আজ আমাদের ডিয়ার সিস্টার কবি নাহিদা আশরাফীর প্রিয়দিন জন্মদিন। একটা মানুষ পৃথিবীতে পঞ্চাশ বছর ভ্রমণ করছেন। ভাবা যায়!! দেখার দৃষ্টিভঙিতে বিশাল পরিবর্তন সাধিত হয় পঞ্চাশ বছরের ভ্রমণে। একজন কবি, লিটল ম্যাগাজিন “জলধি” সম্পাদক, কথাশিল্পী, প্রকাশক এবং একটি কবিতাময় প্রতিষ্ঠান ” কবিতাক্যাফের” প্রধান নির্বাহী। বহগুণে গুণান্বিত এই সৃষ্টিশীল আত্মা পৃথিবীতে শত বছর সৃজনশীলতায় আকন্ঠ ডুবে পৃথিবীর জন্য নতুন কিছু সাহিত্য সৃষ্টি করুক, এটিই আজকের দিনে প্রার্থনা। কবি নাহিদা আশরাফীর কবিতা নিয়ে একটি প্রবন্ধ যুক্ত করে দিলাম। তাঁর কবিতার অন্দরমহলের একটা চিত্র পাঠক খুঁজে পাবেন, আশা করছি। তাঁর কিছু কবিতা পাঠ করে চোখ স্থির হয়ে গেছে। শব্দ ও চিত্রকল্পের চমৎকার ঠাসবুননিতে মুগ্ধতার রেশ ছড়িয়ে আছে কবিতার শরীরে।
পৃথিবীর পথে কবির অর্ধ শতাব্দী
তৌফিক জহুর
প্রাককথন:
আমরা যাঁরা নব্বই দশকের ট্রেনে কবিতার জন্য অন্তহীন পথে যাত্রা শুরু করেছিলাম, তাঁরা প্রায় সকলেই পঞ্চাশ পেরিয়ে গেছেন। আমাদের নব্বই দশকের পর আরো তিনটি দশক যায় যায়। প্রথম দশকের কবি, কথাশিল্পী, সম্পাদক যাঁরা রয়েছেন, তাঁদেরও কেউ কেউ পঞ্চাশের দরোজায় কড়া নাড়ছেন। কী আশ্চর্য!! ভাবা যায়!! এই সেদিনও যাঁরা প্রতিষ্ঠান বিরোধী লড়াইয়ে রাগী সম্পাদক কিংবা নতজানু না হওয়া কবি তাঁদেরও মধ্যে কেউ কেউ পঞ্চাশের আঙিনায়। হায় জীবন, এতো ছোটো কেনো! কিছুই পড়া হলোনা।কিছুই জানা হলোনা।সৃষ্টির আদি রহস্যের যে মাকড়সার জাল পৃথিবীময় ছড়ানো তার রহস্য উদঘাটন কি সম্ভব? অথচ কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, জাতীয় জাগরণের কবি কাজী নজরুল ইসলাম, ত্রিশের আধুনিক বাংলা কবিতার রাজপুত্র জীবনানন্দ দাশ এক জীবনে কতো বৈচিত্র্যময় লেখা লিখে গেছেন। আমরা কি সময়ের অপচয় করছিনা? বাংলাদেশের পঞ্চাশের দশকের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কবিদ্বয় শামসুর রাহমান ও আল মাহমুদ। এই গুণীদ্বয়ও ত্রিশ বছরের আগেই কালজয়ী কবিতার জন্ম দিয়ে অমরত্বের পেয়ালায় চুমুক দিয়েছেন। আজকাল এসব ভাবনায় তাড়িত হৃদয় বড্ড ব্যথিত হয়। তবে সকলেই গড্ডালিকার স্রোতে সাঁতার না কেটে কেউ কেউ সৃজনশীলতার বহুমাত্রিক চর্চায় আকন্ঠ ডুবে আছেন। সাহিত্য চর্চার এমন দুর্ভিক্ষের সময়ে এটিই আশা জাগানিয়া খবর। মধ্য নব্বই দশক থেকে এ পর্যন্ত আটাশ বছরের এই জার্ণিতে অনেক কিছুই দেখলাম। কতক মানুষের সৃজনশীল কর্মকান্ড আমাকে দারুণ উজ্জীবিত করে। আমি মুগ্ধ হয়ে তাঁদের বহুমাত্রিক কর্মকাণ্ডের রঙধনু অবলোকন করি। তেমনি এক আত্মার কবিতা নিয়ে কিছু বয়ান করবো। তিনি নাহিদা আশরাফী (১৯৭৩, ০১ মার্চ)।
তাঁর কবিতার অন্দরমহলে:
১.১
একটা প্রকান্ড খনির ভিতর অসংখ্য দামী পদার্থ খুঁজে পাওয়া যায়। জাগতিক সৃষ্টিতে যা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। কবিতার ক্ষেত্রে বিষয়টা একটু ব্যতিক্রম কারণ একজন কবির কবিতার খনিতে এমনসব বিষয় খুঁজে পাওয়া যায় যা গভীর তল্লাশিতে দৃশ্যমান হয়। নাহিদা আশরাফীর কবিতা বাইরের দিক থেকে সহজ ও সরল, কিন্তু ভেতরে গভীর সুদূরতার দিকে আমাদের মনকে আকর্ষণ করে নিয়ে যায়।যথার্থ কবিসত্তার অধিকারী তিনি। তিনি স্বল্প কয়েকটি লাইনে অসামান্য প্রকাশের ক্ষমতা রাখেন। কবিতার উদ্দেশ্য যে বহুমুখী ও বিচিত্রবিধ সে কথাও অবশ্যই স্বীকার্য। প্রাচীন ভারতের বিশিষ্ট আলংকারিক মম্মট ভট্ট কবিতার বিচিত্র ও বহুমাত্রিক উদ্দেশ্য সম্পর্কে বলেছিলেন এভাবে,
“কাব্যং যশহের্থকৃতে ব্যবহারবিদে ক্ষয়ে
সদ্যঃ পরিনির্বৃতয়ে কান্তসম্মিততয়োপদেশ যুজে”… অর্থাৎ কবিতা যশের জন্য, অর্থ প্রতিপত্তির জন্য, আচার-ব্যবহার জানবার জন্য, অমঙ্গল দূর করবার জন্য, প্রেয়সীর ন্যায় উপদেশ দেবার জন্য। ( কবিতা বিষয়ক প্রবন্ধাবলি: যতীন সরকার, পৃষ্ঠা -২৫৯)। তাহলে কবিতা কি আমাদের অমঙ্গল দূর করতে পারবে? এটি একটি প্রশ্ন বটে। উত্তর হচ্ছে, গভীর মনোযোগ সহকারে বিশ্বাসের আশ্রয়ে দর্শন সমৃদ্ধ কবিতা আমাদের অমঙ্গল দূর করতে পারে। এটা একটি ফিলোসোফির রাস্তা। আমরা কথা বলতে চাইছি, কবি নাহিদা আশরাফীর কবিতা নিয়ে। তাঁর কবিতা আমাদের ভাবনার দুয়ারে কড়া নাড়ে এবং গভীরে ডুবে অদ্ভুত এক আওয়াজ তোলে। তাঁর কবিতার মধ্যে বিজ্ঞতা আছে, আছে দর্শনের চাদরে আবৃত ধ্রুপদী নিষ্ঠা। আমরা বিস্মিত হই ” আমাদের মা মূর্খ ছিলেন” কবিতা পাঠ করে। আধুনিক কবিতার সবগুলি লক্ষণ যুক্ত করে কবিতাটির নির্মাণ শৈলীর কারুকাজ এমন এক মানদন্ডে উত্তীর্ণ করেছেন, বোঝার উপায় নেই, এ কবির যাত্রাপথ অতীন্দ্রিয়তা, ব্যক্তিকেন্দ্রিকতা, প্রেরণাবাদী,বর্ণনাধর্মী সব কিছুর মিশ্রিত রূপধারণ করেও কাব্যাদর্শ বিচ্যুত হয়নি। এজরা পাউন্ড একদা বলেছিলেন, ” কবিতাকেও গদ্যের মতো সুলিখিত হতে হবে অর্থাৎ কবিতার মধ্যে ভালো গদ্যের গুণাবলী থাকা প্রয়োজন। ( টিএস এলিয়ট এই বাক্যগুলোকে বলেছেন, Virtues of good Prose. (আধুনিক বাংলা কাব্য পরিচয়: দীপ্তি ত্রিপাঠী, পৃষ্ঠা -১৭৫)। গদ্য কবিতায় নাহিদা আশরাফী ন্যায় আর ঋজুতা, ভারসাম্যবোধ ও বাহুল্যবর্জন করে কবিতাকে তৈরি করেছেন মেদবিহীন। তাঁর এই বক্তব্যপ্রধান ও রূপধর্মী কবিতা জীবনের স্তরকে স্পর্শ করেছে। তাঁর এই কবিতাটি মেটাফিজিক্যাল ফর্মেটে সৃষ্টি। যেখানে মর্ত্য ও অতিমর্ত্য এই দুই জগৎ নিবিড়ভাবে চোখে পড়ে। কবিতাটির প্রথম অংশে তাকাই,
” জানতাম আমাদের মা খুব গরীব।আমরা তিন ভাইবোন অবশ্য এসবের ধার ধারতাম না।অনাহারীর কাছে খাবারের চেয়ে বড় সত্য আর কিছু নেই। তাই খিদে পেলেই ইসরাফিলের শিঙ্গার চেয়েও জোর চিৎকারে আকাশ বাতাস কাঁপিয়ে তুলতাম।
মা তখন মাটির ভাঁড়ে রাখা ইতিহাসের আটায় কিছু ভূগোল মিশিয়ে রুটি বেলে দিতেন।তপ্ত তাওয়ায় রুটি এক বিপন্ন মানচিত্র হয়ে উঠতো।অইদিনই জানলাম মা আমাদের কত বড় ইতিহাসবিদ।
আমাদের গলা দিয়ে শুকনো রুটি নামেনা।মা বললেন, ” কিছু মিথ্যে মাখিয়ে নে বাছা। মিথ্যে মাখনের কাজ করে।রুটি গিলতেও সুবিধে বেশ’।
অইদিনই টের পেলাম মা আমাদের কত বড় রাজনীতিবিদ। ”
(ফিরতে চাই বৃক্ষজন্মের কাছে: আমাদের মা মূর্খ ছিলেন, পৃষ্ঠা -১১)
কবিতাটির মধ্যে গল্প আছে। গদ্য আছে। ভালো গদ্যের কথা এজরা পাউন্ড বলেছিলেন, টিএস এলিয়টও বলেছেন। নাহিদা আশরাফী গদ্য কবিতার ঠাসবুননির মধ্যে দুর্লভ মননশীলতা এবং বক্তব্য দিয়েছেন। যা তাঁর কালের অভিজ্ঞতা ও পরিশ্রমলব্ধ অধ্যবসায়। যে ভাষা কাব্যের উপকরণ তা আবার দৈনন্দিন যাপিত জীবনের প্রয়োজনের দাবিও মেটায়। প্রত্যেক সৎ কবির পক্ষে এই উপকরণ ব্যবহার করা বড় সমস্যা ও মুশকিল। কিন্তু যাঁরা এই মুশকিল ডিঙাতে পারে তাঁরা সফল। নাহিদা আশরাফী কে আমরা কি সফল বলতে পারি? কি করে এই প্রত্যহের স্পর্শ লাগা ভাষা দিয়ে মূর্ত জগৎকে ভাবের জগতে রূপান্তরিত করা যায় তা কবি অবলীলায় করে দেখিয়েছেন। বিশুদ্ধ ভাবকে প্রকাশ করতে গেলে মূর্ততা বর্জন করে এগোতে হয়। এটাই হলো সৎ কবির কাব্যের রহস্যময়তা। সম্পূর্ণ বোধগম্য হওয়ার আগেই একটা ফিলোসোফি দরোজা খুলে সামনে আসে।
১.২
অজস্র কাজের শব্দে বর্তমান যুগ মুখর। মানুষ এক অস্থিরতার দোলাচালে দুলছে পৃথিবীময়। কবিতাও তার নিজস্ব পেলবতার পাখার নীচে বসিয়েছে ড্রোন। কবিদের দেখার দৃষ্টি এখন অনেক বেশি প্রসারিত। আধুনিকতার সূচনালগ্নে মানুষ ডাক ব্যবস্থার উপর নির্ভরশীল ছিলো। ক্রমশ আজকের সময়ে ইন্টারনেটের দুনিয়ায় গোটা পৃথিবী একটা দেশে পরিণত হয়ে গেছে। ইচ্ছে করলেই মানুষ নিমিষের মধ্যে পৃথিবীর একপ্রান্ত থেকে অন্যপ্রান্তে যোগাযোগ করতে পারে অতিসহজে এন্ড্রয়েড ফোনের মাধ্যমে। এ যুগে কবির চিন্তার গভীরতায়ও এসেছে ব্যাপক পরিবর্তন। বাংলা কবিতারও পালে হাওয়া লেগেছে। নাহিদা আশরাফী বর্তমান সময়কে ধারণ করা কবি। কর্পোরেট দুনিয়ার বিষয় আশয় ও শব্দরাজি তাঁর কবিতার মধ্যে দারুণভাবে প্রবাহিত। কিন্তু পূর্ণপ্রাণ কবিতা আছে। আছে সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয়ের চিত্র, আছে সুক্ষ্ম রাজনীতি। আমরা “লস এন্ড প্রফিট” কবিতাটি পাঠ করে শিউরে উঠি। কবিতাটির কয়েকটি লাইন উদ্বৃতি দিচ্ছি বয়ানের স্বার্থে :
” এখানে সুলভে নৈতিকতা বিক্রি হয়”-
“এখানে সুলভে আদর্শ বিক্রি হয়”-
” নদী দেখতে গিয়েই বুঝলাম মোটা অংকে চোখ বিক্রি করেছি পাথর ব্যবসায়ীর কাছে।
মানুষকে স্পর্শ করতে গিয়ে দেখলাম,চড়া সুদে হাত বন্ধক দিয়েছি কুলীন কর্পোরেটদের কাছে
সত্যের কাছে মাথা নোয়াতেই মনে পড়লো,আমার মাথা নিলাম করেছে পুঁজিবাদীরা।
অবশেষে প্রেমের কাছে নত হতেই দেখি আমার হৃদপিণ্ডটাও লালসার কীটে কুরে কুরে খাওয়া।
প্রকৃতির কাছে হাঁটু গেড়ে ক্ষমা চাইতে গিয়ে অনুভব করলাম সভ্যতা নামক এক ধারালো কুঠার আমার পা দুটিকেও বিচ্ছিন্ন করেছে নিপুনভাবে ”
(ফিরতে চাই বৃক্ষজন্মের কাছে: লস এন্ড প্রফিট, পৃষ্ঠা -১৯)
এই কবিতাটি আশ্চর্য প্রদীপের মতো। ক্লাসিকাল। প্রত্যেক সৎ কবির অন্বিষ্ট সত্যের অনুসন্ধান এবং অভিজ্ঞতার সুশৃঙ্খল সমন্বয়। কোনো বক্তব্যধর্মী কাব্যাদর্শের মধ্যে দিয়ে পথ চলে অবশেষে ব্যঞ্জনাধর্মী প্রতীকী কাব্যাদর্শের মধ্যে নাহিদা আশরাফী আশ্রয় খুঁজলেন। একজন কবির এখানেই শক্তিময়তার পরিচয় পাওয়া যায়।
১.৩
কবি নাহিদা আশরাফীকে সমাজমনস্ক কবি বলতে পারি। তাঁর কবিতায় সমাজের নানান অসংগতি ও অনাচার ভোরের আলোর মতো পরিস্কার হয়ে দেখা দেয়। কবিতার ক্ষেত্রে তিনি প্রজ্ঞার পথে হেঁটে অনুভবের তীব্র সুবাস ছড়িয়েছেন। আপোষকামী কবি নন। ঐতিহ্যে আস্থাশীল এ কবি প্রকৃতির জন্ম, মৃত্যু ও পুনর্জন্মের ছন্দে এঁকেছেন কবিতার দেহ সৌষ্ঠব। ব্যক্তির সঙ্গে জাতির তথা পরিবেশের হারানো যোগ পুনঃস্থাপনের প্রশ্নে তিনি বিশ্বমানস থেকে গ্রহণ করেছেন যুগে যুগে সঞ্চিত জ্ঞানের ভান্ডার। তাঁর কবিতা পাঠ করলে হৃদয়ে অতর্কিতে অগ্নুৎপাতের মতো কষ্টের লাভাও উদগীরণ হয়। তিনি নিরীক্ষা চালিয়েছেন মানুষ, সমাজ,পশু,প্রকৃতির ইন্দ্রিয়ের সাথে। সে কারণেই তাঁর কবিতা বহুমুখী, বহুপথের, বহুমতের। তিনি নির্দিষ্ট কোনো ফিলোসোফির চাদরে নিজেকে আবৃত করেননি। দর্শন তাঁর কবিতায় আসে শিল্পের শিল্পিত রূপে।কখনো মনে হয় মানুষের জয়গান। কখনো মনে হয় প্রকৃতির পক্ষে তিনি একাই দাঁড়িয়েছেন বর্তমান সভ্যতার চকচকে নীল আলোর নীচে। প্রকৃতি ধ্বংস করে শিল্পবিপ্লবের যে জোয়ার পৃথিবীতে বয়ে চলেছে তিনি উল্টোস্রোতে দাঁড়িয়েছেন প্রকৃতি রক্ষা করার জন্য। শিল্পের বিরুদ্ধে তিনি নন কিন্তু যথার্থ বাস্তব চেতনা নিয়ে যাঁরা শিল্পবিপ্লবের গান গাইছেন তিনি তাঁর কবিতায় তাঁদের বিজয়ের সানাই বাজিয়েছেন। এসময়ের একজন কবির দৃষ্টিভঙির এমন বহুমুখীতা বিস্মিত করে। এখানেই কবির ব্যক্তিস্বরূপের বিশেষ মানসিক আবেগের শাশ্বত সুন্দর রূপ খুঁজে পাই। আমরা কবিতা লক্ষ্য করি:
১.” গোলাপ কেনো,ক্যাকটাসেও অত কাঁটা পাইনি,যতটা মানুষের দেয়া অপবাদ আর নিন্দায় পেয়েছি। তবু কাঁটার প্রসঙ্গ এলে, কী অবলীলাশ ফুল অথবা বৃক্ষকেই দোষারোপ করি।…… হৃদয়হীন হলেই তাকে পশু বলতে বাঁধেনা তোমাদের। অথচ পশুর চেয়েও নির্দয় আর হিংস্র আমি মানুষকেই হতে দেখেছি।তারপরেও কী নির্বিকার হয়ে দাবি করো-মানুষ সবচেয়ে বিবেকবান প্রাণী”….
(ফিরতে চাই বৃক্ষজন্মের কাছে: দোষারোপ, পৃষ্ঠা -৫৯)
২.” এরপরও বলি আস্থা রাখো।দূরত্ব বজায় রেখে হলেও অন্তত একবার পরখ করো প্রয়োজনে প্রকৃতির কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে শাস্তি মঞ্জুর করো। সাময়িক নির্বাসন দাও। তবু, আমাদের বিশ্বাস করতে দাও প্রকৃতি ততোটা প্রতিশোধ পরায়ন নয় যতটা মানুষ নির্মম।দেখো ভাঙা পালকের দুঃখ ভুলে,অনুশোচনার আলপথ বেয়ে পাখিরা দলে দলে ঠিকই ফিরবে, তাদের পুরানো বাড়িওয়ালার কাছে। আমাদের যে পূর্বপুরুষেরা একদিন খুন শেখানোর আনন্দে ভুলক্রমে সুখী হয়েছিলো, আজ স্বজনের বৃক্ষজন্মে তারা সত্যিকারের সুখী হতে শিখুক”
(ফিরতে চাই বৃক্ষ জন্মের কাছে, পৃষ্ঠা -৩২)
দুটি গদ্য কবিতা পাশাপাশি রেখে দিলাম। ভবিষ্যৎ এ যাঁরা আসছেন সৃষ্টির আকন্ঠ নেশায় ডুবে সভ্যতার বিনির্মানের নকশা প্রস্তুত করতে,তাঁরা দেখবেন বুঝবেন জানবেন শিখবেন প্রজ্ঞার পথে হেঁটে একজন অগ্রজের নির্মিত আকাশ।
১.৪
ধ্বংসের চরমতম অবস্থার মধ্যে দিয়ে সমাপ্তির দিকে প্রাগ্রসর পৃথিবীর ওপরে বিবর্ণ আকাশ,হয়ত একদিন মেঘের সঙ্গেই বিলীন হয়ে যাবে। সূর্যাস্তের বেগুনি লাল জীর্ণ খন্ডগুলি দিগন্তের ঘুমন্ত নদীতে তাদের রঙ ধুয়ে ফেলবে, যে রঙ রশ্মি ও জলের সঙ্গে মিশে গেছে। বৃক্ষগুলি ক্লান্ত হবে একদিন অক্সিজেন বিলোতে বিলোতে। তাদের শুভ্রায়িত পর্ণরাজির নীচে সবুজ পাতারা রাস্তায় ধূলিলিপ্ত না হয়ে সময়ের ধূলির স্পর্শে যেগুলি সাদা ও হলুদ বর্ণের রূপ ধারণ করে এবং সন্ধ্যা গোধূলির প্রতিক্ষারত বহুযুগের অনন্তপ্রসারী ব্যাধী ও পাপগুলো ধুয়ে মুছে একদিন নতুন সূর্য উদিত হবে নতুন এক ইশতেহার নির্মাণ হবে তারই জয়গান করে চলেছেন নাহিদা আশরাফী, তাঁর কবিতার পরতে পরতে। সার্বভৌম বিজ্ঞান দ্বারা আকৃষ্ট কবি নতুন কবিতা লিখছেন দেশ কাল ঐতিহ্য ও সমাজমনস্ক হয়ে।সময়ের অভিশপ্ত চিহৃগুলো মুছে ফেলতে চান কবি, তাঁর কবিতার মধ্যে দিয়ে। বাংলা কবিতার পালাবদলে নাহিদা আশরাফী এ সময়ে এক বলিষ্ঠ কন্ঠস্বর হয়ে পাঠকের হৃদয়ে চিরকালের জায়গা করে নেবেন, যদি পথ হারিয়ে না ফেলেন। জীবনের ক্ষয়িষ্ণু রূপকে জরা ও মৃত্যু চেতনায় অবসন্ন ক্লান্ত ধূসররঙের আলোয় তাঁর কবিতার পথ তৈরি হয়নি, হয়েছে বিকেলের গোলাপি আভায়, ভোরের শুভ্রতায়, সন্ধ্যায় ঘরে ফেরা পাখির ফুরফুরে ভাবের দর্শনে।