেশকারী শল্যচিকিৎসার প্রচলন বৃদ্ধি পায়। ঔষধবিজ্ঞানের ক্ষেত্রে নতুন নতুন ঔষধের আবিষ্কার চিকিৎসার কার্যকারিতা বৃদ্ধি পায়। ২১শ শতকের শুরুতে এসে মানব বংশাণুসমগ্র (জিনোম) উদ্ঘাটনের ফলে ব্যক্তিমাফিক চিকিৎসা, বংশাণু চিকিৎসা ও সূক্ষ্ণ চিকিৎসার দ্বার উন্মোচিত হয়েছে।
চিকিৎসাবিজ্ঞানে অভূতপূর্ব অগ্রগতির পাশাপাশি নতুন নতুন রোগের প্রাদুর্ভাব ও মহামারি ঘটে। মানুষের আচরণে পরিবর্তন, জলবায়ু পরিবর্তন, বিশ্বায়ন, প্রকৃতিতে মানুষের হস্তক্ষেপ, বিশ্ব বাণিজ্য ও ভ্রমণ, দ্রুত নগরায়ন, ইত্যাদি বিভিন্ন কারণে প্রতি দশকে নতুন নতুন গুরুতর রোগের আবির্ভাব ঘটছে। ১৯৮০-র দশকে এইডস, ২১শ শতকে এসে সার্স, ইনফ্লুয়েঞ্জা, ইবোলা, কোভিড-১৯, ডেঙ্গু, চিকুনগুনিয়া, ইত্যাদি সংক্রামক রোগ ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির কারণ হয়। এছাড়া মানুষের আয়ু বৃদ্ধির সাথে সাথে অসংক্রামক রোগ যেমন অতিস্থূলতা, হৃদরোগ, মধুমেহ (ডায়াবেটিস), দীর্ঘমেয়াদী শ্বাসরোগ ও কর্কটরোগ (ক্যান্সার) বয়স্ক জনগোষ্ঠীতে মহামারি আকার ধারণ করেছে। এগুলি প্রতিরোধ ও প্রতিকারের জন্য আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, নজরদারি, জনসচেতনতা বৃদ্ধি ও কার্যকর জনস্বাস্থ্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ অত্যাবশ্যক হয়ে উঠেছে।ইসলামী সন্ত্রাসবাদের উত্থান
কম্পিউটার প্রযুক্তি ও যোগাযোগ বিপ্লব
জৈব প্রযুক্তি
জনসংখ্যা বিস্ফোরণ
২০শ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে এসে বিশ্বের জনসংখ্যার সূচকীয় হারে বৃদ্ধি ঘটে। ১৯শ শতকের শুরুতে বিশ্বের জনসংখ্যা ১০০ কোটিতে পৌঁছেছিল। ২০ শতকের দ্বিতীয় দশকে এসে সেটি ২০০ কোটি ও ১৯৫০ সালে ২৫০ কোটি হয়। এরপর মাত্র ৭০ বছরের মধ্যে জনসংখ্যা তিনগুণেরও বেশি বৃদ্ধি পেয়ে ২১শ শতাব্দীর ৩য় দশকে এসে ৮০০ কোটি ছাড়িয়ে যায়। ২০৫০ সাল নাগাদ এটি ১০০০ কোটির কাছাকাছি পৌঁছাবে বলে অনুমান করা হচ্ছে। স্বাস্থ্যসেবা, পয়োনিষ্কাশন ও নির্মল সুপেয় জলের সরবরাহ, পুষ্টি, ইত্যাদি খাতে উন্নতির ফলে মৃত্যুহার কমে গিয়ে ও আয়ু বেড়ে গিয়ে জনসংখ্যা দ্রুত বৃদ্ধি পেয়েছে। এছাড়া টিকা ও জীবাণুনাশকের ব্যবহারের ফলে সংক্রামক রোগে মৃত্যুর হার কমে গেছে। জনসংখ্যা বিস্ফোরণের ফলে প্রাকৃতিক সম্পদের হ্রাস, দূষণ বৃদ্ধি, জীববৈচিত্র্য লোপ, জলবায়ু পরিবর্তনসহ অনেক পরিবেশগত অবক্ষয়মূলক সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে। অতিরিক্ত জনসংখ্যার খাদ্যের চাহিদা বিশ্ব খাদ্য উৎপাদন ব্যবস্থার উপর চাপ সৃষ্টি করেছে এবং খাদ্য নিরাপত্তা ও অপপুষ্টির ঝুঁকি সৃষ্টি করছে। নগরায়ন ও গ্রাম থেকে শহরে অভিবাসনের ফলে গাদাগাদি শহরে বসবাস, বস্তি, মৌলিক সেবাদানে অপর্যাপ্ততার মতো সমস্যাগুলি বিদ্যমান। জনসংখ্যার চাহিদা মেটাতে প্রাকৃতিক কাঁচামালের ভাণ্ডার ফুরিয়ে আসছে। জনসংখ্যা বিস্ফোরণের নেতিবাচক প্রভাবগুলি হ্রাসে শিক্ষা, পরিবার পরিকল্পনা, টেকসই উন্নয়ন, দায়িত্ববান ভোগ ও উৎপাদন, ইত্যাদি সহায়ক হতে পারে।
চিকিৎসাবিজ্ঞানের উন্নতি এবং নতুন রোগব্যাধি
১৯শ শতকের শেষে এসে লুই পাস্তর ও রোবের্ট কখের মতো বিজ্ঞানীরা আবিষ্কার করেন যে মানবদেহের বহুসংখ্যক রোগ আসলে ব্যাকটেরিয়া ও ভাইরাসের মতো জীবাণুদের দ্বারা সংঘটিত হয়, এবং এর সূত্র ধরে ঐসব রোগ প্রতিরোধ ও নিরাময়ের জন্য টিকা ও রোগ সংক্রমণ সারাতে ব্যাকটেরিয়ানিরোধক ঔষধ নির্মাণের ধারার প্রচলন হয়। ফলে কোটি কোটি জীবন রক্ষা পায়। ২০শ শতক জুড়ে রোগনির্ণয়ের জন্য চিত্রণ কৌশলগুলির বিকাশ ঘটে। রঞ্জন রশ্মি (এক্সরে), পরিগাণনিক স্তরচিত্রণ (সিটি স্ক্যান), চৌম্বক অনুরণন চিত্রণ (এমআরআই), ইত্যাদি চিকিৎসকদেরকে মানবদেহের অভ্যন্তরীণ অঙ্গগুলিকে প্রত্যক্ষ করতে ও বিভিন্ন ধরনের অসুস্থাবস্থা ও রোগ নির্ণয় করতে সাহায্য করে। অবেদন ও নির্বীজন (জীবাণুমুক্তকরণ) কৌশলগুলির বিকাশের সাথে সাথে গুরুত্বপূর্ণ শল্যচিকিৎসার বিকাশ ঘটে, অঙ্গ প্রতিস্থাপন সহজ হয়ে ওঠে এবং ন্যূনতম অনুপ্রবেশকারী শল্যচিকিৎসার প্রচলন বৃদ্ধি পায়। ঔষধবিজ্ঞানের ক্ষেত্রে নতুন নতুন ঔষধের আবিষ্কার চিকিৎসার কার্যকারিতা বৃদ্ধি পায়। ২১শ শতকের শুরুতে এসে মানব বংশাণুসমগ্র (জিনোম) উদ্ঘাটনের ফলে ব্যক্তিমাফিক চিকিৎসা, বংশাণু চিকিৎসা ও সূক্ষ্ণ চিকিৎসার দ্বার উন্মোচিত হয়েছে।
চিকিৎসাবিজ্ঞানে অভূতপূর্ব অগ্রগতির পাশাপাশি নতুন নতুন রোগের প্রাদুর্ভাব ও মহামারি ঘটে। মানুষের আচরণে পরিবর্তন, জলবায়ু পরিবর্তন, বিশ্বায়ন, প্রকৃতিতে মানুষের হস্তক্ষেপ, বিশ্ব বাণিজ্য ও ভ্রমণ, দ্রুত নগরায়ন, ইত্যাদি বিভিন্ন কারণে প্রতি দশকে নতুন নতুন গুরুতর রোগের আবির্ভাব ঘটছে। ১৯৮০-র দশকে এইডস, ২১শ শতকে এসে সার্স, ইনফ্লুয়েঞ্জা, ইবোলা, কোভিড-১৯, ডেঙ্গু, চিকুনগুনিয়া, ইত্যাদি সংক্রামক রোগ ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির কারণ হয়। এছাড়া মানুষের আয়ু বৃদ্ধির সাথে সাথে অসংক্রামক রোগ যেমন অতিস্থূলতা, হৃদরোগ, মধুমেহ (ডায়াবেটিস), দীর্ঘমেয়াদী শ্বাসরোগ ও কর্কটরোগ (ক্যান্সার) বয়স্ক জনগোষ্ঠীতে মহামারি আকার ধারণ করেছে। এগুলি প্রতিরোধ ও প্রতিকারের জন্য আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, নজরদারি, জনসচেতনতা বৃদ্ধি ও কার্যকর জনস্বাস্থ্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ অত্যাবশ্যক হয়ে উঠেছে।