• ঢাকা, বাংলাদেশ রবিবার, ০২ অগাস্ট ২০২৬, ০৩:২৬ পূর্বাহ্ন
  • [কনভাটার]
শিরোনাম:

নন্দিত কথাসাহিত্যিক “সেলিনা হোসেন “

হারুন অর-রশীদ খান / ১৪৮ জন দেখেছে
আপডেট : মঙ্গলবার, ১৬ জুন, ২০২৬

বাংলা ভাষার অসামান্য কথাশিল্পী সেলিনা হোসেনের জন্মদিন আজ। ১৯৪৭ সালের ১৪ জুন তিনি রাজশাহী জেলায় জন্মগ্রহণ করেন। তার পৈতৃক নিবাস লক্ষ্মীপুর জেলার হাজিরপাড়া গ্রামে। পিতা এ.কে. মোশারফ হোসেন, মা মরিয়ম-উন-নিসা। তাঁর শৈশব ও কৈশোর কেটেছে করতোয়া ও পদ্মাবিধৌত নদী-অববাহিকা রাজশাহী শহরে। দুই নদীর মাতোয়ারা স্রোত তাঁকে উদার বানিয়েছে। জীবন শিখিয়েছে।

রাজশাহীর বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে অধ্যয়ন শেষে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে স্নাতক সম্মান ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নের সময় সাহিত্যে প্রবল আগ্রহের পাশাপাশি প্রগতিশীল রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত হন। জীবনের নানা মাত্রায় তিনি অনুধাবন করেছেন সমাজ, রাষ্ট্র ও পরিবেশকে।

বলা যায় ষাটের দশকের মধ্যভাগে, রাজশাহী মহিলা কলেজে পড়ার সময় সেলিনা হোসেনের লেখালেখির শুরু। ১৯৬৯ সালে তাঁর প্রথম গল্পগ্রন্থ ‘উৎস থেকে নিরন্তর’ প্রকাশিত হয়। এবছরই ছোটগল্প বিষয়ে প্রবন্ধ রচনার জন্য তিনি ড. এনামুল হক স্বর্ণপদক লাভ করেন। সেলিনা হোসেনের দুটি গ্রন্থ ‘পোকামাকড়ের ঘরবসতি’ ও ‘হাঙর নদী গ্রেনেড’ নিয়ে চলচ্চিত্র এবং কয়েকটি গল্প নিয়ে নাটক নির্মিত হয়েছে।

সেলিনা হোসেনের প্রকাশিত গ্রন্থের মধ্যে চল্লিশটি উপন্যাস, সাতটি গল্পগ্রন্থ এবং চারটি প্রবন্ধগ্রন্থ। তাঁর রচনা দুই বাংলার সীমানা ছাড়িয়ে বিশ্বের দরবারে উজ্জ্বল আলো ছড়িয়েছে। তাঁর গ্রন্থসমূহ ইংরেজি, ফরাসি, জাপানি, কোরিয়ান, ফিনিস, আরবি, মালয়ালম, স্প্যানিশ, রুশ, মালেসহ বিভিন্ন ভাষায় অনূদিত হয়েছে। সমাজ জীবনের আনন্দ-বেদনার বহুমাত্রিক উপস্থাপনের মধ্য দিয়ে তিনি তার জীবনব্যাপী সাহিত্য সাধনায় সমৃদ্ধ করেছেন বাংলা ভাষা এবং বাঙালির ঐতিহ্যের কথারূপকে।

পশ্চিমবঙ্গের রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে তার ‘যাপিত জীবন’ ও যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘নিরন্তর ঘণ্টাধ্বনি’ উপন্যাসটি পাঠ্যসূচিভুক্ত। শিলচরে আসাম বিশ্ববিদ্যালয়ে তার পাঁচটি উপন্যাস এমফিল গবেষণাভুক্ত। ২০০৫ সাল থেকে শিকাগোর ওকটন কলেজের সাহিত্য বিভাগে দক্ষিণ এশিয়ার সাহিত্য কোর্সে তার ‘হাঙর নদী গ্রেনেড’ উপন্যাসটি পাঠ্যসূচিভুক্ত হয়।

সাহিত্যের বিভিন্ন শাখায় অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি বাংলা একাডেমি পুরস্কার, একুশে পদক, রবীন্দ্র মেমোরিয়াল অ্যাওয়ার্ডসহ দেশি-বিদেশি বিভিন্ন পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন। তিনি রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সম্মানসূচক ডি.লিট প্রাপ্ত হয়েছেন।

সেলিনা হোসেনের কর্মজীবন শুরু বাংলা একাডেমিতে গবেষণা সহকারী হিসেবে। তিনি বাংলা একাডেমির ‘অভিধান প্রকল্প’, ‘বিজ্ঞান বিশ্বকোষ প্রকল্প’, ‘বিখ্যাত লেখকদের রচনাবলি প্রকাশ’, ‘লেখক অভিধান’, ‘চরিতাভিধান’ এবং ‘একশত এক সিরিজ’-এর গ্রন্থগুলো প্রকাশনার দায়িত্ব পালন করেন। ২০ বছরের বেশি সময় তিনি ‘ধান শালিকের দেশ’ পত্রিকা সম্পাদনা করেন। কথাসাহিত্যিক সেলিনা হোসেন ১৯৯৭ সালে বাংলা একাডেমির প্রথম নারী পরিচালক হন। ২০০৪ সালে বাংলা একাডেমি থেকে অবসর নেন। পরবর্তীতে ২০২২ সালে তিনি বাংলা একাডেমির সভাপতি পদে যোগদান করেন। শিশু একাডেমির চেয়ারম্যান পদেও ছিলেন তিনি।

তাঁর লেখা সম্পর্কে অধ্যাপক বিশ্বজিৎ ঘোষ লিখেছেন– ‘ইতিহাসের গভীরে সন্ধানী আলো ফেলে ঔপন্যাসিক প্রতিবেদন সৃষ্টিতে তাঁর সৃষ্টি কিংবদন্তিতুল্য। বস্তুত: ইতিহাসের আধারেই তিনি সন্ধান করেন বর্তমানকে। সমকালীন জীবন ও সংগ্রামকে সাহিত্যের শব্দস্রোতে ধারণ করাই সেলিনা হোসেনের শিল্প অভিযাত্রার মূল লক্ষ্য। এক্ষেত্রে শ্রেণিসংগ্রামের চেতনা প্রায়শই স্থান পায় তাঁর ঔপন্যাসিক বয়ানে, তাঁর শিল্প আখ্যানে। কেবল শ্রেণিচেতনা নয়, ঐতিহ্যস্মরণও তাঁর কথাসাহিত্যের একটি সাধারণ লক্ষণ।’

সেলিনা হোসেন আপাদমস্তক কথাসাহিত্যিক। উপন্যাসে তিনি ব্যবহার করেছেন ঐতিহাসিক উপাদান। এসব ঐতিহাসিক উপাদান নিয়ে তিনি সমকালীন বাস্তবতার নিরিখে সাহিত্য নির্মাণ করেছেন। ইতিহাসকে ভেঙে নতুন সাহিত্য সৃষ্টির ধারায় রেখেছেন উজ্জ্বল প্রতিভার স্বাক্ষর। তিনি স্বদেশ ও স্বজাতির ঐতিহ্যের প্রতি দৃঢ়। কোনো অবস্থাতেই তিনি নিজস্ব ঐতিহ্যকে, নিজস্ব উত্তরাধিকারকে, মুক্তিকামী বাঙালির সংগ্রামকে ছোট করে দেখেননি। তাঁর রচনায় মুক্তিকামী মানুষ উত্তরাধিকার খুঁজে পেয়েছে নির্ভাবনায়, উচ্চতায়।

তাঁর রচনায় স্বাধীন ভূখন্ড, স্বায়ত্তশাসিত-বৈষম্যহীন সমাজ ও জাতীয় আন্দোলনের গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়গুলো উন্মোচিত হয় সাবলীল সংগ্রামমুখর আকাঙক্ষায়। তিনি ইতিহাসকে সমকালীন ভাবনার সঙ্গে একত্রিত করে নির্মাণ করেছেন সমকালের জীবনালেখ্য। ইতিহাস ও শিল্পের রসায়নে বাংলা উপন্যাসে তিনি এক স্বতন্ত্র অধ্যায়ের সৃষ্টি করেছেন। তাঁর উপন্যাস পাঠ করলে বিস্মৃত হতে হয় কোনটা ইতিহাস আর কোনটা কল্পনা।

সেলিনা হোসেন সাহিত্যিক হিসেবে কখনো নিজের সামাজিক দায়বদ্ধতাকে উপেক্ষা করেননি। তাই আমরা তাঁর রচনায় সামাজিক অঙ্গীকার, পরিবর্তনের দায়বদ্ধতা, প্রগতিশীল মানসিকতা এবং শিল্পের সহনশীলতা, নারীর ব্যক্তিত্বের গভীর স্বাধীনতা উপভোগ করি নান্দনিকতায়। তাঁর শৈল্পিক চেতনায় সবসময় ইতিহাসের দায়বদ্ধতা জড়িয়ে থাকে।

১৯৯৮ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর তাঁর দ্বিতীয় সন্তান প্রশিক্ষণরত বৈমানিক ফারিয়া লারার বিমান দুর্ঘটনায় মারা যাবার পর সেলিনা হোসেন শোকে মুহ্যমান হয়ে গিয়েছিলেন। সেই শোকের পাথর ভেঙে শক্তিতে রূপান্তর করেছেন তিনি। সৃজনশীলতা আর সৃষ্টিশীলতার উর্বর জমি চষে সাহিত্যের সোনালি ফসল ফলাতে আজও তৎপর রয়েছেন। অবিরাম লিখে চলা ও সামাজিক কর্মকাণ্ডের মধ্যে ডুবে থাকা সেলিনা হোসেন শিল্প সাহিত্যকর্মের মধ্য দিয়ে সংস্কৃতির ভূমিকাটাকে যেভাবে তুলে ধরেছেন; তা আমাদের কাছে অনন্য হয়েই থাকবে। তিনি প্রতিনিয়ত আমাদের ভাবনার সীমারেখা ঘুচিয়ে দিচ্ছেন।

আমাদের প্রিয় স্বদেশ রক্তস্নাত এই বাংলাদেশে নানান বৈরী সময়ে চেতনা আর মূল্যবোধ সঙ্গী করেই তিনি হেঁটে চলেছেন বীরদর্পে। অন্ধকারের বিরুদ্ধে তাঁর যে লড়াই তা আমাদের অন্য রকম প্রেরণা জোগায়। তিনি সত্তুর বছরের বেশী বয়সেও মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছেন সহিষ্ণু বক্ষের মতো আমাদের ছায়া দিয়ে।

মুক্তিযুদ্ধ-উত্তর বাংলা কথাসাহিত্যের অন্যতম পথিকৃৎ মমতাময়ী সেলিনা হোসেনের জন্মদিনে গভীর ভালোবাসা, শুভকামনা আর শ্রদ্ধা জানাই।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরও সংবাদ

Archive Calendar

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
 
১০১১১২১৩১৪১৫১৬
১৭১৮১৯২০২১২২২৩
২৪২৫২৬২৭২৮২৯৩০
৩১