• ঢাকা, বাংলাদেশ মঙ্গলবার, ০৯ জুন ২০২৬, ০২:২০ পূর্বাহ্ন
  • [কনভাটার]

হেমামালিনী || নুর এমডি চৌধুরী

রিপোর্টারের নাম / ৯৬ জন দেখেছে
আপডেট : রবিবার, ৯ নভেম্বর, ২০২৫

মুনালিসা আজিজ শেখের স্ত্রী। দেখতে খুব সুন্দরী। হেমামালিনীর মত। সেকালে কি সুন্দরী কি অসুন্দরী পরপুরুষের সহিত কথা বলিলেই যেন জাত যাইতো। একদিন স্বামী আজিজ শেখ নিজের চোখেই যখন দেখতে পেলো স্ত্রী মুনালিসা বাঁশঝাড়ের নিচে একজন সুদর্শন যুবকের সহিত ফিসফিস করিয়া কথা কহিতেছে। তাহা দেখিয়া আজিজ শেখের মনে ভীষণ ক্ষোভের জন্ম নিলো। বেশ কিছুদিন যাবত আজিজ শেখ আর স্ত্রী মুনালিসার মাঝে মনের অমিল চলিতে থাকিলো। দিনে দিনে অমিলের তীব্রতা আরও বাড়িয়া চলিল। তাই আজিজ শেখ প্রায়ই নির্জনে বসিয়া হেমামালিনীর কথা নীরবে ভাবে।

সে অনেক আগের কথা। ষাটের দশক হবে। আজিজ শেখ তখন তরুণ যুবক। স্কুল পড়ুয়া ছাত্র। রামপাল চক্রবর্তী তখনকার গ্রামের প্রভাবশালী জমিদার। একদিন জমিদার কোন এক অপরাধের দায়ে আজিজ শেখের বাবা রইছ শেখকে দরবারে তলব করলে আজিজ শেখও বাবার সহিত জমিদারের সামনে হাজির হয়। জমিদার অপরাধের শান্তি স্বরূপ আজিজ শেখের বাবা রইছ শেখকে নিজ হাতে বেত্রাঘাত করে। এহেন অকল্পনীয় দৃশ্য দেখিবার পর আজিজ শেখের মনে ভীষণ ক্ষোভের জন্ম নেয়। সেই থেকে জমিদারের প্রতি আজিজ শেখের চরম আক্রোশ। চোখের সামনে বাবার এহেন অপমান আজিজ শেখকে প্রতিনিয়ত তাড়া করতে থাকে। মনের যন্ত্রণাগুলো কাউকে শেয়ার না করে একাকীই বহন করতে থাকে।

আজিজ শেখ ভাবতে থাকে কি করিলে জমিদারের ইজ্জতের জাত যাইবে। প্রতিটি ক্ষনেই আজিজ শেখের মনে যেন একটাই চিন্তা দানা বাঁধতে থাকে। জমিদারের অপমানের প্রতিশোধ আজিজ শেখকে যে নিতেই হবে। আজিজ শেখ সবেমাত্র দশম শ্রেণির বিজ্ঞান বিভাবের পড়ুয়া মেধাবী ছাত্ত। ভাবতে ভাবতে একসময় বুদ্ধি বের করে ফেলে। দূরের স্কুল। আজিজ শেখ যে স্কুলে পড়ে সে স্কুল টিচার কাজী শরাফত আলী ওরফে সায়েন্স স্যার। সাইন্সের টিচার বলে সবাই তাকে সায়েন্স স্যার বলে ডাকে।

সায়েন্স স্যার প্রতিদিন জমিদার বাড়ি গিয়ে জমিদারের একমাত্র কন্যা হেমামালিনীকে পড়ায়ে আসেন। বিষয়টা আজিজ শেখ উদঘাটন করে।আজিজের সহিত সায়েন্স স্যারের সম্পর্কটা ছিল আন্তরিক একদম দাদা নাতির মত নিবিড় সম্পর্ক আর সে সুবাদেই বুদ্ধি খাঁটিয়ে আজিজ শেখ একদিন অনেক প্রকার ফলমূল সাথে রসমলাই ক্ষীর সঙ্গে নিয়ে সায়েন্স স্যারের বাড়ি গিয়ে হাজির হয়। অনেক দামি দামি ফল তাও আবার পরিমাণে অনেক বেশি দেখে সায়েন্স স্যার অত্যন্ত খুশি হন।

স্যার মানুষ। স্টুডেন্টদের নিয়েই যার জীবনের বেশিটা সময় পার করা তাই খুব সহজেই আজিজ শেখের মনের মতিগতি সায়েন্স স্যার আন্দাজ করতে পারে। মনে মনেসায়েন্স স্যার ভাবে আজিজ শেখ কি মতলব যে এঁটে এসেছে। আজিজ শেখের দিকে স্যাত তাকায় মৃদু হাসি হেসে বলে, কিরে নাতি কি মতলব নিয়ে এসেছিস শুনি। আজিজ শেখও মৃদু হাসি হাসে উত্তর দেয়, কি আর মতলব নানা, ঐ যে জমিদারের মেয়ে হেমামালিনী তার সহিত আমার বিশেষ একটা পরামর্শ আছে। আপনি একটু কথা বলার সুযোগ করে দিবেন এই আর কি। প্রথমে সায়েন্স স্যার দ্বিমত পোষণ করলেও পরে আজিজ শেখের অনুনয় বিনয়ে সায়েন্স স্যার রাজি হয়।

হেমামালিনী দেখতে খুব সুন্দরী। যেমন তার গায়ের রং তেমনি দেহের গঠন। একবার চোখ পড়লে কারো কয়েকবার তাকানো ছাড়া উপায় থাকেনা। কিন্তু সকলের চোখে যে পড়বে তার কোনো কায়দাও ছিল না। চার চকিদারের তত্ত্বাবধানে পালকি করে রোজ মালিনী স্কুলে যেতো। একদিন সায়েন্স স্যার কৌশল করে হেমামালিনীকে তার গৃহে ডেকে আনেন এবং আজিজ শেখের সহিত সাক্ষাৎ করিয়ে দেন। স্যার ডেকেছে বলে কথা। মালিনীও স্কুল থেকে একাকী সায়েন্স স্যারের বাসায় গিয়ে হাজির হয়। কিন্তু মালিনীর এতটুকুও জানা ছিলোনা যে আজিজ শেখ তার কাছে আসবে এবং এতো বড় ক্ষতি তার করবে।

বসে আছে মালিনী, স্যারের একদম নির্জন কক্ষে নির্ভয়ে। হঠাৎ আজিজ শেখ রুমে প্রবেশ করে। কোন কথা নয়। সাথে সাথে মালিনীর মুখখানা বেঁধে ফেলে। হাত দু’টিও বেঁধে জোরপূর্বক ইজ্জত হরণ নরপিষাচের মত সমস্ত শরীরে জখম করে দিয়ে দ্রুত পালিয়ে যায়। মালিনী বিবস্ত্র প্রায় অচেতন হয়ে পড়ে থাকে। সায়েন্স স্যার কিছুটা সময়ের জন্য দূরে অবস্থান করছিলেন। হঠাৎ আজিজ শেখকে দৌড়ে পালানোর বিষয়টা স্যারকে ভীষণ ভাবে বিচলিত করে। স্যার দৌড়ে রুমে যান গিয়ে দেখেন মালিনীর বিবস্ত্র অবচেতন অবস্থায় পড়ে আছে।

শুধু তাই নয় সমস্ত শরীর জুড়ে তার অজস্র ক্ষতের চিহ্ন। রক্ত ঝরছে। এমন দৃশ্য দেখে সায়েন্স স্যারের মাথায় যেন বজ্রপাত হতে থাকে। প্রথমে মালিনীর বিবস্ত্রতা দূর করে পরে নাড়াচাড়া দিয়ে দেখে বেহুশ অবস্থায় আছে। সংগোপনে নিজেই তার মাথায় পানি ঢালে। জ্ঞান যখন ফিরে মালিনীর তখন দু’চোখ ভরে শুধু অশ্রু আর অশ্রু টপটপ করে ঝরছে। স্যার মালিনীর পায়ে পড়ে। কাঁদে। কান্না চোখে ক্ষমা ভিক্ষা প্রার্থনা করতে থাকে। কারণ সায়েন্স স্যার জানে এই জঘন্যতম কাজের সহায়তার শান্তি স্বরূপ তার মৃত্যুদন্ডও হতে পারে। হেমামালিনীও তা ভাল করেই জানে জমিদার বাবার শান্তির কথা। স্যারের এমন কাকুতি মিনতিতে মালিনীর মনে দয়া হয়।

একদিকে নিজের ইজ্জত, জমিদার বাবার ইজ্জত অন্যদিকে সায়েন্স স্যারের নিশ্চিত জীবন নাশের কথা ভেবে মালিনী আপন শরীরের ক্ষতগুলো ঢাকার নিমিত্তে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। স্যারকে বলে, স্যার আপনি আমার স্যার, আমার এহেন পরিস্থিতির কথা কেবল আপনি জানেন আমি জানি আর সে জানে যে আমার চরিত্রে কলঙ্কের কালিমা লেপন করে দিয়েছে। আপনার কাছে অনুরোধ থাকবে যেভাবে পারেন ওর সহিত আমার বিয়ের ব্যবস্থা করবেন। যে আমার ইজ্জত হরন করেছে আমি কেবল তার কাছেই সমর্পিত হতে চাই।

এতোক্ষণে সায়েন্স স্যার কিছুটা স্বস্থির নিঃশ্বাস এলো। দেহেতে যেন প্রাণ ফিরে পেলো। মালিনীকে উদ্দেশ্য করে বললো, আমার জ্ঞানের কসম আমি তোমার কথামত বাকী জীবন সব কাজ করে যাবো। মালিনী বলে তাই যেন হয়। বলেই ভেনিটি ব্যাগটা কাঁধে ঝুলিয়ে মালিনী ঘর থেকে বেরিয়ে পড়লো। এদিকে প্রতিদিনের মত মালিনীকে নিতে চার চৌকিদারে স্কুলে পালকি নিয়ে হাজির হয়েছে। মালিনিও কাওকে কিছু বুঝতে না দিয়ে পালকিতে আরোহণ করেছে। হাস্যোজ্জ্বল মনেই মালিনী তার শয়নকক্ষে প্রবেশ করে। মুখে সুমিষ্ট হাসি থাকলেও সমস্ত দেহে ছিল বিষাক্ত সর্প দংশনের তীব্র যন্ত্রণা। আর সেই যন্ত্রণা নিয়েই হেমামালিনী সময় কাঁটতে থাকে।

কয়েকদিন হেমামালিনী আর স্কুলে গেলোনা। গৃহে সায়েন্স স্যার নিয়মিতই পড়াতে আসলো। আগের মত আর সচ্ছল হাসিখুশি নেই কারও মনে। বিষণ্ণতার মেঘ নিয়েই সায়েন্স স্যার প্রবেশ করেন জমিদার বাড়ি। বিষয়টি কেউ উপলব্ধি করতে না পারলেও হেমামালিনী তা নিশ্চিত উপলব্ধি করতে পারে। মালিনীও যতক্ষণ স্যারের পাশে থাকে ততক্ষণ সেও মনমরা হয়ে থাকে। আগে যে টেবিলে লেখাপড়া হতো এখন সেই টেবিলভরা ঔষধ আর ঔষধ। স্যার এখন আর পাঠ্য বইয়ের শিক্ষা দেননা, শিক্ষা দেন অসুখের পরামর্শ দেন ঔষধের।

হেমামালিনীয় একদিকে শারিরীক অসুস্থতা অন্যদিকে মানসিক চাপ প্রকট আকার ধারণ করে। এমনই চাপ যে না কাউকে বলা যায় না কারও পরামর্শ নেওয়া যায়। তাই সায়েন্স স্যারের কাছে মালিনী সব শেয়ার করতে করতে এতদিনে কাছের বন্ধু হয়ে গেছে। দুজনে শলা পরামর্শ করে রোজ। কি করা যায় ভাবে। কী উপায়ে আজিজ শেখকে ফিরিয়ে আনা যায় ফন্দি আটে। মালিনীর এহেন মনের কথা যেন সায়েন্স স্যারের বুঝতে কিছুটা কষ্ট হয়। মনে মনে ভাবেন জমিদারের একমাত্র মেয়ে। তাছাড়া ধর্মের কী বিরাট ফারাক। অথচ হেমামালিনী আজিজ শেখকে বিয়ে করতে চায়। এ কি করে সম্ভব। কিন্তু হেমামালিনীর একটাই কথা তার আজিজ শেখকে চাই। তাকে শাস্থিতে ঝুলাবে নাকি বাগদত্তা বলে প্রনাম করবে এই নিয়েও সায়েন্স স্যারের নানারূপ জল্পনা কল্পনা। যতই দিন যায় সায়েন্স স্যারের উপর মালিনীর চাপ ততই বাড়তে থাকে। কোন উপায় খোঁজে পায়না স্যার। সারাক্ষণ ভাবতে থাকে আজিজ শেখকে কোথায় পাবে সে। কীভাবে পাবে। তাকে যে মালিনীর চাই-ই-চাই।

এদিকে আজিজ শেখ বাড়ি ছাড়া হয়েছে। কোথায় গিয়েছে তারও কোন হদিস নেই। মাঝে মধ্যে সায়েন্স স্যার আজিজ শেখের বাড়িতে একজন স্কুল টিচার হিসাবে খোঁজ খবর নিতে যান। তার বাবা রইছ শেখ এর সহিত শলা পরামর্শও করেন। এ গ্রাম ও গ্রাম থানা পুলিশ সবার কাছেই তথ্য নেন। নীরবে হণ্যে হয়ে খোঁজ করেন। কিন্তু কোথাও আজিজ শেখের খোঁজ মিলেনা।

আর ঐদিকে এতদিনে প্রতিশোধের আগুনে নয় হেমামালিনী যেন মনের রাজ্যে আজিজ শেখকে রাজা বানিয়ে বসেছে। কোন ক্ষোভ যেন আজ আর তাকে তাড়া করেনা। মালিনী ভাবে- কী দুঃসাহসী পুরুষ। জীবনের সঙ্গী হিসেবে এমন সাহসী পুরুষ থাকা চাই। জমিদারের কন্যা আমি তা জেনেও যে পুরুষ এতটা সাহস দেখাতে পারে সেই আমার মনের রাজ্যের রাজা হবে। শরীরের সকল ক্ষত যেন আজ স্মৃতির পসরা হয়ে দাঁড়িয়েছে মালিনীর। অনুভব করে সে সকল স্পর্শকে। স্পর্শকাতর হয়। শিহরিয়ে উঠে। পুলকিত মনে কবিতার চরণ বুনে।

“এমন স্পর্শে তুমি আনিলে গো শিহরণ আমি চকিত চয়নে খুঁজি তোমায়
তুমি যে কাঁড়িয়াছ মোর মন।”

হেমামালিনী রোজ সায়েন্স স্যারকে আকে। আগে স্যারকে খুব বেশি জব্দ করতো। এখন আব করেনা। এখন যেন অনুয়োধ অনুনয় বিনয় এর সাথে কথা বলে। মাঝে মাঝে জোশ গল্পেও দুজনে হাসিখুশি থাকে। সায়েন্স স্যারের এখন আর আগের মত ভয় কাজ করেনা। কিন্তু একটাই ভয় যদি আজিজ শেখকে কোনদিন খোজেই না পাওয়া তবে যে তার প্রাণ নাশের হুমকি হয়ে দাঁড়াবে। যতই দিন যায় হেমামালিনীর চাহিদা ততই বাড়তে থাকে। কিন্তু সায়েন্স স্যারের নিশ্চিত আশার বাণী মালিনীকে শান্ত করে রাখে দিনের পর দিন।।

এদিকে আজিজ শেখ যেদিন হেমামালিনীর ইজ্জত হরণ করিলো ঠিক সেদিনই নিরুদ্দেশ হইলো। যখন রেলস্টেশনে গিয়ে দীর্ঘ সময় ট্রেনের অপেক্ষায় রেললাইন এর উপর বসে বসে চিন্তা করছিলো। কেউ তাকে এতটুকুও স্মরণ করিয়ে দেয়নি যে এই লাইনেই ট্রেন আসছে। আজিজ শেখ গভীর চিন্তায় মগ্ন ঘটে যাওয়া ঘটনার পরিসমাপ্তির কথা। কত বড় অন্যায় কাজই না সে করলো। যার শান্তি স্বরূপ নিশ্চিত মা বাপের প্রাণ নাশের কারণ এইবে। ভাবতে ভাবতে দিশেহারা হয়ে পড়ে আজিজ শেখ।

এ আমি কি করলাম। অস্থির আজিজ শেখ। ট্রেন আসছে। হইফেল বাজছে। আজিজ শেখের কানে যেন কোন শব্দই যাচ্ছেনা। ভাবতে ভাবতে যেন সে পাথর হতে বসেছে। ট্রেন একদম নিকটবর্তী। বিষয়টি রেলওয়ে পুলিশের চোখে পড়লে তাৎক্ষণিক তাকে থাকা দিয়ে লাইন থেকে দূরে সরিয়ে দেয়। ভাগ্যক্রমে আজিজ শেখ প্রাণে বেঁচে যায়। দ্রুতগামী ট্রনণা পাশ কাঁটিয়ে চলে যায় গল্পব্যে। এমন পরিস্থিতির কারণে পুলিশ তাতে জব্দ করণে সে বিচলিত হয়ে পড়ে। উল্টাপাল্টা উত্তর দিলে পুলিশ তাকে এরেস্ট করে এবং স্টেশন এর জেলখানাতে বন্দী করে রাখে।

বেশদিন যাবর আজিজ শেখ পুলিশের মেগাজডে আছে। পুলিশ অনেক চেষ্টা করেও আজিজ শেখের মুখ থেকে কোন তথ্য বের করতে পারেনা। দিনতো অনেক হলো। এদিকে আমির শেখকে না পেরে ধান্যয় জিডি করা হয়েছে। একদিন হঠাৎ আজিজ শেখের বাধা রইছ শেখের নামে টেলিগ্রাম এলো। প্রথমে রইছ শেখ ভীষণ ভয় পেয়ে বৎলেও পরে বিষয়ট। পুরোপুরি অবগত হলে ওইহ শেখের মনটা কষ্টের মাঝে খুশিতে নেচে উঠে। ফের ভাবে এবং বিচলিত ময় এই ভেবে যে, না জানি কোন অপরাকের ছেলেকে জেলখানায় রাখা হয়েছে। পুলিশ আগামীকাল সেখা করতে বলেছে। এইয় শেখ একবার ভাবে সায়েন্স স্যারকে সঙ্গে নিয়ে যাবে। আবার আবে শত হলেও সায়েন্স স্যার অপর মানুষ। একবার সমাজে জানাজানি হয়ে গেলে যে তার আয় মান থাকবে না। তাই সে আপন চাচাতো ভাই আবেদ শেখকে সঙ্গে নিয়ে পুলিশের কাছে যায়। বাবা রইছ শেখ ও চাচা আবেদ শেখ দুজনেই থানায় মুচলেকা দিয়ে আজিজ শেখকে যুক্ত করে আনে। প্রথমে অভিজ শেখ জয়ে হোক, লজ্জায় হোক বাড়ি ফিরতে একেবারেই সম্মতি দিচ্ছিলনা ভবু তাকে জোর পূর্বক বাড়ি আনা হয়।

অনেকদিন পর আজিজ শেখ বাড়ি ফিরেছে। খবরটা যেন রীতিমত পাড়া মহল্লার থৈথৈ। সায়েন্স স্যারের কানে যখন খবরটা পৌছায় স্যার ততক্ষনাৎ হেমামালিনীর গাড়িতে গিয়ে খুশি মনে হাজির হয়। হেমামালিনীও খবরটি গুনে খুব খুশি হয় এবং সায়েন্স স্যারকে বলে, স্যার আমিও আপনার সাথে আজিজ শেখের বাড়িতে যেতে চাই। শলাপরামর্শের পর মালিনীর সেদিন আর যাওয়া হলোনা। প্রস্তুতি চললো একেবারেই ঘর ছাড়ার। অলংকার দামী দাবি গয়না এমনভাবে নিলো যেন সারা জীবন কষ্ট করতে না হয়।

সায়েন্স স্যার খুব কৌতুহলে নিয়ে যখন আজিজ শেখের বাড়িতে গিয়ে পৌঁছিল দেখলো, সবার চোখ বেঁয়ে পানি করছে। অন্য মনস্কে সাইন্স স্যার হজিজ্ঞেস করে, কি হয়েছে বাপু। কান্নার কারণ জানতে চাইলে উত্তরটা আসে যা সায়েন্স স্যার ফের দশ হাত মাটির নিচে নিমজ্জিত করে। কি হয়েছে, কি হয়েছে? যেন সকলের মুখে বলাবলি কি আর হবে আভিজ্ঞ শেখ যে ফের পালিয়েছে।

কেটে গেছে অনেক বছর। একদিন অকস্মাৎ আজিজ শেষ তার বিয়ে করা বউ মুনালিসাকে সঙ্গে নিয়ে বাড়ি আসে। এখন পুরনে মুখগুণ্যে যথারীতি পরলোকে গমন করেছে। বাবা রইছ শেষ বেঁচে নেই, মা রাবেয়া শেখ দেও মারা গেছে। খবরটা আজিজ শেখকে ইতিমতো নাড়া দিয়ে বসে। মনে পড়ে তার সায়েন্স ব্যারের কথা। হেমামালিনীর কথা। সেদিন সকল ভয় ভীতিকে দূরে ঠেলে দিয়ে আজিজ শেখ গভীর রজনীতে সায়েন্স স্যারের বাড়িতে গিয়ে হাজির হয়। সায়েন্স স্যারও তখন শয্যাশায়ী। যেন কোন রাগ নেই তায়, কোন ক্ষোভ নেই, নেই জোন অভিমান অভিযোগ। সায়েন্স স্যার আজিজ শেখকে কাছে পেয়ে দীর্ঘ দিনের জমানো সকল কষ্ট কথা বলে দেয়।

আজিজ শেখও মনের অজান্তে দু’চোখে জল ঝরতে থাকে। আপন ভুলের প্রায়শ্চিত্তের প্রয়াসে আজিজ শেখ জমিদার বাড়ি উঠানে গিয়ে হাজির হয়। জনশূন্য জমিদার বাড়ি। কোথাও কেউ নেই। কিছুক্ষণ পর একজন দারোয়ান গেট খুলে বাহিরে এলে আজিজ শেখ জানতে চায় হেমামালিনীর কথা। যখন জানে হেমামালিনী আর ইহধামে বেঁচে নেই। কি এক অমানসিক যন্ত্রণায় নিজেকে তিলে তিলে ভুগাতে ভুগাতে বিষপানে একদিন গভীর রজনীতে নিজের জীবনকে আত্মহুতি দিয়েছে।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরও সংবাদ