গভীরভাবে ধার্মিক লেখকের হাতে অনেক কালজয়ী রচনা সৃষ্টি হয়েছে। আবার ধর্মে অবিশ্বাসী লেখকরাও সৃষ্টি করেছেন অমর রচনা। তবে ধর্ম বা ঈশ্বরবিশ্বাসী লেখকদের একটি দিকের কথা তুলে ধরতেই হয়। তারা প্রায় প্রত্যেকেই প্রথাগত ধর্মাচার নিয়ে পড়ে থাকতেন না। বরং ধর্মের দার্শনিক দিকটি তাদের কাছে অনেক ক্ষেত্রেই প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। আল্লাহতে প্রবল বিশ্বাসী রুমী, ওমর খৈয়াম, শেখ সাদী, ইবনে সিনা, হাফিজ, মনসুর হাল্লাজ সমকালীন মুসলিম ধর্মগুরুদের কাছে অপছন্দের মানুষ ছিলেন। অত্যাচারিতও হয়েছেন তারা। নির্বাসন থেকে জীবনদান– ছিল তাদের প্রত্যেকের বিধিলিপি।
খ্রিস্টের প্রতি প্রশ্নহীন ভালোবাসা সত্বেও তলস্তয়কে বহিষ্কার করেছিল চার্চ। ১৯০১ সালে চালু হওয়া নোবেল পুরস্কার তাকে দেওয়া হয়নি এই যুক্তিতে যে ‘তিনি যথেষ্ট খ্রিস্টান নন’। এই ভূমিকাটুকু করার উদ্দেশ্য এটাই জানিয়ে রাখা যে বড় লেখক বা কবি আসলে অনেক বড় চিন্তকও বটে। তাই প্রথাগত ধর্মের ব্যাখ্যা তারা কেউ বিনা প্রশ্নে মেনে নেন না। অনেক সময় নিজের চিন্তার কথা প্রকাশ করে ফেলেন। তখন অস্বস্তিতে পড়ে যান প্রচলিত ধর্মগুরু ও ব্যাখ্যাতাগণ। তাদের হাতে আছে শাস্ত্র এবং শরিয়া নামক অস্ত্র। আছে ফতোয়া নামক ব্রহ্মাস্ত্র। সেটি তারা প্রয়োগ করেন প্রথা মানতে অস্বীকার করা লেখক-চিন্তকদের বিরুদ্ধে। আমাদের ভাষায় তাদের শিকার কাজী নজরুল ইসলাম এবং বেগম রোকেয়ার মতো অনেকেই।
০২. শুধু বাংলাদেশে নয়, পৃথিবীর সব দেশে সব ভাষায় সাহিত্যের মূল ধারাটি অসাম্প্রদায়িক, মানবতাবাদী, যুক্তিবাদী, ঐতিহ্যের সাথে আধুনিকতার মেলবন্ধনে বিশ্বাসী, সকল মতের দ্বিধাহীন প্রকাশের অধিকারে বিশ্বাসী। এই ধারাটিকে আমাদের দেশের ধর্ম-প্রভাবিত লেখকরা নাম দিয়েছে সেক্যুলার সাহিত্য। তারা চেষ্টা করছে এই শব্দটিকে গালিতে পরিণত করার। চেষ্টা করছে এই ধারার বিপরীতে ধর্মাশ্রয়ী একটি সাহিত্যের ধারাকে সামনে তুলে আনার। কেউ এই ধারায় লেখালেখি করলে তাতে আপত্তি জানানোর কিছু নেই। কখনো আপত্তি তোলা হয়েছে, এমন উদাহরণ ১৯৪৭ সালের পর থেকে খুঁজে পাওয়া যাবে না। কিন্তু ধর্মাশ্রয়ী সাহিত্যের ধারাটি আজ পর্যন্ত এদেশের পাঠক-বোদ্ধা মহলে কোনো জায়গা করে নিতে পারেনি। পুরো পাকিস্তান আমলে সরকারের প্রত্যক্ষ পৃষ্ঠপোষকতা পাওয়া সত্ত্বেও, পাঠ্যপুস্তকসহ সর্বত্র জায়গা দখল করা সত্ত্বেও এই ধর্মাশ্রয়ী ধারা শেষ পর্যন্ত পরিব্যাপ্ত হতে পারেনি। দেশ ও জাতির সামনে প্রভাবক হতে পারেনি। কি কি কারণে পারেনি, সেগুলো খুঁজে বের করে দেওয়া আমাদের দায়িত্ব নয়। দায়িত্ব ঐ ধারার তাত্ত্বিকদের। আমি শুধু একটি কারণের কথা বলব। সেটি হচ্ছে তাদের সাহিত্যপ্রতিভার অভাব, ঊনতা, ঘাটতি। ১৯৪৭ এর আগ থেকে শুরু করে অদ্যাবধি তুলনামূলক আলোচনায় গেলে তাদের এই দীনতা প্রকটভাবে চোখে পড়ে।
০৩. ‘সওগাত’ এর মানের কোনো পত্রিকা কি বের করতে পেরেছেন ধর্মাশ্রয়ী তাত্ত্বিক-সংগঠকরা? ‘শিখা’ পত্রিকার যুক্তিবাদিতার ধারে-কাছে পৌঁছনোর মতো কোনো পত্রিকা? ‘সমকাল’এর মতো কোনো সাহিত্যপত্রিকা?
সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্-র কাছাকাছি মানের কোনো লেখক এসেছে ধর্মাশ্রয়ী ধারা থেকে? তারা কি উপহার দিতে পেরেছেন একজন সোমেন চন্দ? মুনীর চৌধুরী? আবুল কালাম শামসুদ্দীন? শওকত ওসমান? শওকত আলী? সৈয়দ শামসুল হক? হাসান হাফিজুর রহমান? আলাউদ্দীন আল আজাদ? হাসান আজিজুল হক? আবুবকর সিদ্দিক? জ্যোতিপ্রকাশ দত্ত? শামসুর রাহমান? শহীদ কাদরী? আখতারুজ্জামান ইলিয়াস? রিজিয়া রহমান? সেলিম আল-দীন? শহীদুল জহির? আপনারা বলবেন আল মাহমুদ-এর কথা। মনে করিয়ে দিই তিনি তার স্মরণযোগ্য সকল কবিতা-গল্প লিখেছেন সেক্যুলার কালপর্বে। এখন পর্যন্ত যারা আমাদের দেশের তরুণদের অনুসরণযোগ্য জীবিত ও সৃষ্টিশীল লেখক-কবি, তারা সকলেই কিন্তু আপনাদের গালির ভাষায় সেক্যুলার ধারার মানুষ।
ইসলামি ধারার তরুণদের দুই-একজন মূলধারায় যুক্ত হতে চেষ্টা করছেন। কিন্তু এখন পর্যন্ত পরবর্তী প্রজন্মের লেখকদের কাছে অনুসরণযোগ্য কোনো রচনা তারা লিখে উঠতে পারেননি। কেন ধর্মাশ্রয়ী ধারার লেখকদের এই পিছিয়ে থাকা, তার অনেকগুলো কারণ আমি তুলে ধরতে পারি। কিন্তু আগেই বলেছি সেগুলি খুঁজে বের করা তাদের দায়িত্ব।
আমি শুধু বলি, প্রতিভার কথা। প্রকৃতি বলুন আর আল্লাহ বলুন, সবাইকে সব কাজ করার যোগ্যতা দেন না। তবে নিরন্তর অনুশীলন আর শিল্পবোধ অর্জনের মাধ্যমে কেউ কেউ প্রতিভাবান হয়ে উঠতেও পারেন।
শিল্প-সাহিত্য ক্ষমাহীন জগৎ। সেখানে কোয়ালিটিই একমাত্র বিবেচ্য। সৃষ্টির কোয়ালিটি। রচনার কোয়ালিটি। অক্ষমের ঈর্ষা কোনো কাজে লাগে না।