চলচ্চিত্রে তিনি সিরাজ নামেই পরিচিত। পুরো নাম সিরাজুল ইসলাম। চলচ্চিত্র, টেলিভিশন, বেতার, মঞ্চাভিনেতা ও পরিচালক ছিলেন।
টিভি নাটকেও এক সময় নিয়মিত অভিনয় করতেন। ১৯৮৪ সালে চাষী নজরুল ইসলাম পরিচালিত ‘চন্দ্রনাথ’ ছবিতে অভিনয়ের জন্য সেরা পার্শ্বচরিত্র অভিনেতা হিসেবে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার লাভ করেন।
এক সময় করাচির ‘ইস্টার্ন ফিল্ম’ পত্রিকায় ঢাকাস্থ চলচ্চিত্র প্রতিবেদক হিসেবেও কাজ করেছেন তিনি। অভিনয়ের বাইরে পেশাজীবনে তিনি একজন সরকারি কর্মকর্তা ছিলেন।
জন্মেছিলেন ১৯৩৮ সালের ১৫ মে পশ্চিমবঙ্গের হুগলি জেলায়। তাঁর বাবা আবদুল হক ও মা আরিফান্নেসা। বাবা ছিলেন একজন সরকারি চাকুরিজীবি।
১৯৪৭ সালের দেশবিভাগের পরে সপরিবারে ঢাকায় চলে আসেন ও পুরান ঢাকার ফরাসগঞ্জের আনন্দমোহন দাস লেনে বসবাস শুরু করেন।
তখন তিনি ছিলেন নবম শ্রেণীর ছাত্র। ঢাকায় এসে কিশোরী লাল জুবিলী স্কুলে ভর্তি হন ও এখান থেকে ম্যাট্রিক পাস করেন। এরপর কায়েদে আজম কলেজে (বর্তমানে সোহরাওয়ার্দী কলেজ) পড়াশোনা করেন।
ঢাকায় তিনি প্রথম মঞ্চ অভিনয়ের প্রতি আকৃষ্ট হন। অভিনয় করার মাঝে বেতার শিল্পী রণেন কুশারীর সাথে পরিচয় হয়। তিনি তাঁকে বেতারে অভিনয়ের সুযোগ করে দেন। বেতারে ‘রূপালি চাঁদ’ নাটকে একজন স্কুল শিক্ষকের চরিত্রে প্রথম অভিনয় করেন তিনি। এরপর নিয়মিত মঞ্চে ও বেতারে অভিনয় করেন।
‘বৃষ্টি’ নামের একটি বেতার নাটকের প্রযোজনার মাধ্যমে তিনি প্রযোজক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। এটি একটি ইংরেজি গল্প অবলম্বনে নির্মিত হয়েছিল ও এটাতে অভিনয় করেন খান আতাউর রহমান, ডা. সাঈদুন্নেসা হোসেনসহ আরও বেশ কয়েকজন।
১৯৬৩ সালে মহিউদ্দিন পরিচালিত ‘রাজা এলো শহরে’ চলচ্চিত্রে অভিনয়ের মধ্য দিয়ে চলচ্চিত্রে সিরাজুল ইসলামের অভিষেক ঘটে।
এ ছবিতে তিনি একজন অধ্যাপকের চরিত্রে অভিনয় করেন। চলচ্চিত্রটি ১৯৬৪ সালে মুক্তি পায়। দীর্ঘ অভিনয় জীবনে তিনি প্রায় তিনশত চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছেন।
তাঁর অভিনীত উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্রের মধ্যে রয়েছে – সুতরাং, ধারাপাত, নাচঘর, অনেক দিনের চেনা, শীত বিকেল, বন্ধন, ভাইয়া, রূপবান, উজালা, ১৩নং ফেকু ওস্তাগার লেন, নয়নতারা, আলীবাবা, চাওয়া পাওয়া, গাজী কালু চম্পাবতী, নিশি হলো ভোর, সপ্তডিঙ্গা, মোমের আলো, ময়নামতি, যে আগুনে পুড়ি, দর্পচূর্ণ, জাঁহা বাজে সেহনাই, বিনিময়, ডুমুরের ফুল ইত্যাদি।
চলচ্চিত্রে অভিনয়ের পাশাপাশি সিরাজুল ইসলামের ‘অবসর’ নামে একটি নাটকের দল ছিল। এ নাটকে মোট সদস্য সংখ্যা ছিল ১৫ জন। অবসর নাট্য দলের ব্যানারে ফাঁস, কেনাবেচার পালা, গরুর গাড়ির হেডলাইট সহ প্রায় দশটি নাটক মঞ্চস্থ হয়।
২০১০ সালে তিনি চলচ্চিত্রে অভিনয় থেকে অবসর নেন। এরপর ২০১২ সালে জিয়াউল হকের ‘অতিথি’ নাটকে ও সর্বশেষ ২০১৪ সালে চৌধুরী সহিউল সাকী পরিচালিত একটি ‘অসমাপ্ত কবিতার গল্প’ নাটকে অভিনয় করেন।
সিরাজুল ইসলাম ১৯৬৫ সালে অভিনেতা আবুল হায়াতের ফুফাতো বোন সৈয়দা মারুফা ইসলামকে বিয়ে করেন। তাঁদের পরিবারে এক ছেলে মোবাশ্বেরুল ইসলাম শাহী এবং দুই মেয়ে ফাহমিদা ইসলাম ও নাহিদা ইসলাম।
২০১৫ সালের ২৪ মার্চ বার্ধক্যজনিত কারনে রাজধানীর নিকেতনের নিজ বাসভবনে ঝানু এই অভিনেতার জীবনাবসান ঘটে। বিনম্র শ্রদ্ধাঞ্জলি।