পবিত্র রমজান শুরু হবার মাত্র একদিন আগে বইটা হাতে এলো। ঈদের পর পড়ার জন্য বেশকিছু বই পরপর সাজিয়ে রাখি, প্রতিদিনই যোগ হয় নতুন কিছু। পরপর দুটি কবিতা গ্রন্থ পাঠ শেষ হতেই মালতিনগরের রাখালি বাঁশির মায়াবী সুর দূর থেকে কানে আসে।
বইটি বের করার জন্য হাত বাড়াতেই চোখ পরে বইটি নেই। আতিপাতি করে খুঁজতে থাকি, নেই তো নেইই। ঘাম ছুটে যায় তবুও বইটি দেখা নেই। খুঁজতে খুঁজতে হয়রান হয়ে অন্য বই বের করার জন্য টান দিতেই ঝুপ করে বের হয়ে হাসতে থাকে।
এককাপ গরম চা তৈরি করে বইটার পৃষ্ঠা উল্টাতেই উৎসগে চোখ আঁটকে থাকে।”পৃথিবীতে শেষদিন পর্যন্ত যাঁরা মালতিনগরের মাটিতে বিচরণ আবাস বৃক্ষবন্দনা ফুল ফল ফসলের গান গাইবেন, সবার জন্য- হে আমার সতীর্থ মালতীনগরবাসী
প্রিয়জনেষু,
প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম
গাহি মানবতার গান
সাম্যের নিশান ওড়াই ”
উৎসর্গের দীর্ঘ সুবর্ণ রেখার সন্ধানে পৃষ্ঠা উল্টাই
মালতীনগর ১
“উপরে তাকালে একটা আকাশ দেখি
কখনো নীল কখনো গোলাপি
কতটুকু দেখি ঐ আকাশ
এ যে নীচে বয়ে যায় কৈশোরের করতোয়া
ঢেউগুলো গুণে রেখে দিয়েছি
নীল পাঞ্জাবির পকেটে
যে বটগাছটা হুড়মুড় করে
করতোয়ার পাড় থেকে
একদিন শেকড় ছিঁড়ে আছড়ে পড়লো জমিনে
অবাক হয়ে দেখছি তার বিলয়
কতো পাখির বাসা সেদিন হয়েছে বিলীন
চাঁনমারী ঘাট আর লালো মাঝি হয়ে যায়
স্মৃতির হার্ডডিস্কে লুকিয়ে থাকা সোনালী অতীত
২৫ লাইনের কবিতার প্রতিটি শব্দে লেখকের শৈশব কৈশোরের স্মৃতির মালতিনগর আত্মার আঁকা মানুষেরা লেপ্টে আছে। বালকবেলা করতোয়া কদম গাছ সাইকেলের টায়ার লেইস ফিতাওয়ালা ঘুড়ি ওড়ানো বিকেল শাহজাহানের বাঁশির সুর সোনালি অতীতে কান পেতে শৈশবের ছবি আঁকতে থাকে, চুম্বক পাতে পাঠকের লৌহ কঠিন মনোযোগ টানতে থাকে অন্যপাতায়।
মালতীনগর ২
“ভোরের রোদ গায়ে মেখে
দৌড়াই স্কুলের পথে
প্রথম বেঞ্চে বসার ঘোরে
সারারাত ছটফট করতাম
একটা সকালের জন্য “
মালতিনগর ৩
“যে পথ মাড়িয়ে স্কুলে যেতাম
কালো সানগ্লাসে একদিন ঢেকে গেল সে পথ
সুপারি কাটার শরতায় রাস্তাটা দুভাগ হয়ে গেল
লাল পতাকায় মানুষ মানুষ বলে আওয়াজ হলো ”
রাস্তা ভাগ হয়ে যায় সমাজতন্ত্র আর পুজিবাদ, কৃষ্ণচূড়া সরষের তেল ধানি জমিতে লাগে পুজিবাদের আঁচড়। “
উডবার্ন লাইব্রেরির বারান্দায় জেগে থাকে সমাজতন্ত্র। আম্মাট কুরুশ- কাটায় সোয়েটারে সহজ সারল্যে জেগে মূল্যবোধ। পিঠ বাঁকা করে দেয় পুঁজিবাদের বিস্তার তবুও টান টান মেরুদণ্ড সমাজতন্ত্রের মানুষের মিছিল সাতমাথায় গিয়ে মেশে। সাতমাথায় কি থাকে আলো দ্রোহ প্রেম নাকি অপ্রকাশিত শুদ্ধ কিছু। নাকি কবিতার মিছিল।
মালতিনগর ৫
২৭ লাইনের কবিতার অক্ষর অক্ষরে পারিবারিক বন্ধন কৈশোরে অবুঝ বোধের খোলস খুলে বোধের ঝিলিক। মাছ বাজার দেশের বড় সবজিবাজার। বাজারের দরদাম আর পিতার ম্যাড়ম্যাড়ে পকেট, তবুও
“বাবা মানেই পাঞ্জাবির পকেটে
বেদনা লুকিয়ে রাখা/সেলাই করা চটি পায়ে
একজন আলেকজান্ডার”
মালতীনগর ৭
“‘আনসার ক্যাম্পের মাঠে খুঁজতাম চাঁদের সিঁড়ি
সন্ধ্যার আগে করতোয়ার জল সাঁতরে ফিরে যায়
নাটাইপাড়ার কোনো গৃহস্থের হাঁস সমাজ
যেখানে পুঁজিবাদের অপেক্ষায় শীতঋতু ”
ভেষজ পুদিনা রস আর মধুর দ্রবণ
বালিকার হাত ধরে ঘুড়ি ওড়ানো
শেখানোর মতো নতুন স্বপ্নরা ডানা মেলে, বেলীফুলের সৌরভ আর
বালিকার দুবেনী বেয়ে নামে নতুন সময়।
মালতিনগর ৯
” ইতিহাসের পাতায় ডুবে রাতের তারা মিছিলে
সিপাহি বিদ্রোহের ঘোড়ার আওয়াজ ভেসে আসে
নিশুতিরাতে করতোয়ার জল ডিঙিয়ে
দক্ষিণের জানালায় দেখি
শ্মাশানে পুড়ছে দেহ
অসংখ্য জোকাক জ্বলে জ্বীনের ডানায়
দেশ ডুবে যায় বন্যায় “
৮৮ র বন্যার ভয়াবহ চিত্র, মানুষের মরদেহ ভাসছে জলে কাফনবিহীন দাফন হচ্ছে। স্কুলের বারান্দায় বানভাসি মানুষের আস্তানা “করতোয়ায় পুরুষ গর্জন ” উপমাটি যথার্থ। শেষ লাইনটা মালতীনগর বগুড়ার জন্য যথাযথ লাইন
” আমাদের ভেলা ভেসে যায় বেহুলার পুটলিতে “
মালতিনগর ১৪
” অন্ধকারে নিজস্ব আলো আছে
ভোরের আজানে সেই আলো শরীরে মেখে দেখি
মালতীনগরের আকাশ গোলাপি পাল তুলেছে ”
নিবিড় সত্য দর্শন অন্ধকারের ভেতর থেকে আলো ছিনিয়ে সূর্য।
মালতীনগর ১৯
” সভ্যতার পাকা সড়কে জনস্রোতের বেলুন ওড়ে
মানুষ চায় ফসলের সুষম বন্টন ”
বৈষম্যবিহীন সমাজ বিনির্মাণের আত্মা নিংড়ে রসের নির্যাশ ছেঁকে নিলে মানুষ চায় ফসলের সুষম বন্টন এটাই মূল কথা। প্রায় সকল ধর্মের অন্তর্নিহিত শক্তিশালী বাক্যও এটা।
মালতিনগর ২০
” সবুজ অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করে জীবন সবুজাভ হয়
এলোমেলো পা ফেলে মাটির মায়া বুকে নিয়ে
তোমার জন্য পথে বেরিয়েছি তুমি কি জানতে?
যখন রাতের চাদর জড়িয়ে শহর ঘুমায়
চাঁদকে সাথে নিয়ে হেঁটে যাই সাতমাথায়
পৃথিবী জয়ের নেশায় স্রোতের মতো
আজনবী হয়ে প্রবেশ কবি
রাজধানীর প্রধান মঞ্চে
ঝড় তুলে জাগিয়ে দেই শাহবাগ
শতাব্দীর শেষ অস্তমিত সূর্য
তুলে আনি আকাশ থেকে
সযতনে রেখে দেই মায়ের দেয়া টিনের বাক্সে
অন্ধকার সাঁতরে আলোর সানাই বাজাই
কবিতার অক্ষর অক্ষরে আমার বিদ্রোহ “
এই স্পর্ধিত শব্দ সৌরভের গৌরবে শেষ করেছে কবি গ্রন্থের কবিতা। মালতীনগর করতোয়া আনসারক্যাম্প বকশিবাজার গ্রাম ফসলের সম্ভবনার নধর কোমল সবুজ ক্ষেত নদী বিগলিত স্নেহময় প্রেম বাতাস অবিনাশী ঘাস মায়ের টিনের বাক্স প্রাচীন বৃক্ষের ছায়া নিয়ে বালক কিশোরের সবুজ ছোঁয়া সম্বল করে স্পর্ধিত তারুণ্যের
প্রেম দ্রোহের অক্ষরে অক্ষরে বিপ্লব আর বিদ্রোহ। মোট ২০টি কবিতা সংযুক্ত আছে বইটিতে, কবিতাগুলো শুধু বগুড়া জেলার ছায়ামায়ার গ্রাম মালতীনগরের নয়, কবিরও নয়।
কবিতাগুলোর প্রতিটা অক্ষরে যে গ্রামের ছবি মানুষের অবয়ব প্রকৃতির বর্ণনা সব হয়ে গেছে বাংলাদেশের ৬৮হাজার গ্রামের ৬৮ হাজার গ্রামের মানুষের, যাদের হৃদয়ের সযতনে অতলে বাস করে শৈশব কৈশোরের হিরন্ময় সময়। লালন করে মূল্যবোধ প্রেম দ্রোহ বিপ্লব। ৪৯ পাতার বইখানি অমিত প্রাণপ্রাচুর্যে ভরপুর। সুবর্ণ রেখায় এগিয়ে যায় বহুদূর।দ্বিভাষীক গ্রন্থ এটা। বাংলা কবিতার চমৎকার অনুবাদ করেছেন সুস্মিতা ঘোষাল।
গ্রন্থটি পুরো পড়ে মনে হলো ভেতরের রস নিংড়ে পান করতে হলে আরো একবার পড়তে হবে । মালতীনগর আমার গ্রাম আমার শৈশব কৈশোর আমার রাখাল বাঁশিওয়ালা যাকে খুঁজছি ৫৫ বছর ধরে বর্ষায় নৌকা ছুটিয়ে মাছ ধরা দেখা, পিতাকে সম্রাট কখনো হিমালয় ভেবে পার করা সময় ফুলেল সৌরভ ফসলে সম্ভার দুরন্ত তারুণ স্পর্ধিত যৌবনের সব যেন আমার, মালতীনগর বিশ্বগ্রাম। শেষ হলেও রেশ রয়ে যায় ভাবনায়। বইটির বহুল প্রচার কামনা করি। Toufiq Zohur শুভ জন্মদিন