• ঢাকা, বাংলাদেশ রবিবার, ১৬ অগাস্ট ২০২৬, ০৩:৩৪ অপরাহ্ন
  • [কনভাটার]

মাদারগঞ্জ নৌকা বাইচের একাল সেকাল ও বাইচালদের জীবদ্দশা

নুর এমডি চৌধুরী। সম্পাদক,বার্তা বাংলাদেশ২৪.কম / ২৪ জন দেখেছে
আপডেট : রবিবার, ১৬ আগস্ট, ২০২৬

জামালপুরের মাদারগঞ্জ উপজেলার যমুনা ও ঝিনাই নদীর তীরে অনুষ্ঠিত নৌকা বাইচ এই অঞ্চলের মানুষের প্রাণের উৎসব এবং লোকসংস্কৃতির এক অনন্য প্রতীক। যুগে যুগে এই ঐতিহ্য তার রূপ পরিবর্তন করলেও নদীপাড়ের মানুষের আবেগ ও আনন্দের কোনো কমতি হয়নি।

মাদারগঞ্জের ঐতিহ্যবাহী নৌকা বাইচের বিবর্তন একাল সেকাল সেকাল গল্পে ভাদ্র-আশ্বিন মাসে যখন চারপাশ পানিতে থৈ থৈ করত, তখন থেকেই শুরু হতো প্রস্তুতি। গ্রামের মানুষ নিজেদের জমানো টাকা দিয়ে বিশাল বিশাল সব বাইচের নৌকা বানাতেন।

নৌকা বাইচকে কেন্দ্র করে নাইওরি (মেয়েরা বাপের বাড়ি) আসত। ঘরে ঘরে পিঠা-পুলির উৎসব হতো। নৌকার গলুইতে দাঁড়িয়ে কাংস্য আর ঢোলের তালে তালে বাইচালেরা “হেইও রে হেইও” সুরে গান গেয়ে একতালে বৈঠা চালাতেন। কোনো যান্ত্রিক আওয়াজ ছিল না, ছিল শুধুই মানুষের কণ্ঠের গর্জন।

বর্তমানে নদী ভরাট এবং পানির সংকটের কারণে আগের মতো ঘন ঘন বাইচ হয় না। তবে চরপাকেরদহ ইউনিয়ন বা সিদুলী বিএনপির মতো বিভিন্ন সংগঠন ও স্থানীয় প্রশাসনের উদ্যোগে এখনো বড় বড় প্রতিযোগিতা হয়।

এখন উৎসবের খবর ছড়িয়ে পড়ে ফেসবুক আর ইউটিউবে। নদীর পাড়ে হাজার হাজার মানুষের সাথে সাথে যুক্ত হয়েছে ড্রোন ও আধুনিক সাউন্ড সিস্টেম। বর্তমানে একটি দীর্ঘ বাইচের নৌকা বানাতে লাখ লাখ টাকা ব্যয় হয় (যেমন কোয়ালিকান্দী এলাকার ১২৭ ফুট দীর্ঘ নৌকা)। তাই ব্যক্তিগত উদ্যোগের চেয়ে স্পনসর বা দলীয় উদ্যোগে খেলাগুলো বেশি টিকে আছে।

জামালপুরের মাদারগঞ্জের পাকরুল গ্রামে যমুনা নদীর ঠিক পাশেই ছিল ছোট্ট অপু আর তুলির বাড়ি। প্রতি বছর বর্ষা এলে যখন নদী কানায় কানায় ভরে যেত, তখন অপুর দাদা তাকে শোনাতেন তাদের আমলের নৌকা বাইচের গল্প। দাদা বলতেন, “আমাদের সময়ে একেকটা নৌকা একশো হাতের বেশি লম্বা হতো! আমরা যখন একসঙ্গে বৈঠা মারতাম, যমুনার পানি তখন বাঘের মতো গর্জে উঠত!”

নৌকা বাইচ আমাদের লোকসংস্কৃতির এক দারুণ উৎসব। এর গতি আর উত্তেজনায় যেমন আনন্দ আছে, তেমনি অসাবধানতার কারণে অনেক বড় ট্র্যাজেডিও ঘটে। প্রতি বছরই বাইচ দেখতে এসে নৌকা ডুবি বা নদীতে পড়ে প্রাণ হারানোর মতো অনেক দুঃখজনক খবর সামনে আসে।

অতিরিক্ত ভিড়, ট্রলারের সঙ্গে সংঘর্ষ বা হঠাৎ ঝড়ের কারণে নৌকাডুবিতে মর্মান্তিক প্রাণহানির ঘটনা ঘটে। যেমন—টাঙ্গাইলের নাগরপুরে বাইচ দেখতে গিয়ে বা ফেরার পথে অতিরিক্ত যাত্রী বোঝাই ও ঝড়ের কবলে পড়ে শিশু ও মায়েরা পানিতে ডুবে মারা যাওয়ার বহু বেদনাদায়ক নজির রয়েছে।

জামালপুরের মাদারগঞ্জে মূলত নৌকা বাইচ প্রতিযোগিতাকে কেন্দ্র করে সরাসরি কোনো প্রাণহানির বড় খবর নেই। তবে, সাম্প্রতিক সময়ে মাদারগঞ্জের নদীতে নৌকাডুবি ও পানিতে ডুবে মর্মান্তিক প্রাণহানির কিছু বড় ঘটনা ঘটেছে।

২০২৫ সালের অক্টোবর-নভেম্বর মাসে মাদারগঞ্জের হরিপুর এলাকার ঝিনাই নদীতে একটি ডিঙ্গি নৌকাডুবির ঘটনায় ৫টি শিশুর মর্মান্তিক মৃত্যু হয়। শিশুরা বিকেলে ডিঙ্গি নৌকায় করে নদীতে ঘুরতে বের হয়েছিল।

২০২৬ সালের জুলাই মাসে মাদারগঞ্জের জোড়খালী ইউনিয়নের কলাদহ এলাকায় ঝিনাই নদীতে ডুবে এক বৃদ্ধের মৃত্যু হয়।

অন্যান্য এলাকায় নৌকা বাইচ দুর্ঘটনা: মাদারগঞ্জে না হলেও, ২০২৫ সালের আগস্ট মাসে সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়ায় একটি ঐতিহ্যবাহী নৌকা বাইচের নৌকার সাথে ইঞ্জিনচালিত নৌকার সংঘর্ষে ২ জন নিহত এবং ১০ জন আহত হওয়ার বড় দুর্ঘটনা ঘটেছিল।

প্রাচীনকালে মাদারগঞ্জ এলাকার নদনদীগুলো ছিল বারোমাসি ও প্রমত্তা। বর্ষাকালে নদী ও বিলে থৈ থৈ পানির সময় সাধারণ গ্রামীণ কৃষিজীবী ও জেলেরাই বাইচাল হিসেবে নৌকা বাইচে অংশ নিতেন।কৃষি ও মাছ শিকারের জীবন: বাইচালদের মূল পেশা ছিল কৃষি বা মৎস্যজীবী। বর্ষায় কাজ না থাকায় তারা নৌকাবাইচকে জীবনের অন্যতম প্রধান উৎসব ও শারীরিক কসরত হিসেবে নিতেন।

তখন প্রতিটি গ্রামে নিজস্ব দীর্ঘ আকৃতির বাইচের নৌকা থাকত। বাইচালরা সারাবছর নিজেদের মধ্যে সুদৃঢ় সামাজিক বন্ধন বজায় রাখতেন এবং বাইচের আগে নিয়মিত বৈঠক ও সারি গান-জারি গানের চর্চা করতেন।

সেকালে বাইচালদের আর্থিক সচ্ছলতা কম থাকলেও সমাজে তাদের শারীরিক শক্তি, সাহস এবং বৈঠা টানার দক্ষতার জন্য আলাদা একটা সম্মান ও কদর ছিল। জয়ী হলে পিতলের ডেকচি বা গবাদিপশু পুরস্কার পাওয়ার আনন্দে তাদের জীবন সমৃদ্ধ হতো।বর্তমানকালের বাইচালদের জীবনকাল ও পরিবর্তনবর্তমানে জলবায়ু পরিবর্তন, নদী ভাঙন এবং যমুনা নদীর গতিপ্রকৃতি বদলে যাওয়ায় মাদারগঞ্জের নদীগুলোর নাব্যতা হ্রাস পেয়েছে। এর ফলে বাইচালদের জীবন ও সংস্কৃতিতেও আধুনিকতার প্রভাব পড়েছে।

এখনকার বাইচালরা শুধু নদীনির্ভর জীবিকায় সীমাবদ্ধ নন। আধুনিক জীবনযাত্রার টানে তারা বিভিন্ন পেশা, দিনমজুরি বা ক্ষুদ্র ব্যবসার সাথে যুক্ত হয়েছেন।

নদী শুকিয়ে যাওয়ায় বা পলি জমে ভরাট হয়ে যাওয়ায় আগের মতো বারোমাসি নৌকা বাইচ এখন আর হয় না। কেবল বর্ষার নির্দিষ্ট সময়ে বা বিশেষ সামাজিক-সাংস্কৃতিক উৎসবে যমুনার কোনো কোনো পয়েন্টে বড় আয়োজনে বাইচ অনুষ্ঠিত হয়।

বর্তমানপ্রাচীনকালের বাইচালদের জীবনকাল ও সংস্কৃতিপ্রাচীনকালে মাদারগঞ্জ এলাকার নদনদীগুলো ছিল বারোমাসি ও প্রমত্তা। বর্ষাকালে নদী ও বিলে থৈ থৈ পানির সময় সাধারণ গ্রামীণ কৃষিজীবী ও জেলেরাই বাইচাল হিসেবে নৌকা বাইচে অংশ নিতেন।

বাইচালদের মূল পেশা ছিল কৃষি বা মৎস্যজীবী। বর্ষায় কাজ না থাকায় তারা নৌকাবাইচকে জীবনের অন্যতম প্রধান উৎসব ও শারীরিক কসরত হিসেবে নিতেন।

তখন প্রতিটি গ্রামে নিজস্ব দীর্ঘ আকৃতির বাইচের নৌকা থাকত। বাইচালরা সারাবছর নিজেদের মধ্যে সুদৃঢ় সামাজিক বন্ধন বজায় রাখতেন এবং বাইচের আগে নিয়মিত বৈঠক ও সারি গান-জারি গানের চর্চা করতেন।

বাইচালদের আর্থিক সচ্ছলতা কম থাকলেও সমাজে তাদের শারীরিক শক্তি, সাহস এবং বৈঠা টানার দক্ষতার জন্য আলাদা একটা সম্মান ও কদর ছিল। জয়ী হলে পিতলের ডেকচি বা গবাদিপশু পুরস্কার পাওয়ার আনন্দে তাদের জীবন সমৃদ্ধ হতো।বর্তমানকালের বাইচালদের জীবনকাল ও পরিবর্তনবর্তমানে জলবায়ু পরিবর্তন, নদী ভাঙন এবং যমুনা নদীর গতিপ্রকৃতি বদলে যাওয়ায় মাদারগঞ্জের নদীগুলোর নাব্যতা হ্রাস পেয়েছে। এর ফলে বাইচালদের জীবন ও সংস্কৃতিতেও আধুনিকতার প্রভাব পড়েছে।অর্থনৈতিক ও পেশাগত পরিবর্তন: এখনকার বাইচালরা শুধু নদীনির্ভর জীবিকায় সীমাবদ্ধ নন। আধুনিক জীবনযাত্রার টানে তারা বিভিন্ন পেশা, দিনমজুরি বা ক্ষুদ্র ব্যবসার সাথে যুক্ত হয়েছেন। নদী শুকিয়ে যাওয়ায় বা পলি জমে ভরাট হয়ে যাওয়ায় আগের মতো বারোমাসি নৌকা বাইচ এখন আর হয় না। কেবল বর্ষার নির্দিষ্ট সময়ে বা বিশেষ সামাজিক-সাংস্কৃতিক উৎসবে যমুনার কোনো কোনো পয়েন্টে বড় আয়োজনে বাইচ অনুষ্ঠিত হয়।

বর্তমান প্রজন্মে দীর্ঘ ও ব্যয়বহুল বাইচের নৌকা তৈরি করা এবং বাইচাল দল টিকিয়ে রাখা বেশ কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবে মাদারগঞ্জ উপজেলার চরপাকেরদহ বা বিভিন্ন এলাকায় স্থানীয় যুবসমাজ ও এলাকাবাসীর উদ্যোগে এখনও চাঁদা তুলে বিশাল নৌকা তৈরি ও বাইচের ঐতিহ্য টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করা হয়। প্রজন্মে দীর্ঘ ও ব্যয়বহুল বাইচের নৌকা তৈরি করা এবং বাইচাল দল টিকিয়ে রাখা বেশ কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবে মাদারগঞ্জ উপজেলার চরপাকেরদহ বা বিভিন্ন এলাকায় স্থানীয় যুবসমাজ ও এলাকাবাসীর উদ্যোগে এখনও চাঁদা তুলে বিশাল নৌকা তৈরি ও বাইচের ঐতিহ্য টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করা হয়।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরও সংবাদ

Archive Calendar

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
 
১০১১১২১৩১৪১৫১৬
১৭১৮১৯২০২১২২২৩
২৪২৫২৬২৭২৮২৯৩০
৩১