দেহের মাদল’ আমার প্রথম গল্পকাব্য। কথাসাহিত্য আমার কাজের প্রধান ক্ষেত্র। আবার কবিতাও অপ্রধান নয়। বলা চলে আমার এক হাতে গল্প আর এক হাতে কবিতার কলম। তাই লিখতে গিয়ে কখনও কোনো গল্পের মধ্যে কবিতা অথবা কবিতার মধ্যে গল্প ঢুকে পড়ে। তাতে, আমি মনে করি, সে-গল্প বা সে-কবিতা একটি ভিন্ন মাত্রা পায়। ‘দেহের মাদল’ গ্রন্থের রচনাগুলোকে পাঠক গল্প, অণুগল্প, কবিতা নানা নামে ডাকতে পারেন। এখানে এ-সব স্বাদ-আস্বাদ রয়েছে, এটা ঠিক। এ লেখাগুলো আকৃতি আর প্রকৃতিতে কবিতা হলেও এখানে বলা হয়েছে গল্প। আবার এসব লেখা মূলত গল্পের বয়ানে কবিতাই। প্রতিটি কবিতার মধ্যে পাওয়া যাবে একটি কাহিনি, কিন্তু গল্পের স্থাপত্যের ভেতরে আছে কাব্যের গহন আলোআঁধার, মগ্ন চৈতন্যের দোলা, চিত্রময়তা আর রূপময়তার নানা নকশা।
এ কবিতাগুলোর মধ্যে মেয়ে-জীবনের গল্প আছে। তবে তা ‘নারীজীবন’-এর নয়, নারী দেহের। একজন মেয়ে যখন কিশোরী জীবনে প্রবেশ করে, তখন সে তার সরল নিরীহ নির্দোষ বালিকা দেহের মধ্যে ধীরে ধীরে নানারকম সুন্দর বিস্ময়কর আবার কূটকৌশলময় জিনিসের উঁকিঝুকি দেখতে পায়। তখন তার পৃথিবীটি বদলে যেতে শুরু করে। যেমন করে চারা গাছ ডাঁটো হয়ে ওঠে, পাতা ঘন সবুজ হয়ে ওঠে, তারপর ফুলের কুঁড়ি উঁকি দেয়, একদিন ফলের সম্ভাবনা জানান দেয়, আর সেই তরুণ-তরু পরিপার্শ্বে একরকম আলো ছড়ায়, বালিকাদেহও তেমন চেনা পরিপার্শ্বের মধ্যেও নিজেকে বিশিষ্টরূপে দেখতে পায়।
মেয়েদের কিশোরী হয়ে ওঠা এবং কিশোরী থেকে পরিপূর্ণ নারী হয়ে ওঠার এই স্তরগুলোতে শুধু দৈহিক পরিবর্তনই নয়, ঘটে মনোদৈহিক পরিবর্তন। ফুলের কুঁড়ির মতো একটু একটু করে তার শরীরে সৌন্দর্য পাপড়ি মেলতে থাকে। যেন এক এক করে খুলতে থাকে অজানা রহস্যের দরজা। নারীদেহের এই গঠনপ্রক্রিয়া প্রতি মুহূর্তে দেখতে পায় মেয়েটি নিজে। নিজেকে দেখে দেখে তার নিজের মধ্যেই জাগে অসীম বিস্ময়। আত্মহারা অনুভূতির মগ্নতা তাকে আচ্ছন্ন করে। ঘুঁটেকুড়োনি মায়ের মেয়েরও নিজেকে এক স্বপ্নপুরীর রাজকন্যা মনে হয়।
এই অনুভূতিগুলো কোনো পুরুষের পক্ষে, এমন কি কেনো অনুভূতিপ্রবণ পুরুষ লেখক-কবির পক্ষেও নিবিড়ভাবে বুঝতে পারা সম্ভব নয়। মেয়ে-জীবনের এই দৈহিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়েই শুধু নয়, তার সাথে পারিবারিক, পারিপার্শ্বিক ও সামাজিক পরিবেশ, আশেপাশের মানুষের সঙ্গ সাহচর্য আচরণ সংস্কৃতি সবকিছু মিলেমিশে কিশোরী বালিকাটি দ্রুত নারীত্বের অভিজ্ঞতাগুলো অর্জন করতে থাকে। এই অভিজ্ঞতাগুলো কখনো অনুপম সুন্দর, কখনো কষ্টকর, কখনো ভীতিকর, কখনো কঠিন বিপজ্জনক, কখনো রোমাঞ্চকর। তবে, সব কিছু ছাপিয়ে থাকে রোমাঞ্চই। এই রোমাঞ্চিত সময়গুলো একজন কিশোরীকে কীভাবে প্রভাবিত করে, কীভাবে তার সরল নির্বোধ মনকে নানা জটাজটিল অভিজ্ঞতায় কাটাকুটি করে নতুন করে নির্মাণ করে, সেসব বিষয় হয়তো মনস্তাত্ত্বিক ও সমাজতাত্ত্বিক গবেষণার মধ্য দিয়ে কোনো তত্ত্ব আকারে বের হয়ে আসবে, কিন্তু সেই তাত্ত্বিক গবেষণার ভেতর দিয়ে অনূভূতিগুলোর সূক্ষ্ম স্তরবিন্যাসের সবটুকু ছবি পাওয়া যাবে না, সেটি পাওয়া যেতে পারে একজন অনুভূতিপ্রবণ কিশোরীর মনোবিশ্লেষণের মধ্য দিয়ে, তার ভাবনার সহচর হতে পারার মধ্য দিয়ে। এই গল্পকাব্যগুলোর অনুভূতির সেই স্তরগুলো স্পর্শ করতে চেয়েছি আমি।
পাঠক এ বইয়ে উপন্যাসের স্বাদও পাবেন। ছাব্বিশটি কবিতার মধ্যে পরিবেশিত গল্পগুলোতে রয়েছে উপন্যাসের মতই কাহিনির ধারাবাহিকতা। আছে একটি পরিবার ও সামাজিক জীবনবলয়। জরি নামে একজন কিশোরী চরিত্র আছে এখানে, যে একজন গ্রামকুমারী। আছেন জরির মা, যিনি প্রতিমুহূর্তে সতর্ক নজর রাখেন তাঁর বড় হয়ে উঠতে থাকা মেয়েটির প্রতি। শাসনে আদরে বোধনে তাকে একটু একটু করে জীবনের পাঠ দেন। আছে কিশোরীটির বাবা, ভাইবোন, সখি, ভাবি ও পাড়াপ্রতিবেশী চরিত্র। গাঁয়ের কিশোরীদের বেড়ে ওঠার এই সময়টিতে পাড়া প্রতিবেশী ও ঠাট্টাস্থানীয় নারীদের একটা বড় ভূমিকা থাকে। সেই সাথে আছে গ্রামীণ পরিবেশ ও সংস্কৃতির প্রভাব। আছে মনোদৈহিক বৌদ্ধিক ভাবনা ও আচরণ, যা কিনা একজন কিশোরীকে নানারকম রোমাঞ্চকর ভাবনার জগতে নিয়ে যায়। এমনকি নানারকম ভ্রান্তি, অসতর্ক আচরণ, ভুল ভাবনা, স্খলন বা অধঃপতনের দিকেও নিয়ে যায়। জীবন সম্পর্কে অনভিজ্ঞ মেয়েকে যিনি এ সময়ে সত্যিকারভাবে লালন ও পরিচালনা করেন, তিনি মা। মা-ই মেয়ের নারীজীবনের প্রথম এবং প্রধান শিক্ষক। মায়ের শাসন, ত্রাসন, তিরস্কার এমনকি প্রহারও কিশোরী মেয়ের সুস্থ সুন্দর বিকাশের জন্য জরুরি। এ বইয়ে জরির-মা চরিত্রটি একটি প্রধান চরিত্র। এই মায়ের নারীজীবন, নারীত্বের বিভিন্ন দিক কিশোরীর মেয়েকে নানাভাবে প্রভাবিত ও শিক্ষিত করে। এখানে জরির মায়ের আচরণগুলোই শুধু নয়, তাঁর মাতৃজীবন, দৈনন্দিন সংসারিক কাজ, এসবও গল্প হিসেবে এসেছে।
এ বইয়ের নির্মাণশৈলীতে ভাষার একটি বৈশিষ্ট্য আছে। গল্পের ন্যারেটিভ আছে প্রমিত ভাষায়। আর সংলাপ আছে আঞ্চলিক ভাষায়। এই ভাষাটি বিক্রমপুরের লোকভাষা। তবে কখনও কখনও ন্যারেটিভেও প্রমিত ভাষা ধীরে ধীরে লোকভাষায় কিংবা লোকভাষা প্রমিত ভাষায় আলতোভাবে মিশে গিয়েছে। পাঠক তাঁর মনের অজান্তেই ন্যারেটিভ-এর প্রমিত ভাষার স্পেস থেকে বেরিয়ে এসে লোকভাষার মধ্য দিয়ে চরিত্রকে নিজের মধ্যে ধারণ করবেন, সেজন্য সচেতনভাবেই এ কৌশল অবলম্বন করা হয়েছে।