অর্থনীতির সংকটময় এ সময়েও প্রবৃদ্ধির দুর্বার আকাঙ্ক্ষা পূরণ থেকে পিছপা হতে চান না প্রথমবার বাজেট দিতে আসা অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী; ধারার ব্পিরীতে উচ্চহারের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) লক্ষ্যমাত্রাই তিনি ধরেছেন।
চড়া মূল্যস্ফীতি, বিনিয়োগে খরা, সরকারি ব্যয়ে ধীরগতি, বিদেশি ঋণে দূরাবস্থা আর রাজস্ব ঘাটতি নিয়ে সামষ্টিক অর্থনীতি যখন বেশ চাপের মুখে তখনও তিনি আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ৬ দশমিক ৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধির প্রত্যাশা করছেন।
শেষ হতে যাওয়া ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রাক্কলিত জিডিপি প্রবৃদ্ধির চেয়ে তা ২ দশমিক ৩৬ শতাংশীয় পয়েন্ট বেশি।
সাময়িক হিসাবে চলতি অর্থবছরে আগের বছরের চেয়ে বাংলাদেশের অর্থনীতি ৪ দশমিক ১৪ শতাংশ হারে বেড়েছে। বুধবারই বিবিএস এ হিসাব প্রকাশ করে।
বৃহস্পতিবার ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য সংসদে বাজেট প্রস্তাব উপস্থাপনের সময় অর্থমন্ত্রীর ধরা লক্ষ্যমাত্রা চলতি অর্থবছরের লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ১ শতাংশীয় পয়েন্ট বেশি।
চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেটে ৫ দশমিক ৫ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ধরেছিল অন্তর্বর্তী সরকার।
প্রস্তাবিত ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেটে জিডিপি ধরা হয়েছে ৬৮ লাখ ৩০ হাজার ২৪ কোটি টাকা। শেষ হতে যাওয়া অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে এর আকার দাঁড়িয়েছে ৬০ লাখ ৮০ হাজার ৩২০ কোটি টাকা।
তবে বুধবার বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) জিডিপির সাময়িক যে হিসাব দিয়েছে, তাতে জিডিপির আকার ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ৬১ লাখ ২০ হাজার ২০৯ কোটি টাকার কথা বলা হয়েছে। প্রথমবারের মত অর্ধ ট্রিলিয়ন ছাড়িয়েছে বাংলাদেশের জিডিপির আকার।
বিবিএসের সাময়িক হিসাবে ৩০ জুন শেষ হতে চলা ২০২৫-২৬ অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৪ দশমিক ১৪ শতাংশ।
২০২৪-২৫ অর্থবছরের চূড়ান্ত হিসাবে ৩ দশমিক ৪৯ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছিল দেশে। ওই আর্থিক বছরে ক্ষমতায় ছিল আওয়ামী লীগ সরকার। তখনকার অর্থমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী ৬ দশমিক ৭৫ শতাংশ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য ধরেছিলেন।
ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে চব্বিশের অগাস্টে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটে। দুমাস ধরে চলা সেই আন্দোলন আর সহিংসতায় দেশের অর্থনীতি বড় ধাক্কা খায়।
মুহাম্মদ ইউনূস নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য ৫ দশমিক ২৫ শতাংশে নামিয়ে আনা হয়। কিন্তু সেই লক্ষ্যের চেয়েও ১ দশমিক ৭৬ শতাংশীয় পয়েন্ট কম প্রবৃদ্ধি ওই অর্থবছরে।
আগে আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে জিডিপি প্রবৃদ্ধির উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য ধরা হত। তবে অনেক অর্থনীতিবিদের মত বর্তমান সরকারেরও অভিযোগ, সে সময় তথ্য-উপাত্ত-পরিসংখ্যান নিয়ে কারসাজি হত। জিডিপি প্রবৃদ্ধির তথ্য দেখানো হত ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে।
তবে অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদ, যিনি ২০০৫-২০০৯ সময়ে বিএনপি ও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের দায়িত্ব পালন করেন, তিনি সেই ধারা থেকে বেরিয়ে আসার কথা বলেছিলেন।
অর্থনীতিবিদদের অনেকে প্রবৃদ্ধির হারকে অর্থনীতির গতিশীলতা হিসেবে মানলেও টেকসই উন্নয়নের সূচক হিসেবে মানতে নারাজ। তারপরও অর্থনীতির এই প্রপঞ্চটি বাংলাদেশের রাজনীতিতে বারবার আলোচনায় এসেছে।
বাংলাদেশের ইতিহাসে ২০১৮-১৯ অর্থবছরে রেকর্ড ৮ দশমিক ১৫ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধি হয়েছিল। এরপর আসে কোভিড মহামারী। তার মধ্যেও ২০১৯-২০২০ অর্থবছরে ৮ দশমিক ২ শতাংশ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য ধরেছিল তখনকার আওয়ামী লীগ সরকার। কিন্তু অর্জিত হয় ৩ দশমিক ৪৫ শতাংশ, যা তিন দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন।
বাংলাদেশ ইকোনোমিক রিভিউয়ের তথ্য অনুসারে, ১৯৯০-৯১ অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ছিল এর চেয়ে কম, তিন দশমিক ২৪ শতাংশ।
মহামারীর ধাক্কা সামলে ২০২০-২০২১ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধির হার বেড়ে দাঁড়ায় ৬ দশমিক ৯৪ শতাংশে। দুঃসময় কাটিয়ে ২০২১-২২ অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধি বেড়ে হয় ৭ দশমিক ১০ শতাংশ।
এরপর ২০২২-২৩ অর্থ বছরে অর্থনীতির আকার ৭ দশমিক ৫০ শতাংশ বাড়ানোর লক্ষ্য ধরেছিলেন তখনকার অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তাফা কামাল। পরে তা সংশোধন করে ৬ দশমিক ৫০ শতাংশে নামানো হলেও তা আর অর্জন হয়নি।
বিবিএসের হিসাব অনুযায়ী, ওই অর্থবছর শেষে স্থির মূল্যে জিডিপি বেড়েছে ৫ দশমিক ৭৮ শতাংশ।
মহামারীর মধ্যে বাংলাদেশে বিনিয়োগ কমে গিয়েছিল, সেটা যখন ঘুরে দাঁড়ানো শুরু করল তখনই শুরু হল ইউক্রেইন-রাশিয়া যুদ্ধ। সেই যুদ্ধ পুরো বিশ্বকে ফের টালমাটাল করে দেয়, আবার অনিশ্চয়তার কবলে পড়ে অর্থনীতি।
বিশ্বের সব দেশকেই কমবেশি এর জের টানতে হয়। আন্তর্জাতিক বাজারে খাদ্যসহ বিভিন্ন পণ্যের দাম বেড়ে যায়, চড়ে যায় ডলারের বিনিময় হার। তাতে পণ্যের উৎপাদন খরচও বাড়ে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধি কমে হয় ৪ দশমিক ২২ শতাংশ।
তারপরও ২০২৪-২৫ অর্থবছরের বাজেটে ৬ দশমিক ৭৫ শতাংশ শতাংশ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য ধরেছিল বিগত আওয়ামী লীগ সরকার। কিন্তু অর্জনের খাতায় যোগ হয় ৩ দশমিক ৪৯ শতাংশ।
এবার প্রবৃদ্ধি কমবে, এমন পূর্বাভাস আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো আগেই দিয়েছিল। বিশ্ব ব্যাংক বলেছিল, এ অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৯ শতাংশ হতে পারে। আর আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) পূর্বাভাস ছিল ৪ দশমিক ৭ শতাংশ। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) ৪ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস দিয়েছিল।
ইরান যুদ্ধের কারণে বাংলাদেশসহ এশিয়ার দেশগুলো ভুগছে। জ্বালানিসংকট প্রকট হয়েছে। এসব কারণে প্রবৃদ্ধি কমে যেতে পার বলে পূর্বাভাস দিয়েছিল বিশ্ব ব্যাংক ও এডিবির মতে সংস্থাগুলো। নতুন অর্থবছরেও এর প্রভাব থাকবে। তবুও নতুন অর্থমন্ত্রী প্রবৃদ্ধির উচ্চাশা বাদ দেননি।
আমির খসরু তার বাজেট বক্তৃতায় বলেন, “একটি শক্তিশালী ও সমৃদ্ধ অর্থনীতির ভিত্তি গড়ে ওঠে দেশের প্রতিটি নাগরিকের সৃজনশীলতা, শ্রম, দক্ষতা ও উৎপাদনশীল সক্ষমতার ওপর। সে কারণে, বর্তমান সরকার অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনৈতিক রূপান্তরের পথে যাত্রা শুরু করেছে। ফলে, উন্নয়নের সুফল সমাজের সকল স্তরের মানুষের কাছে পৌঁছে যাবে।
“এ লক্ষ্যকে সামনে রেখে দেশের অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা অর্জন, পুনর্গঠন ও বিনিয়োগ নির্ভর প্রবৃদ্ধির পথে এগিয়ে নিতে মধ্যমেয়াদি কৌশলগত কাঠামো প্রণয়ন করেছি।”
তিনি বলেন, “এই কাঠামোর আওতায় ২০৩০-৩১ অর্থবছরের মধ্যে আমরা দেশের প্রকৃত জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৮.৫ শতাংশে উন্নীত করতে, মূল্যস্ফীতি ৫ শতাংশে নামিয়ে আনতে, প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগের পরিমাণ জিডিপির ২.৭ শতাংশে উন্নীত করতে এবং মোট বিনিয়োগকে জিডিপির ৪০ শতাংশে উন্নীত করতে চাই।”
অর্থনীতিতে গতি সঞ্চারের লক্ষ্যে সরকার এই পরিকল্পনা তিনটি ধাপে বাস্তবায়ন করতে চায় জানিয়ে আমির খসরু বলেন, একে তারা 3R (Recovery & Stabilization,
Restoration and Reconstruction for Acceleration Strategy) কৌশল হিসেবে বিবেচনা করছেন।
“আমাদের পরিকল্পনার প্রথম ধাপ- অর্থনীতির পুনরুদ্ধার কার্যক্রম, যা এক বছর মেয়াদি। দ্বিতীয় ধাপ- অর্থনীতির উত্তরণ, যা বর্তমান সরকারের এক থেকে তিন বছর মেয়াদের মধ্যে সম্পন্ন হবে। তৃতীয় ধাপ- সমৃদ্ধ অর্থনীতি বিনির্মাণ, যা আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে সম্পন্ন করা হবে।”