মঙ্গলবার, ফেব্রুয়ারি ২৪, ২০২৬
Homeজাতীয়জীবনের মুখগুলি || কামরুল হাসান

জীবনের মুখগুলি || কামরুল হাসান

কথা সাহিত্যিক

বহুবছর আমি রোকেয়া ইসলামকে চিনতাম না। তিনিও আমাকে চিনতেন না। কিন্তু দেখা হওয়ার পর থেকে তার বিভিন্ন উদযোগ, অনুষ্ঠান ও ভ্রমণের সাথে এমনভাবে জড়িয়ে গেলাম যে মনে হলো বহুকাল ধরে তাকে চিনি। আমাদের বয়সও কাছাকাছি। তার সাথে প্রথম কোথায় দেখা হয়েছিল তা মনে না পড়ায় আমি ফেসবুকের স্মরণাপন্ন হই। কেননা ফেসবুকে আমি এন্তার বর্ণনা লিখে রাখি, সোসাল মিডিয়াটি সেসব খুব যত্ন করে সংরক্ষণ করে রাখে। চাইলে ব্যক্তিগত সহকারির মতো ফিরিয়ে দেয়। ফেসবুক দেখাচ্ছে ২০১৭ সালের মে মাসে আমরা প্রথম একসঙ্গে পশ্চিমবঙ্গের বকখালি কবিতা উৎসবে যোগ দিয়েছিলাম। আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন কবি সৌমিত বসু, মাধ্যম ছিলেন কবি মাহমুদ হাফিজ। সে উৎসবে বকখালি সাহিত্য পরিষদ বাংলাদেশের সত্তর দশকের চারজন কবি― মাহবুব সাদিক, মাহমুদ কামাল, জাহাঙ্গীর ফিরোজ ও ফারুক মাহমুদকে চারটি ভিন্ন সম্মাননা প্রদান করেছিল। সমুদ্রসৈকতে প্রবল হাওয়ার ভেতর, খোলা আকাশের নিচে কবিতা উৎসবের আয়োজনটি ছিল একেবারেই অভিনব ও প্রকৃতিবিহারী। অস্তগামী সূর্যের শেষ কিরণ ছড়িয়ে পড়েছিল সমুদ্রজলে ও সৈকতে, হাওয়ার শো শো শব্দ ছাপিয়ে মাইক্রোফোনে ভেসে উঠেছিল কবি সৌমিত বসুর ভরাট গলা। উদ্বোধনী গানের পর পশ্চিমবঙ্গের চার দশকের চার মনোনীত কবি চারটি পঙক্তি লিখেছিলেন সমুদ্রকে নিয়ে আর সেসব পঙক্তি অবলম্বনে একটি ক্যানভাসে ছবি এঁকেছিলেন কবি ও শিল্পী শ্যামল জানা। সবমিলিয়ে বিম্মরণের অতীত এক কবিতা উৎসব, তাকে আরও অবিস্মিরণীয় করে রেখেছিল হঠাৎ ওঠা সমুদ্রঝড়। বালু আর বাতাসের নিচে চাপা পড়েছিল সবকিছু। কবিতাপাঠের মঞ্চ, ছবির ক্যানভাস, পেতে রাখা সারি সারি চেয়ার ফেলে সবাই ছুটেছিল নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে। সে দৌড়ে আট বাংলাদেশি কবির ভেতর ছিলেন রোকেয়া ইসলাম ও নাহার ফরিদ।

পরের জানুয়ারিতেই টাঙ্গাইল গিয়েছিলাম ৪র্থ বাংলা কবিতা উৎসবে যোগ দিতে। টাঙ্গাইল রোকেয়া ইসলামের বেড়ে ওঠার শহর। এর অলিগলি সব তার চেনা। বাংলা কবিতা উৎসবের প্রধান আয়োজক কবি মাহমুদ কামাল। পশ্চিমবঙ্গ আর বাংলাদেশ মিলে প্রায় তিনশ কবির যোগদানে তিনদিনব্যাপী উৎসবটি এ বাংলায় সর্ববৃহৎ আর দু’বাংলা মিলিয়ে হলদিয়া সাহিত্য উৎসবের পর দ্বিতীয় বৃহত্তম উৎসবে পরিণত হয়েছিল আগেই। গিয়ে মনে হলো রাজধানীর বাইরে টাঙ্গাইল সাংস্কৃতিক রাজধানী হবার জোরাল দাবীদার। এ উৎসবের আয়োজনের সাথে ওতোপ্রতোভাবে জড়িযে আছেন রোকেয়া ইসলাম। আমি এর পরের বছর ৫ম বাংলা কবিতা উৎসবেও যোগ দিয়েছিলাম আর এ দুটি উৎসবে দেখা পেয়েছিলাম পশ্চিমবঙ্গের অনেক কবির, যাদের কবিতা পড়েছি, সাক্ষাৎ হয়নি। ২০১৯ এর সেপ্টেম্বরে ফের টাঙ্গাইল গিয়েছিলাম , ‘কথা’ নামের একটি সাহিত্য সংগঠনের সভাপতি নূরুল ইসলাম বাদলের আহবানে। আমার সাথে তার সংয়োগ ঘটেছিল রোকেয়া ইসলামের মাধ্যমে।

২০২০ সালের জানুয়ারি ঘটনাবহুল হয়ে ওঠে। আমরা আমন্ত্রণ পাই হলদিয়া বিশ্ব বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতি উৎসবে যোগ দেবার। এ হলো করোনা মহামারী বিশ্বময় ছড়িয়ে পড়ার আগের অধ্যায়। কেবল পশ্চিমবঙ্গের নয়, গোটা ভারতের, এমনকি গোটা বিশ্বে বাংলা সাহিত্যের সবচেয়ে বড় উৎসব এটি। রাষ্ট্রীয় পর্যায়েও এতবড় আয়োজন সংগঠিত হয়নি বলেই জানতাম। এখানে জড়ো হয় চারশতাধিক কবি, লেখক, শিল্পী ও সংস্কৃতিপ্রেমী। সেই উৎসবের সুনাম ও সৌন্দর্য, প্রতাপ ও বৈচিত্র্যের কথা বহুকাল ধরেই কবিদের মুখে মুখে শুনেছি। কখনো যাওয়া হয়নি, কেননা আমন্ত্রণ পাইনি। সেবার উৎসব আয়োজকদের অন্যতম একজন, পশ্চিমবঙ্গের সত্তর দশকের গুরুত্বপূর্ণ কবি শ্যামলকান্তি দাশ স্বয়ং আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। তিনি ঢাকা এসেছিলেন নভেম্বরে, কলকাতা ফিরেই আমন্ত্রণপত্র পাঠিয়ে দিয়েছিলেন মেসেঞ্জারে, উত্তরাধুনিক কালের ডাকবিভাগের মাধ্যমে। আমাকে শ্যামল ও কান্তিমান কবির কাছে নিয়ে গিয়েছিলেন কবি মাহমুদ হাফিজ। গিয়ে দেখি সদলবলে সেখানে হাজির রোকেয়া ইসলাম। দলের অন্যান্য সদস্যরা হলেন তাহমিনা কোরাইশী ও নাহার ফরিদ খান। তারা ছাড়াওএ উৎসবে বাংলাদেশ থেকে যোগ দিয়েছিলেন ফরিদ আহমদ দুলাল, মাহমুদ হাফিজ, সালমা বেগ, জাহ্নবী জাইমা প্রমুখ কবিগণ।

করোনা মহামারীর দুর্যোগ কেটে গেলে আমরা ফের অনুষ্ঠান ও আড্ডা নিয়ে মেতে উঠেছিলাম। ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারির পহেলা ফাল্গুন আর ভালোবাসা দিবস ছিল জড়াজড়ি করে। অমন মহার্ঘদিনে টাঙ্গাইলে বসন্ত উৎসবে আমাদের নিয়ে গেলেন রোকেয়া ইসলাম, সংস্কৃতিমুখর নিজ শহর নিয়ে স্বভাবতই গর্বিত তিনি। নিজেও বিবিধ অনুষ্ঠানে ছুটে যেতেন আর বুড়িগঙ্গার তীর থেকে কবিদের সঙ্গে করে নিয়ে যেতেন যমুনাঅঞ্চলে। মনে আছে এক বাস ভর্তি ২৯ যাত্রীর ২৫ জনই ছিলেন নারী, মাত্র চারজন পুরুষ। চালক ছিলেন পঞ্চমী তৎপুরুষ। এক নারীশাসিত বাহনে আমরা পঞ্চপাণ্ডব সারাপথ সতর্ক হয়েই ছিলাম। বেগম রোকেয়ার ‘নারীস্থানে’ পুরুষ অনাহুত; রোকেয়া ইসলামের ’নারীবাসে’ আমরা যে কী করে অনুমতি পেয়েছিলাম, ঈশ্বরই জানেন। তিনি কবিদের বর্ষবরণ অনুষ্ঠানেও নিয়ে গিয়েছিলেন

টাঙ্গাইল বাংলা সাহিত্য উৎসবে কয়েকবারই গিয়েছি। কবি সম্মেলনের বৃত্তান্তও লিখেছি। আমার একটি লেখায় নামোল্লেখ না করে কিছু কবি-সাহিত্যিকের টুকরো জীবনকাহিনী উঠে এসেছিল, গাড়িতে শোনা কথোপথনের ভিত্তিতে। ঐ গোপন কাহিনী খুব আগ্রহ নিয়ে পড়েছিলেন রোকেয়া ইসলাম। তার ধারণা আমি অনেক কাহিনী শুনেছি কিন্তু লিখিনি, গোপন করেছি। আমি তখন বলেছিলাম আমি হলাম ধারাভাষ্যকার, যা শুনিনি তাতো লিখতে পারি না। এ কথা কিছুতেই মানতে রাজি হননি রোকেয়া ইসলাম। সেবার যেহেতু আর গল্প খোঁড়া হলো না, আলোচনা ঘুরে গিয়েছিল অন্যদিকে। টাঙ্গাইল সাধারণ গ্রন্থাগারের পশ্চিমপার্শ্বে বিন্দুবাসিনী গার্লস হাই স্কুল, যে স্কুলে তিনি পড়েছেন। গ্রন্থাগারের ঠিক সমুখে ছিল ‘রওশন টকিজ’, যার পূর্ব নাম ছিল ‘কালী’। সেই সিনেমা হলটি আজ আর নেই, সেখানে শপিংমল, দোকানপাট উঠেছে। ছিল ‘রূপবাণী’, ‘কেয়া’, ‘রূপসী’ নামের আরো তিনটি প্রেক্ষাগৃহ। এখন একটিও টিকে নেই, কোনটি এপার্টমেন্ট হাউজ, কোনটি শপিংমল হয়েছে। টাঙ্গাইলের সিনেমা হলগুলোর প্রতিনিধি হয়ে টিকে আছে একমাত্র ‘মালঞ্চ’ প্রেক্ষাগৃহ। আমাদের জীবদ্দশায় অনেক করুণ কাহিনীর একটি হলো সিনেমা হলগুলোর মৃত্যু। এসব প্রেক্ষাগৃহে অজস্র সিনেমা দেখার স্মৃতি রোকেয়া ইসলাম ও তার বোনদের, যাদের তিনজন- নীলুফা জামান, সাবিনা স্বপ্না ও স্বপ্না ইসলামকে প্রায়শই বড়ো বোনের অনুষ্ঠানে দেখা যায়। বড়ো বোন তাদের গর্ব এবং বটবৃক্ষের ন্যায় ছায়াবিস্তারী।

সৌরজগতের সবচেয়ে বড়ো গ্রহ বৃহস্পতির নামে তিনি চালু করেছেন মাসিক সাহিত্যআসর ‘বৃহস্পতির আড্ডা’। আমাকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন যোগ দেবার । বৃহস্পতির আড্ডা বসে বেগম রোকেয়া সরণীর কাজীপাড়া ও শ্যাওড়াপাড়া মেট্রোরেল স্টেশনের মধ্যবর্তী স্থানে ‘ডরপ’ নামের একটি বেসরকারি সমাজসেবামূলক সংস্থার (এনজিও) অফিসে। এনজিওটির প্রতিষ্ঠাতা এ এইচ এম নোমান মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী বাংলাদেশ গড়ে তোলার প্রত্যয়দীপ্ত একজন সংগঠক ও সমাজসেবক। তিনি সাহিত্যপ্রেমী মানুষ শুধু নন, তিনি কবিতা ও নিবন্ধ লেখেন। রোকেয়া ইসলামকে তিনি খোলা চেক লিখে দিয়েছেন তার অফিসে ‘বৃহস্পতির আড্ডা’র আসর বসানোর। আমি বেশ কয়েকটি আড্ডায় যোগ দেই এবং আমার যা স্বভাব অনুষ্ঠানের বর্ণনা লিখি। এসব লেখা আনন্দিত করে রোকেয়া ইসলামকে এবং তিনি আমাকে তার সকল প্রোগ্রামে জড়িয়ে রাখতে চান ওই ন্যারেটিভের টানে। তিনি চান প্রতিটি সাহিত্য উৎসব ও আড্ডায় আমি যেন তার সঙ্গী হই আর বর্ণনা লেখি । বৃহস্পতির আড্ডার কয়েকটি আসরে যোগ দিয়ে আমার কাছে ক্রমশঃই ফুটে উঠল রোকেয়া ইসলামের নেতৃত্ব দেবার সহজাত শক্তি, সকলকে একত্রিত রাখার মানবিক বোধ, কৌতুকপ্রিয় ও আড্ডারু স্বভাব।

ডরপের প্রতিষ্ঠাতা, মাতৃত্বকালীন ছুটি ও ভাতার প্রবর্তক এ এইচ নোমান বৃহস্পতির আড্ডাকে সেবার জানিয়েছিলেন জুলাইয়ের শেষ সপ্তাহে ডরপ স্বাস্থ্যবতী ও সফল মায়েদের নিয়ে একটি সুন্দরী প্রতিযোগিতা ধরণের অনুষ্ঠান করবে। ঠিক সুন্দরী প্রতিযোগিতা নয়, তবে ঐ ধরণের। ১২টি উপজেলা থেকে নির্বাচিত সেরা দশ মায়ের মধ্য থেকে প্রথম, দ্বিতীয়, তৃতীয়জনকে পুরস্কার প্রদান করা হবে। সুন্দরী নয়, সেরা মা নির্বাচন করবেন ভারতের যোগব্যায়াম রাণী, যার সাথে দিল্লীতে দেখা হয়েছিল এ এইচ নোমানের। দেখামাত্র ঐ প্রথম দর্শনে প্রেমের মতো একে অপরের গুণমুগ্ধ হয়েছেন। সুন্দর মা হবার কতগুলো নির্ণায়ক সভাকে জানিয়েছিলেন এ এইচ নোমান। রোকেয়া ইসলাম নামকরণ করতে চেয়েছিলেন ‘সুনিপুনা মা’। বস্তুত এ এইচ নোমান একটি সম্পূর্ণ ভিন্নধরণের বিউটি কনটেস্টের পরিকল্পনা করেছিলেন, যার মধ্য দিয়ে পরিস্ফুট হবে ভিন্ন চিত্র, যা জরুরী সেই চিত্র, যা প্রমোট করা প্রয়োজন সেই চিত্র। অনেকটা রত্নগর্ভা মায়ের আদল এই প্রতিযোগিতার।

স্বপ্ন মায়ের খোঁজে আমরা প্রথমবার গিয়েছিলাম গাজীপুর জেলার কয়েকটি গ্রামে যেখানে ডরপের কার্যক্রম রয়েছে। শীতলক্ষ্যার তীরে নরসিংদী আর মেঘনার তীরে ভৈরব ছুঁয়ে আসা ঢাকা-চট্টগ্রাম রেলপথ ছাড়িয়ে ভূগোলের দিশা হারিয়ে ফেলা আমার মনে পড়েনি বৃটিশরা সেই যে কোনকালে যতটুকু রেলপথ বসিয়ে দিয়ে গিয়েছিল তার থেকে এই এত বছরে আমরা তেমন একটা রেলপথ বাড়াতে পারিনি। মনে আছে পথে বালিগাঁও থেকে ডরপের এক স্থানীয় কর্মীকে গাড়িতে তুলে নেওয়া হয়েছিল। রাস্তার পাশে তাকে একঝলক দেখেছিলেন রোকেয়া ইসলাম, দাঁড়াবার ভঙ্গি আর তাকানো দেখেই তিনি বুঝেছিলেন ঐ মেয়েটিই মাহমুদা বেগম। মাইক্রোবাস তাকে ফেলে চলে এসেছিল। রোকেয়া ইসলাম ফোন করে জিজ্ঞেস করলেন, ‘তুমি কি সবুজ রঙের ওড়না পরে আছো?’ গাড়ি পেছনে গিয়ে তাকে তুলে নিয়ে এসেছিল। মাহমুদা ছিল আমাদের লোকাল গাইড, স্বপ্ন মায়েদের বাড়ি বাড়ি সে-ই দেখিয়ে নিয়ে গিয়েছিল। গ্রামের বধূদের সাক্ষাৎকার গ্রহণের, তাদের হাল-হকিকত দেখা ও বোঝার, মূল্যায়নের এই অভিজ্ঞতাটি ভুলবার নয়। এখানেও প্রধান ভূমিকা নিয়েছিলেন রোকেয়া ইসলাম। তিনিই দলনেত্রী।

ডরপের সাথে রোকেয়া ইসলামের যোগাযোগের একটি সূত্র হচ্ছে তিনিও একটি এনজিওর, সেটি আরও বড়ো এবং বহুল আলোচিত, সভাপতি। এনজিওটির নাম প্রশিকা মানবিক উন্নয়ন কেন্দ্র। প্রতিবছর প্রশিকা কয়েকশত কোটি টাকার প্রকল্প গ্রহণ করে আর সেসব প্রকল্পের অর্থছাড়ের চেকগুলো রোকেয়া ইসলামের সাক্ষর নিয়েই ব্যাংকে যায়। সে বছর এ বাজেট ছিল তিনশত কোটি টাকা। একথা শুনে আমার বিস্ময় বাড়ে, রোকেয়া ইসলামের সততা ও নেতৃত্বগুণের প্রতি শ্রদ্ধা বাড়ে এবং তাকে ভিন্নগ্রহের মানবী বলে মনে হয়। তার ভেতরে আমি কিন্তু কোনো গৌরববোধ বা অহঙ্কার দেখিনি।

করোনাকাল ছিল স্বেচ্ছাগৃহবন্দিকাল। প্রাণ বাঁচাতেই ধূলিকণার তুচ্ছ অদৃশ্য শত্রুদের বিরুদ্ধে ওই ছিল আমাদের রণকৌশল। যখন সে দুর্দ্দশা কেটে গেল আমাদের মধ্যে শুরু হলো বাইরে বেড়িয়ে পড়ার তোড়জোড়, মহোৎসব। শুরু হলো দল বেঁধে সিনেমা দেখা। এই চমৎকার উদ্যোগটি নিয়েছিলেন রোকেয়া ইসলাম ও মাহবুব শওকত। ‘হাওয়া’ সিনেমা দিয়ে শুরু হলো শতবাতিজ্বলা প্রেক্ষাগৃহসমষ্টি সনি স্টার সিনেকমপ্লেক্সে। ওই সুস্থশিল্পিত মিছিলে যোগ দিলেন বৃহস্পতির আড্ডার কবি সাহিত্যিকগণ। প্রথম অভিযাত্রা সাফল্য পেলে ‘হাওয়া’ সন্দর্শী তরুণ তরুণীরা, যাদের গড় বয়স পয়তাল্লিশ, ছুটল পারু পারভীনের আয়োজনে ‘পরাণ’ দেখতে। আমরা পরে ‘দামাল’ ও ‘বরবাদ’ দেখেছিলাম মহাখালির সেনা কল্যাণ সংস্থার সিনে কমপ্লেক্সে। সে সকল অভিজ্ঞতা ছিল স্কুল পালিয়ে দলবেঁধে সিনেমা দেখার তরুণআনন্দভরপুর!

রোকেয়া ইসলামের সাথে আরও একবার ভারতে সাহিত্য উৎসবে যোগ দিয়েছিলাম। সেবার আমাদের গন্তব্য ছিল বাংলাদেশের কোলের ভেতর বসানো ভারতের সীমান্তবর্তী শহর ত্রিপুরার রাজধানী আগরতলা। তিনি যেখানে যান, সঙ্গে নিয়ে যান তার দলবল― নূর কামরুন নাহার, নাহার ফরিদ, তাহমিনা কোরাইশি, নাহার ফরিদ খান, শাহ সানাউল হক, কামরুল বাহার আরিফ প্রমুখ কবি-লেখকদের। সঙ্গে আমাকে নেন বর্ণনা লেখার জন্য। এমনিভাবেই ২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে নেপালী কবি ভীষ্ম উপ্রেতির আমন্ত্রণে আমরা গিয়েছিলাম নেপালের রাজধানী কাঠমান্ডু। নেপালভ্রমণে আমাদের নতুন দলে পুরাতন সদস্য দুজন― নূর কামরুন নাহার ও আমি। নতুন তিনজন হলেন রোকেয়া ইসলাম, কামরুল বাহার আরিফ ও নূর কামরুনের বন্ধু মাহবুবা হোসাইন। প্রতিটি ভ্রমণে আমি তার কৌতুকপ্রিয়তা, হাসিঠাট্টা করা, নেতৃত্ব দেওয়া, সমস্যা সমাধানের পথ বাৎলানো, সহমর্মিতা লক্ষ করেছি। প্রতিটি ভ্রমণ ছিল আনন্দকর ও সফল।

রোকেয়া ইসলামের সাথে আমার দৃষ্টিভঙ্গি ও চেতনার গভীর মিল রয়েছে। আমরা দুজনেই আমাদের তরুণতর বয়সে এ জাতির সবচেয়ে বিপুল পরিবর্তনের, সবচেয়ে গৌরবের মুক্তিযুদ্ধ প্রত্যক্ষ করেছি। আমরা দেখেছি পাকিস্তানী হানাদারদের গণহত্যা, লুণ্ঠন ও ধর্ষণের নারকীয় তাণ্ডব। দেখেছি তাদের এদেশি দোসরদের স্বমাটি ও স্বজাতিবিরোধী নির্লজ্জ অপকর্ম। এর বিপরীতে আমরা দেখেছি মুক্তিযোদ্ধাদের সাহসী লড়াই, স্বাধীনতার পক্ষে গণমানুষের একত্রিত হবার দৃঢ়তা ও শক্তি। টাঙ্গাইলে মুক্তিযুদ্ধ ছিল প্রচণ্ড ও তীব্রতর। রোকেয়া ইসলাম তা দেখেছেন কাছ থেকে। আমার জেলা শরীয়তপুরে পাকবাহিনী ও রাজাকাররা ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়েছিল। আমরা তাই চিরকাল স্বাধীনতা, মুক্তিযুদ্ধ আর সার্বভৌমত্বের পক্ষে আর ঘাতক দালালদের বিপক্ষে। আমরা আমাদের স্বাধীনতা অর্জনে ভারত ও মিত্রবাহিনীর ভূমিকার কথা স্মরণ করি কৃতজ্ঞতার সঙ্গে। দেশভাগের ফলে বাংলার বিভাজন একটি রাজনৈতিক ও ভৌগলিক বাস্তবতা হলেও বাঙালির ভাষা, সাহিত্য, কৃষ্টি ও সংস্কৃতির ঐক্য কেবল ঐতিহাসিক নয়, এটা ঐতিহ্যিক ও মজ্জাগত। দুই বাংলার কবি লেখকদের মাঝে সেতুবন্ধের কাজ করছেন যারা তাদের মাঝে খুবই উল্লেখযোগ্য হলেন টাঙ্গাইলের দুই কবি― মাহমুদ কামাল ও রোকেয়া ইসলাম।

তাই তো দেখি ২০২৪ সালের জুলাই মাসে তিনি তিন ভারতীয় অতিথিকে নিয়ে গিয়েছিলেন মানিকগঞ্জের কইট্টায় অবস্থিত প্রশিকা মানবিক উন্নয়ন কেন্দ্রে। সঙ্গে ছিলেন প্রশিকার চার কর্মকর্তা ও আমরা কয়েকজন কবি-লেখক। সেদিন সকালে কইট্টা যাবার পথে ভারতীয় অতিথিরা সাভারের জাতীয় স্মৃতিসৌধ পরিদর্শন করে মহান মুক্তিযুদ্ধে প্রাণ হারানো লাখো শহীদের বেদীতে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ করেছিল, সঙ্গে আমরাও। এই অতিথিরা হলেন জয়ন্ত চক্রবর্তী, তপন মাইতি ও সুশান্ত মুখার্জী। এটি ছিল একটি সম্প্রীতি উৎসব। প্রশিকা গড়ে তুলেছিলেন ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী, এ এইচ এম নোমান, খুশি কবির, দোলা রোজারিও, কাজী ফারুক আহমেদসহ সাতজন এনজিও নেতা। এই সাতজন ছিলেন প্রশিকার স্বপ্নদ্রষ্টা। তবে প্রশিকাকে গড়ে তুলেছেন, বিস্তৃত করেছিলেন কাজী ফারুক আহমেদ। কিন্তু রাজনৈতিক উচ্চাভিলাষ ও স্বৈরাচারী মনোভাবের কারণে নিজের সংগঠন তাকে সরিয়ে দেয়। নিবর্তনমূলক ব্যবস্থার শিকার হয়ে কর্মীরা বিদ্রোহী হয়ে উঠেছিল। কিছুকাল এ কেন্দ্র ছিল কাজী ফারুক পরিচালিত অংশের নিয়ন্ত্রণে, একসময় কর্মীরা বুঝতে পারে কাজী ফারুক তার আদর্শ থেকে সরে গেছেন, সংগঠনটিকে তিনি ব্যবহার করেছেন ব্যক্তিগত উচ্চাশা পূরণে, তখন তারা সরে আসে, এসে যোগ দেয় বৃহত্তর অংশের সাথে যার সভাপতি হলেন রোকেয়া ইসলাম, ব্যবস্থাপনা পরিচালক সিরাজুল ইসলাম। আমরা গিয়েছিলাম এমন এক সন্ধিক্ষণে যখন প্রশিকার এই কেন্দ্রটি নিজেকে পুনর্গঠিত করার চেষ্টা করছে। আর এসবই সম্ভব হয়েছে রোকেয়া ইসলামের উদ্যোগে, প্রশিকার ব্যবস্থাপনা পরিচালক সিরাজুল ইসলাম নেতৃত্বে, কর্মকর্তা ও কর্মীদের মিলিত প্রচেষ্টায়। খাদের কিনারা থেকে একটি বৃহৎ প্রতিষ্ঠানকে টেনে তুলে সাবলম্বী করে তোলার কৃতিত্বের অন্যতম ভাগীদার রোকেয়া ইসলাম। তখনি দেখেছি প্রশিকার কর্মীদের কাছে রোকেয়া ইসলাম দেবীতুল্য মর্যাদায় অধিষ্ঠিত।

২০২২ সালের জুন মাসে বারিধারা ডিওএইচএস কনভেনশন হলে কবিতাপাঠের আসরে আমাকে নিয়ে গিয়েছিলেন রোকেয়া ইসলাম। এ অনুষ্ঠানের আয়োজক ছিলেন ললনাকুলে প্রবল জনপ্রিয় সুরসিক হাসান আলী। সেখানে পরিচিত হয়েছিলাম অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল বীর মুক্তিযোদ্ধা জীবন কানাই দাসের সাথে। ২০২৩ সালের আগস্টে বারিধারা ডিওএইচএস কনভেনশন হলের প্রাঙ্গণজুড়ে প্রবীনহিতৈষী সংগঠক হাসান আলী আয়োজিত প্রবীণ সাহিত্য সম্মেলনে যোগ দিয়েছিলাম। সেখানে তৎকালীন পরিকল্পনা মন্ত্রী প্রধান অতিথি হয়ে এসেছিলেন, উন্মোচিত হয়েছিল হাসান আলী প্রণীত গ্রন্থ ‘প্রবীণ জীবন’। হাসান আলীর সাথে আমার পরিচয় হয়েছিল রোকেয়া ইসলামের মাধ্যমে। দেরি করে যাওয়ার কারণে আমি সেসব দেখতে পাইনি। তবে কয়েকজনের বক্তৃতা শুনতে পেরেছিলাম। রোকেয়া ইসলাম বলেছিলেন, সাহিত্যে নতুন ধারা সৃষ্টি করলেন হাসান আলী, তবে মঞ্চে একজনও নারী নেই দেখে ‘এ মঞ্চ নারীবান্ধব নয়’― বলে ক্ষোভ প্রকাশ করেছিলেন।

২০২২ সালের নভেম্বরে এক শুক্রবার ব্রেকফাস্ট আড্ডার চার ভ্রামণিকের কিভা হানে ব্রাঞ্চ খাওয়ার কাহিনী পড়ে রহস্যময় নামের রেস্তোরাঁটির প্রতি আকৃষ্ট হয়েছিলেন বৃহস্পতির আড্ডার সদস্যগণ, এই শিল্পসারথীদের টানে কিভা হানের নান্দনিক অভ্যন্তরভাগের শিল্পছবি ও রসালো বয়ান। প্রথমেই হাত তোলেন মিলা মাহফুজা, তাকে জোর সমর্থন করেন রোকেয়া ইসলাম। একবার যেহেতু গিয়েছি পথঘাট আমারই জানা, তাই আমার কাঁধেই দায়িত্ব পড়েছিল তারিখ ও সময় ঠিক করার। ঠিক হয়েছিল বৃহস্পতিবার দুপুর ১টায় আমরা কোন একটা বাহানা করে কিভা হানে যাব আর বলব কী বিহানে চলে এলাম। ঘোরাঘুরি আনন্দ গ্রুপে পোস্ট দেবার পর সাড়া পাওয়া গেল তাহমিনা কোরাইশী, রাজিয়া সুলতানা, শাহান আরা জাকির ও কাব্য কস্তার। রোকেয়া ইসলাম, মিলা মাহফুজা ও আমি তো ছিলামই। আহারের পর আমরা হাতির ঝিলে বোটে চড়েছিলাম নগরে নৌকা চড়ার আনন্দে। সেটা ছিল কারো কারো প্রথম বোটে চড়ে হাতির ঝিলে ঘোরা। অক্টোবর ২০২৩ এ বৃহস্পতি আড্ডার সদস্যদের নিয়ে প্রথম মেট্রোরেল ভ্রমণের পরিকল্পনাও ছিল রোকেয়া ইসলামের। মেট্রোরেলের শেষ স্টেশন উত্তরা উত্তরে নেমে আমরা একটি নান্দনিক রেস্তোরাঁয় সান্ধ্যআহার ও আড্ডায় মেতে উঠেছিলাম। সেসব স্মৃতি সততই মধুর!

মনে পড়ে এক বুদ্ধ পূর্ণিমার সন্ধ্যায় মিরপুরের একটি ল্যান্ডমার্ক প্রশিকা ভবনের সর্বোচ্চতলায় ত্রিদেশীয় কবিতা, আলোচনা ও সঙ্গীত সন্ধ্যা বসিয়েছিলেন প্রশিকা চেয়ারম্যান রোকেয়া ইসলাম। মিরপুরে বসবাস করার কারনে বহুবার এই ভবনটির পাশ দিয়ে গিয়েছি, কখনো বোতলের মতো লম্বা লালদুর্গে ঢুকিনি। কবিতাই সেদিন নিয়ে গিয়েছিল। দুর্গপ্রধান যখন কবিতার পক্ষে, তখন কবির জন্য দুর্গপ্রবেশ কঠিন নয়। আর যে উৎসবটির কথা মনে পড়ল সেটি হলো রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট হলে কবি কামরুল বাহার আরিফ আয়োজিত ‘মৃদঙ্গ সাহিত্য উৎসব’। এ উৎসব হয়েছিল ২০২৪ সালের মে মাসে। আমরা রেলে চড়ে পদ্মপাড়ের পরিচ্ছন্ন শহরটিতে গিয়েছিলাম, ঠাঁই নিয়েছিলাম শোভাময় বিশ্ববিদ্যালয়টির অতিথিভবণে আর আতিথ্য নিয়েছিলাম কামরুল বাহার আরিফ ও তার মৃদঙ্গ টিমের।

তার পায়ের তলায় যে সর্ষে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। অকাতরে ঘুরে বেড়ান তবে কখনোই একা নন, তার সহচরীদের শিষ্য বা ভক্ত বলা যেতে পারে, কিংবা সহযোদ্ধা, তবে কবি তারা সকলেই, সঙ্গে নেন। ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়ানো মানুষটি পরোপকারী এবং সকলকে নিয়ে চলার মন্ত্রে উদ্দীপ্ত। রোকেয়া ইসলামের স্বামী একজন মুক্তিযোদ্ধা, যিনি বলেন, ‘আমি মুক্তিযোদ্ধা, এটাই আমার একমাত্র অহঙ্কার।’ নারীদের চেয়ে তো বটেই, বাংলাদেশের পুরুষদের গড় উচ্চতার চেয়ে দীর্ঘকায়া রোকেয়া ইসলাম তার তরুণ বয়সে যে মাথাখারাপ করে দেওয়া সুন্দরী ছিলেন তা বোঝা যায় আজও তার দিকে তাকালে। দৈহিক গড়ন তাকে নেতা হবার একটি প্রকৃতিদত্ত সুবিধা দিয়েছে, বাকিটা তিনি অর্জন করেছেন।

রোকেয়া ইসলাম নিত্যনতুন পরিকল্পনা করেন বেড়ানোর, সাহিত্যসভা আয়োজনের। এই তো গতবছর জাতীয় বৃক্ষমেলায় কবিতা পাঠের আয়োজন করে তিনি বোধকরি ইতিহাস সৃষ্টি করলেন, কেননা এর আগে কেউ বৃক্ষমেলায় কবিতাপাঠের আয়োজন করেছেন বলে শুনিনি। রোকেয়া ইসলাম তো খুবই আত্মপ্রত্যয়ের সাথে ঘোষণা করেছিলেন সেদিন নতুন ইতিহাস সৃষ্টি হয়েছিল আর আমরা যারা সেই বিরল আয়োজনে যোগ দিয়েছিলাম তারা সবাই ইতিহাসের অংশ হয়ে গিয়েছিলাম। কবিরা প্রকৃতির সব ভূগোলেই তাদের কাব্যগ্রন্থ খুলে বসেন আর মঞ্চ হলে তো কথাই নেই। তবে বৃক্ষমেলায় তারা যে কখনো কবিতার আসর বসাননি সে ব্যাপারে রোকেয়া ইসলাম নিঃসন্দেহ। তিনি আমাকে বেশ কয়েকবার পাবনায় অনুষ্ঠিত সাহিত্য উৎসবে নিয়ে যেতে চেয়েছেন। আমি যেতে পারিনি বিবিধ কারণে। এবছর তিনি পাবনা সাহিত্য উৎসব থেকে কথাসাহিত্যে পুরস্কার লাভ করলেন। আর এটাই প্রথম নয়। তার ঝুলিতে রয়েছে বেশ কটি সাহিত্য পুরস্কার।

- Advertisement -spot_img
আরও সংবাদ
- Advertisement -spot_img
এই বিভাগের অন্যান্য সংবাদ

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here