ছোটবেলায় কেউ তাঁকে দেখে বলেনি, “এই ছেলেটা একদিন নোবেল জিতবে।”
রিপোর্টারের নাম
/ ২২৯
জন দেখেছে
আপডেট :
বৃহস্পতিবার, ৫ জুন, ২০২৫
শেয়ার
কেউ ভাবেনি, এই ছেলেটাই একদিন পৃথিবীর অর্থনীতির ধারা বদলে দেবে। তাঁর শৈশব ছিল খুবই সাধারণ, চট্টগ্রামের এক শান্ত গ্রামে কাটানো সাদামাটা জীবন। কিন্তু তাঁর চোখে ছিল স্বপ্ন, আর মনে ছিল এক অদ্ভুত ধরণের কৌতূহল, “কেন দারিদ্র্য মানুষকে এমন অসহায় করে ফেলে?”
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই ড. মুহাম্মদ ইউনুস যাত্রা শুরু করেন। পড়ালেখার প্রতি তাঁর ভালোবাসা তাঁকে আমেরিকায় নিয়ে যায়, যেখানে তিনি অর্থনীতি নিয়ে উচ্চতর ডিগ্রি অর্জন করেন। চাইলেই তিনি বিলাসবহুল বিদেশি জীবনে থেকে যেতে পারতেন। কিন্তু দেশপ্রেম আর দায়িত্ববোধ তাঁকে টেনে আনে বাংলাদেশে, এক যুদ্ধবিধ্বস্ত, দরিদ্র, অথচ সম্ভাবনাময় এক দেশে।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করার সময়, ইউনুস সাহেব উপলব্ধি করলেন, বইয়ের জ্ঞান দিয়ে সমাজের পরিবর্তন সম্ভব নয়, যতক্ষণ না তিনি বাস্তব জীবনের সমস্যাগুলোকে ছুঁয়ে দেখছেন। তিনি গ্রামে গ্রামে হাঁটতেন, মানুষের ঘরে ঢুকতেন, কথা বলতেন। একদিন তিনি দেখলেন, কিছু মহিলা মাত্র ৩০-৫০ টাকার জন্য সুদখোরদের কাছে নিজের শ্রম বিক্রি করে দিচ্ছে। এত পরিশ্রম করেও কিছুই থাকছে না হাতে। তিনি ভাবলেন, এই অবস্থা তো বদলাতেই হবে।
তখন তিনি করলেন এক ‘অসম্ভব’ কাজ, নিজের পকেট থেকে ৮৫ টাকা দিলেন ৪২ জন নারীকে। কেউ বাঁশের পণ্য বানালো, কেউ মুরগি পালল, কেউ চাল কিনে বিক্রি করল। এবং সবাই এক টাকাও বাকী না রেখে ফিরিয়ে দিল সেই ঋণ। এখানেই ইতিহাসের মোড় ঘুরল।
এই ঘটনা থেকেই তৈরি হলো এক দৃষ্টান্ত: গ্রামীণ ব্যাংক।এটা ছিল এমন এক ব্যাংক, যেখানে দরিদ্র, নিরক্ষর, সমাজের পিছিয়ে পড়া মানুষরাই ছিল কেন্দ্রবিন্দু। ব্যাংক মানে যেখানে সাধারণত বড়লোকেরা যায়, সেখানে ইউনুস সাহেব প্রমাণ করলেন, সবচেয়ে দরিদ্র মানুষরাও ঋণগ্রহীতা হতে পারে, সময়মতো টাকা ফেরত দিতে পারে, নিজের জীবন বদলে দিতে পারে।
এই ব্যাংক শুধু অর্থ দেয়নি, মানুষের আত্মবিশ্বাস ফিরিয়ে দিয়েছে। নারী ক্ষমতায়নের এক নতুন দিগন্ত খুলে দিয়েছে। গ্রামীণ ব্যাংকের সদস্যদের ৯৭ শতাংশই ছিল নারী, যারা আগে কখনও নিজের নামে ১০ টাকাও ধার নেননি, এখন তাঁরা নিজের ব্যবসার মালিক।
বিশ্ব হতবাক হয়ে গেল। এই মানুষটা কে? কীভাবে তিনি দারিদ্র্য মোকাবেলার এত সহজ কিন্তু কার্যকর পদ্ধতি বের করলেন?
২০০৬ সালে ড. ইউনুস ও গ্রামীণ ব্যাংক যৌথভাবে পান নোবেল শান্তি পুরস্কার। এটাই ছিল এক দেশের গরিব মানুষের গল্প, যেটা বিশ্বমঞ্চে শ্রদ্ধা পেল। তাঁর Social Business মডেল এখন পৃথিবীর নানা দেশে পড়ানো হয়, অনুসরণ করা হয়।
কিন্তু এই সাফল্যের পথটা ফুলে ফুলে ঢাকা ছিল না। অনেক বাধা এসেছে, দেশের ভেতরে রাজনীতি, অপপ্রচার, প্রতিষ্ঠানে হস্তক্ষেপ। অনেকেই তাঁর বিরুদ্ধে কথা বলেছে, তাঁর কাজকে থামাতে চেয়েছে। কিন্তু তিনি সবসময় বিশ্বাস করেছেন, যে কাজ মানুষের উপকারে আসে, সেটাকে কেউ চিরদিন আটকে রাখতে পারে না।
আজ ড. মুহাম্মদ ইউনুস শুধু একজন নোবেল বিজয়ী নন, তিনি বাংলাদেশের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (SDG) অর্জনে প্রধান উপদেষ্টা এবং পৃথিবীর নানা দেশে দারিদ্র্য দূরীকরণ, সামাজিক ব্যবসা ও উদ্ভাবনী সমাধানের পরামর্শদাতা। তাঁর কথা শুনতে আসে রাষ্ট্রপ্রধান, গবেষক, তরুণ উদ্যোক্তা থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষও।
তাঁর জীবন আমাদের একটাই জিনিস শেখায়, সমস্যা দেখেই হাত গুটিয়ে বসে থাকলে সমাজ কখনও বদলাবে না। একমাত্র কাজের মাধ্যমেই পরিবর্তন আসে। একজন মানুষও চাইলে একটা দেশ, এমনকি একটা পৃথিবী বদলে দিতে পারে, শুধু দরকার সেই বিশ্বাসটা নিজের মধ্যে জাগিয়ে তোলা।
ড. ইউনুস আমাদের দেখিয়েছেন, স্বপ্ন শুধু দেখা যায় না, স্বপ্ন বাস্তবেও রূপ দেওয়া যায়, যদি সেই স্বপ্নে কাজ জুড়ে থাকে। তাঁর জীবন আমাদের মনে করিয়ে দেয়, আমরা কেউই ছোট নই, আমাদের প্রতিটি সিদ্ধান্তই কারও জীবনে আশার আলো হতে পারে।
এই মানুষটাই আমাদের জন্য আমাদের দেশের জন্য আমাদের সবার জন্য সবচেয়ে বেশি যোগ্য একজন মানুষ।
ড. ইউনুসের জীবনের দিকে তাকাও। ভাবো, তুমি এখন যেখানেই থাকো, সেখান থেকেই তুমি শুরু করতে পারো।
তুমিও একদিন এক অনুপ্রেরণার গল্প হয়ে উঠতে পারো।